২০১৩ সালে ডাস্টবিনের ভেতরে যখন নির্যাতনের শিকার গৃহকর্মী শিশু আদুরীকে পাওয়া যায় তখন সে কথা বলার মতো অবস্থায় ছিল না। সারা শরীরে ক্ষতে ভরা সেই নিস্তেজ, আতঙ্কিত আদুরি নামের মেয়েটি বাঁচাতে সর্বোচ্চ চেষ্টা করেন চিকিৎসকরা। সুচিকিৎসা পেয়ে সেই আদুরী এখন মোটামুটি সেরে উঠেছে, পড়ালেখা করছে। এখন কেমন আছে গৃহকর্ত্রী নওরীন জাহান নদীর নির্যাতনের শিকার আদুরী?
আজ মঙ্গলবার তাকে নির্যাতনের ঘটনায় দায়ের করা মামলার রায় ঘোষণা হয়। রায় ঘোষণার পর আদুরীর কাছে জানতে চাওয়া হয়, এখন সে কেমন আছে। এর উত্তরে এই শিশু বলে, ‘শরীরের মধ্যে ব্যথা করে। পড়ালেখা বলতে পারি না।’ এখনও বেঁকে থাকা মুখের দিকে ইঙ্গিত করে সে সাংবাদিকদের বলে, ‘পড়ালেখা বাইদ্দা যাই।’
শরীরে আর কী ধরনের সমস্যা জানতে চাইলে মেয়েটি বলে, ‘ভাত খাইতে পারি না, মুখের মধ্যে জ্বলে।’
রাজধানীর মিরপুরের ডিওএইচএস-এর একটি ডাস্টবিন থেকে উদ্ধার করা গৃহকর্মী আদুরীকে (১১) নির্যাতনের মামলায় আজ মঙ্গলবার সকালে রায় ঘোষণা করেন আদালত। রায়ে নির্যাতনকারী হিসেবে প্রমাণিত হওয়ায় গৃহকর্ত্রী নওরিন জাহান নদীকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড ও ১ লাখ টাকা জরিমানা করা হয়েছে। ঢাকার ৩ নম্বর নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালের বিচারক জয়শ্রী সমাদ্দার এ রায় দেন। রায় ঘোষণা শেষে দণ্ডপ্রাপ্ত আসামিকে কারাগারে পাঠানো হয়।
রায় ঘোষণার শেষে আদুরী বাংলা ট্রিবিউনকে জানায়, ‘সে এ রায়ে খুশি। তবে এ মামলায় ইসরাত জাহানের মাকেও সাজা দিলে সে আরও খুশি হতো।’
কথার ফাঁকেই জানা গেল আদুরি এখনও ভয় পায়। প্রায় চার বছর কেটে গেলেও এখনও গৃহকর্ত্রী নদীর নির্যাতনের দুঃস্বপ্ন দেখে সে। সে বলে, ‘ঘুমের মধ্যে দেখি খালি মারে, আমারে মারে। আমার সারা গায়ে ভরা (ক্ষত)।’
ঢাকা নগরীর নির্মম নির্যাতনের অভিজ্ঞতা নিয়ে এখন পটুয়াখালী সদর উপজেলার কৌরাখালী গ্রামে পরিবারের সঙ্গে আছে এই শিশু। শরীরের নানা অংশে ব্যথা ও জ্বলার কথা উল্লেখ করে আদুরি জানায়, ‘এখনও ডাক্তারের কাছে যাওয়া লাগে।’
আদুরি ভর্তি হয়েছে তাদের বাড়ি কৌরাখালীর পাশের গ্রাম পূর্ব জৈনকাঠীর একটি মাদ্রাসায়, পড়ে তৃতীয় শ্রেণিতে।
২০১৩ সালে ২৩ সেপ্টেম্বর মিরপুরের ডিওএইচএস-এর রাস্তায় ময়লা ফেলার ডাস্টবিন থেকে আদুরীকে উদ্ধার করে ক্যান্টনমেন্ট থানা পুলিশ। পরে ২৬ সেপ্টেম্বর আদুরীর মামা মো. নজরুল ইসলাম চৌধুরী আসামিদের বিরুদ্ধে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে ক্যান্টনমেন্ট থানায় মামলা দায়ের করেন। পুলিশের তদন্তে বেরিয়ে আসে গৃহকর্ত্রী নদী ধারালো চাকু দিয়ে গৃহকর্মী আদুরির শরীরের বিভিন্ন অংশে আঘাত করে, ইস্ত্রি দিয়ে মারাত্মক জখম করে। পরবর্তীতে মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা ভিকটিম সাপোর্ট সেন্টারের উপ-পরিদর্শক কুইন আক্তার ওই বছরের ওই বছরের ২৯ অক্টোবর আদালতে চার্জশিট দাখিল করেন।
এর আগে আদুরী ২ অক্টোবর আদালতে ২২ ধারায় জবানবন্দি দিয়েছিল। প্রধান আসামি নদী ১ অক্টোবর ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেন।
/ইউআই/টিএন/