দেশে প্রকৃত বেকার কত?

 

বেকারগত কয়েক বছর ধরে বেসরকারি খাতে বিনিয়োগ বাড়েনি। এই কারণে কাজের পরিধিও বাড়েনি দেশের ভেতরে। ছোট পদে চাকরির জন্য হাজার হাজার আবেদন জমা পড়লেও চাকরি হচ্ছে না। হাতেগোনা কয়েকজন চাকরি পেলেও অধিকাংশই থাকছেন বেকার। সরকারিভাবে দেশে বেকারের সংখ্যা ২৬ লাখ বলা হলেও বাস্তবে এই সংখ্যা হয়ত আরও বেশি বলে মনে করেন  বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) গবেষণা পরিচালক খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম। তিনি বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘কাজের আশায় শিক্ষিত বেকারদের একটা অংশ অবৈধ পথে ঝুঁকি নিয়ে বিভিন্ন দেশে চলে যাচ্ছেন। তাদের এই চলে যাওয়া মূলত বেকারের বাস্তব অবস্থার ইঙ্গিত করে।’

বাংলাদেশ অর্থনৈতিক সমীক্ষা ২০১৭-এর তথ্য অনুযায়ী, বেসরকারি খাতের নিবন্ধিত প্রকল্পগুলোয় ২০১৬ সালের জুলাই থেকে ২০১৭ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত প্রথম আট মাসে মাত্র এক লাখ ৯১ হাজার ৯০৯ জন লোকের কর্মসংস্থান হয়েছে।

এদিকে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্য অনুযায়ী, ২০১৩ সালের ডিসেম্বর থেকে ২০১৫ সালের জুন পর্যন্ত ওই দেড় বছরে বাংলাদেশে ১৪ লাখ নতুন শ্রমশক্তি দেশের শ্রমবাজারে যুক্ত হয়েছে, একইভাবে কর্মসংস্থান হয়েছে ১৪ লাখের। বেকারের সংখ্যা ২৬ লাখ। অবশ্য বিশ্বব্যাংক মনে করে, প্রকৃতপক্ষে বাংলাদেশে বেকারত্বের হার ১৪ দশমিক ২ শতাংশ। এ হিসাবে দেশের ২ কোটি ২ লাখ লোক বেকার।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর হিসাব প্রসঙ্গে খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম বলেন, ‘সরকার যাদের বেকার বলছে, তারা ছাড়াও অনেক বেকার আছে। তার মতে, বেকারের সংজ্ঞায় যাদের বেকার বলা হচ্ছে, তারা ছাড়াও দেশে কয়েকগুণ বেকার মানুষ রয়েছেন। যারা কাজ খুঁজছেন, তারা যদি কাজ না পান, তাহলে তাদের বেকার বলা হবে। সেই দৃষ্টিভঙ্গি থেকে দেশের নারী জনগোষ্ঠীর একটা বড় অংশ শিক্ষিত হয়েও কাজে নেই। মানে তারা বেকার। তাদের একটা বড় অংশ হয়ত কাজ না পেয়ে হতাশ হয়ে বসে আছেন বা বিয়ে সংসার শুরু করেছেন। এছাড়া অনেকে কাজ না পেয়ে বিকল্প বিভিন্ন শিক্ষার মধ্যে ডুবে রয়েছেন।’

আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (আইএলও) বিধান মেনে বিবিএস বাংলাদেশের শ্রমশক্তির জরিপ করেছে। এই জরিপে মূলত চার সপ্তাহ কাজ খুঁজেছে অথচ পাননি, আগামী দুই সপ্তাহের মধ্যে কাজ পেতে পারেন বা বিদ্যমান মজুরিতে কাজ শুরু করবেন—এমন কর্মক্ষমদের বেকার হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।

পরিসংখ্যান ব্যুরোর হিসাব মতে, তরুণ বেকারের হার সবচেয়ে বেশি ১০ দশমিক ৪ ভাগ। এছাড়া উচ্চ শিক্ষিতদের ১২ ভাগের বেশি এখন বেকার। তাদের মধ্যে নারীদের হার বেশি ১৫ শতাংশ। দেশের কর্মক্ষম নারীদের ৬ দশমিক ৮ ভাগ বেকার, পুরুষদের মধ্যে ৩ শতাংশ বেকার।

