বৃহস্পতিবার (১০ আগস্ট) বিকালে বাংলা ট্রিবিউন আয়োজিত ‘হ্যাঁ, বলতে দ্বিধা হচ্ছে’ শীর্ষক বৈঠকিতে এসব কথা বলেন বক্তারা। আইনের যথাযথ ব্যবহার না করতে পারা, ফরেনসিক টেস্টের সীমাবদ্ধতা, প্রভাবশালীদের চাপ ও সামাজিক কারণে ধর্ষণের ঘটনায় মামলা হলেও অপরাধী শাস্তি না পাওয়া এবং সম্প্রতি ধর্ষণের ঘটনার সংখ্যা ও ভয়াবহতা বেড়ে যাওয়ার প্রেক্ষাপটে বৈঠকিটি আয়োজন করা হয়।
পূর্ণিমা বলেন, ‘অস্ত্রের মুখে আমাকে ধর্ষণ করে সন্ত্রাসীরা। আশপাশের মানুষ দেখলেও ঠেকাতে আসেনি। সেই অভিজ্ঞতার কথা আমি ভুলে যেতে চাই। কিন্তু একটা শব্দ ঘুরেফিরে বারবার সামনে চলে আসে— ধর্ষিতা। মানুষ আমাকে জিজ্ঞাসা করে আমার লজ্জা করে কিনা। কিন্তু আমার লজ্জা কিসের, লজ্জা বাংলাদেশের। যেখানেই যাই, শুনতে হয় আমি ধর্ষিতা। ধর্ষিতা, ধর্ষণ— এসব শব্দ শুনতে শুনতে আমার পরিবারও বিপর্যস্ত।’
পূর্ণিমা বলেন, ‘‘কেউ একজন ধর্ষণের শিকার হলে সবাই ‘ধর্ষিতা’ ‘ধর্ষিতা’ বলে অস্থির হয়ে যায়। কিন্তু এই শব্দ বাদ দিলে ধর্ষণের শিকার মানুষটি একটু স্বাভাবিক হতে পারে। ধর্ষিতা শব্দটি খুবই পীড়াদায়ক। ধর্ষণের শিকার হতে হয় একবার, কিন্তু ‘ধর্ষিতা’ শব্দটি শুনতে হয় বারবার।’
পুলিশ মানে তো পুলিশ, সেখানে নারী পুলিশ কর্মকতা কেন প্রয়োজন— এমন প্রশ্ন করেন মুন্নি সাহা। জবাবে সহেলী ফেরদৌস বলেন, ‘ধর্ষণের জন্য শুধু নয়, সব ক্ষেত্রেই ভুক্তভোগীরা নারী পুলিশ দেখলে স্বস্তি বোধ করেন। আমরা নারী বা পুলিশ বলে ভেদাভেদ করি না। কিন্তু ভুক্তভোগীদের স্বস্তির কথা ভেবে নারী পুলিশ রাখা হয়।’
ধর্ষণের বিচারে দীর্ঘসূত্রিতা, বিচার দেরি হওয়া এসব প্রসঙ্গে সহেলী ফেরদৌস বলেন, ‘বিচার প্রক্রিয়ার একটি পার্ট পুলিশ। প্রায় ছয় হাজার মামলা হয়েছে। এটি একটি ইতিবাচক দিক যে মানুষ পুলিশের কাছে আসছে মামলার করতে। মানুষ বিচার চাইছে। এসব মামলায় পাঁচ হাজার মামলার চার্জশিট পুলিশ দিয়েছে। এরপর দায়িত্ব আমাদের না। এরপর বাকি দায়িত্ব আদালতের। এই লম্বা প্রসেসের কারণে সাক্ষীরা আসতে আর চাচ্ছেন না। কোনও কোনও ক্ষেত্রে সমঝোতা হয়ে যায়। আবার আগে সাক্ষীদের একটা যাতায়াত ভাতা দেওয়া হতো, এখন আর হয় না। ফলে সাক্ষীরা আসতে চান না অনেক ক্ষেত্রে। তদন্তের জন্য বিচার হচ্ছে না, এজন্য পুলিশকে একক ভাবে দায়ী করা যাবে না।’