বিবিএসের তথ্য অনুযায়ী, ২০ থেকে ২৪ বছর বয়সী জনগোষ্ঠীর ১০ দশমিক ৪ ভাগ এখন বেকার। আইএলও-এর মতে, যারা সপ্তাহে অন্তত এক ঘণ্টা কর্মে নিয়োজিত থাকবেন, তারা আর বেকার নন। বাংলাদেশে সপ্তাহে এক ঘণ্টাও কাজ করতে পারেন না, এমন বেকারের সংখ্যা ২৬ লাখ। অন্যদিকে সপ্তাহে ৪০ ঘণ্টার কম কাজ করেন অথবা নিজেদের উপযোগী নয়, তাই নতুন কাজ খুঁজছেন এমন ‘আন্ডার এমপ্লয়মেন্ট’-এর সংখ্যা ১৮ লাখ। অর্থাৎ দেশে প্রকৃত বেকারত্বের সংখ্যা দাঁড়াচ্ছে ৪৪ লাখ।

এ প্রসঙ্গে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা ড. এবি মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘বেসরকারি বিনিয়োগের মাধ্যমে ৮০ শতাংশ কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়। কিন্তু গেল কয়েক বছরে কাঙ্ক্ষিত বিনিয়োগ বাড়েনি। ফলে নতুন কর্মসংস্থানও সৃষ্টি হয়নি। ফলে বেকার সংখ্যা বাড়ার কথা।’

দেশে বেকারের সংখ্যা নিয়ে জাতীয় সংসদেও সম্প্রতি বির্তক হয়েছে। গত ২৮ জুন সাবেক রাষ্ট্রপতি হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ জাতীয় সংসদে বলেছেন, ‘দেশে ২৬ লাখ বেকার আছেন বলে যে তথ্য প্রকাশ করা হয়েছে, তা ঠিক নয়। শুধু ঢাকা শহরেই বেকারের সংখ্যা হবে ২৬ লাখ।’

বিবিএসের হিসাবে ১৫ বছরের বেশি বয়সী অর্থনৈতিকভাবে কর্মক্ষম শ্রমশক্তি ৬ কোটি ৭ লাখ। এ শ্রমশক্তির মধ্যে ৫ কোটি ৮০ লাখ বিভিন্ন পেশায় নিয়োজিত। বাকি ২৬ লাখ বেকার।  অবশ্য বিবিএসের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পরিবারের মধ্যে কাজ করে কিন্তু কোনও মজুরি পান না—এমন মানুষের সংখ্যা ১ কোটি ১১ লাখ। এ ছাড়া আছে আরও ১ কোটি ৬ লাখ দিনমজুর, যাদের কাজের নিশ্চয়তা নেই। আইএলও হিসাব অনুযায়ী এরাও বেকার। এ হিসাবে বিবিএসের তথ্য অনুযায়ী বেকারের সংখ্যা দাঁড়াচ্ছে ২ কোটি ৪৪ লাখ।

২ কোটি ৭৪ লাখ কৃষিশ্রমিক বলে উল্লেখ করা হয়েছে বিবিএসের প্রতিবেদনে। এই শ্রমিকদের অর্ধেকেরই বছরজুড়ে কাজের কোনও নিশ্চয়তা থাকে না। এ হিসাবে এই খাতের আরও অর্ধেক শ্রমিক বেকারের তালিকায় পড়ে। এছাড়া কর্মক্ষম মানুষের মধ্যে মহিলা ১ কোটি ৬২ লাখ। তাদেরও বড় একটি অংশ নিয়মিত কাজ পায় না। এসব মিলে দেশে বেকারের সংখ্যা চার কোটির বেশি।

বাংলাদেশ অর্থনীতি সমিতি ২০১২ সালে এক গবেষণায় উল্লেখ করেছে, দেশে প্রতিবছর নতুন করে ২২ লাখ কর্মক্ষম শিক্ষিত মানুষ শ্রমবাজারে প্রবেশ করে। কিন্তু কাজ পায় মাত্র সাত লাখ। বাকি ১৫ লাখ থাকে বেকার।

প্রসঙ্গত, বর্তমানে দেশে সরকারি কর্মকর্তা ও কর্মচারীর সংখ্যা ১৩ লাখ ৮২ হাজার ৩৯৩ জন।

/এমএনএইচ/