আলামত সংগ্রহে পুলিশের দক্ষতার অভাব রয়েছে বলে মত দেন সমাজকর্মী শিরীন হক। এসময় সহেলী ফেরদৌস বলেন, ‘অনেক মামলা, অনেক আলামত। এত আলামত সংরক্ষণের সক্ষমতা আছে কিনা সেটি বিবেচনা করার দরকার আছে। ১০-১১ বছর মামলা চলে। সেই মামলার আলামত কী হবে, সেটি নিয়ে পুলিশকে চিন্তায় থাকতে হয়।’
এত বছরের আন্দোলনে কোথায় ভুল ছিল— মুন্নী সাহার এক প্রশ্নের জবাবে শিরিন হক বলেন, ‘আমাদেরও হয়তো আরও কিছু করার ছিল, করতে পারিনি। কৌশলগত ভুল ছিল হয়তো।’ তিনি বলেন, ‘‘ভাষাগত বিষয়ে সমস্যা রয়েছে। ভুক্তভোগীকে আমরা ধর্ষিতা বলে চিহ্নিত করে ফেলি। গণমাধ্যমও কোনও কোনও ক্ষেত্রে এ ভুল করে ফেলে। অনেক সময় ধর্ষণের সংবাদ এমনভাবে পরিবেশন করা হয় যে ধর্ষণের শিকার নারীর জন্যই তা অবমাননাকর। মুক্তিযুদ্ধের প্রসঙ্গ এলেই রাজনৈতিক নেতারাও বক্তব্য শুরু করেন ‘৩০ লক্ষ মা বোনের ইজ্জত’ দিয়ে। এত বছরেও আমরা এই ভাষার প্রয়োগ বন্ধ করতে পারিনি। ২৬ মার্চ কিংবা ১৬ ডিসেম্বর এলে এটি আরও বেড়ে যায়। ‘ধর্ষিতা’ শব্দ ব্যবহার না করে নির্যাতিত বললে ভুক্তভোগী কিছুটা রেহাই পাবে। এক্ষেত্রে সবার সহযোগিতা দরকার। নারীকে চিনুন, শ্রদ্ধা করুন।’’
মানসিক শিক্ষার প্রয়োজন আছে বলে মত দেন ড. আতিকুর রহমান। তিনি বলেন, ‘সিজফ্রেনিয়া রোগীদের সমাজে পাগল বলা হয়। এটি কিন্তু ঠিক নয়। আমরা চিকিৎসকরা অনেক চেষ্টার পর এই ক্ষেত্রে একটি পরিবর্তন আনতে পেরেছি। ঠিক একইরকমভাবে ধর্ষণের শিকার নারীর ক্ষেত্রেও ধর্ষিতা শব্দটি ব্যবহার করা উচিত না।’
পরিবর্তন কোন জায়গায় এসেছে— সেই প্রশ্ন তোলন উদিসা ইসলাম। তিনি বলেন, ‘বনানীর ধর্ষণের ঘটনার মামলা নিতেই পুলিশ তিনদিন সময় নিলো। তাহলে পরিবর্তন কোথায় আসলো? গণমাধ্যমে ধর্ষণের শিকার নারীদের যে ছবি ছাপা হয়, সেই ছবি থেকেই তাদের চিহ্নিত করা যায়। অনেক সংবাদেই ধর্ষণের শিকার নারীর নাম-পরিচয় বা ঠিকানা থাকে না। কিন্তু এমনভাবে খবর পরিবেশন করা হয় যে তাদের বাড়ির ঠিকানাও চিহ্নিত হয়ে যায়। ধর্ষণের শিকার যে নারী, তিনিও চিহ্নিত হয়ে যান। তাহলে কৌশল কোথায় বদলালো? গণমাধ্যমকে এসব বিষয়ে আরও সতর্ক হতে হবে।’
বৈঠকিটি সরাসরি সম্প্রচারিত হয় এটিএন নিউজে। এছাড়া বাংলা ট্রিবিউনের ফেসবুক পেজ থেকেও লাইভ সম্প্রচার করা হয় বৈঠকি।
আরও পড়ুন-
‘আমার লজ্জা কিসের, লজ্জা বাংলাদেশের’
‘ধর্ষণ মামলার আলামত সংগ্রহে পুলিশের দক্ষতার অভাব রয়েছে’
/সিএ/টিআর/