৫৭ ধারায় দায়ের করা গত ছয় মাসের মামলা পর্যালোচনায় দেখা গেছে, এসব মামলার বাদীরা হয় ক্ষমতাসীন দলের ভাতৃপ্রতিম সংগঠন বা সরকারি দলের নেতাকর্মী, না হয় ক্ষমতাবান ব্যক্তি। তাদের কাছে যা কিছু মিথ্যা ও অশ্লীল, নীতিভ্রষ্ট, মানহানিকর, দল ও ব্যক্তির ভাবমূর্তি ক্ষুণ্নকারী, ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত ও সংগঠনের বিরুদ্ধে উসকানি সৃষ্টিকারী বলে মনে হয়েছে, সে সবের ক্ষেত্রেই তারা ৫৭ ধারায় মামলা করেছেন। আইন পাসের শুরু থেকে মানবাধিকারকর্মীরা শঙ্কা জানিয়ে আসছিলেন, এই ধারায় ‘মানহানি’, ‘ভাবমূর্তি’, ‘অনুভূতি’, ‘ধর্মীয় অনুভূতি’ ও ‘অবমাননা’—এসব শব্দের যথাযথ ব্যাখ্যা না থাকায় অপব্যবহারের সুযোগ তৈরি হবে।
সম্প্রতি সবচেয়ে আলোচিত বনানীর রেইনট্রি হোটেলে দুই তরুণীকে ধর্ষণের মামলার পর ৭ জুন সাংবাদিক ও ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক আফসান চৌধুরীর বিরুদ্ধে ফেসবুকে উস্কানিমূলক মন্তব্য করার অভিযোগ এনে তথ্য প্রযুক্তি আইনে গুলশান থানায় মামলা করেন অবসরপ্রাপ্ত লেফটেন্যান্ট জেনারেল মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী৷
১২ জুন দৈনিক হবিগঞ্জ সমাচার পত্রিকার প্রকাশকসহ তিন জনের বিরুদ্ধে মামলা করেন হবিগঞ্জ-২ আসনের সংসদ সদস্য আব্দুল মজিদ খানের ভাতিজা হবিগঞ্জের পাকুরা ইউনিয়ন যুবলীগের সভাপতি আফরোজ মিয়া।
৩ জুলাই বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেল যমুনা টিভির সিনিয়র রিপোর্টার নাজমুল হোসেনসহ চার জনের বিরুদ্ধে বিচারক ও বিচার বিভাগের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হওয়ার অভিযোগ এনে মামলা করেন আইনজীবী হজরত আলী বেলাল।
এরআগে ১ মার্চ দৈনিক আলোকিত বাংলাদেশ-এর রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিনিধি মোস্তাফিজ মিশুর বিরুদ্ধে তথ্যপ্রযুক্তি আইনে ৫৭ ধারায় মামলা দায়ের করেন ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য মিনারুল ইসলাম।
হবিগঞ্জে ৫৭ ধারায় সদর থানা যুবদলের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আরব আলীর বিরুদ্ধে মামলা করেন সদর উপজেলা শ্রমিক লীগের সদস্য সচিব জামাল মিয়া। বাদীর অভিযোগ আরব আলীর স্ট্যাটাসে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু, প্রধানমন্ত্রী ও এমপিদের নিয়ে কটূক্তি করায় দলের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হয়েছে।
বাদী জামাল মিয়ার সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘মামলা তদন্ত শুরু হয়েছে। সম্প্রতি পুলিশ আমাকে সেটি জানিয়েছে।’
২৯ জুলাই প্রতিমন্ত্রী নারায়ণ চন্দ্র চন্দ ছাগল বিতরণের পর রাতে একটি ছাগল মারা গেছে এমন তথ্য দিয়ে সাংবাদিক লতিফ মোড়ল তার ফেসবুক পেজে ‘প্রতিমন্ত্রীর সকালে বিতরণ করা ছাগলের রাতে মৃত্যু’ লিখে একটি পোস্ট দেন। সেখানে প্রতিমন্ত্রীর ছবি ব্যবহার করায় মন্ত্রীর মানহানি হয়েছে দাবি করে লতিফ মোড়লের বিরুদ্ধে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি (আইসিটি) আইনের ৫৭ ধারায় মামলা দায়ের করেন যশোর থেকে প্রকাশিত দৈনিক স্পন্দন পত্রিকার ডুমুরিয়া প্রতিনিধি সুব্রত ফৌজদার। বাদীকে টেলিফোনে যোগাযোগ করা হলে বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘মামলার তদন্ত শুরু হয়নি। তিনি যে স্ট্যাটাস দিয়েছেন, তাতে মন্ত্রীর ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হওয়ায় আমি মামলা করেছি এবং মামলা চালিয়ে যেতে চাই।’
এদিকে দিনাজপুরে সাংবাদিক নাজমুল হোসেনের বিরুদ্ধে দায়ের করা মামলার বাদী আইনজীবী হজরত আলী বেলাল বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘বিষয়টি আমার খারাপ লেগেছে, আমি মামলা করেছি। এই আইনটি কার্যকর, সেটি আমি কেন ব্যবহার করব না? আইন নিয়ে বিতর্ক হচ্ছে, বাতিল হলে আর এ আইনে মামলা হবে না। আমি চাই আইনটি থাকুক৷ বাতিল যেন করা না হয়।’
জানতে চাইলে ব্যারিস্টার জ্যোতির্ময় বড়ুয়া বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘‘৫৭ ধারায় ‘ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন’ বা এ ধরনের নানা শব্দ দিয়ে অপরাধগুলোর উল্লেখ করায় এসব দিয়ে আসলে কী বোঝায়, তা নির্দিষ্ট করা হয়নি। আর নির্দিষ্ট না করায় কার কোথায় মানক্ষুণ্ন হচ্ছে, সেটি বোঝা যাচ্ছে না। তার ব্যাখ্যাও নেই।’’ তিনি মনে করেন, ‘এই আইনের বিলুপ্তি ছাড়া অন্য কোনও দাবি থাকা উচিত নয়। এই আইন বাতিল করতে হবে। ভুল আইনকে সঠিকভাবে ব্যবহার করবেন কিভাবে? অপ-আইনের সুযোগ যাদের নেওয়ার সুযোগ আছে, তারা সবাই-ই নিচ্ছে।’
প্রভাবশালী ও ক্ষমতাবানদের এই আইন ব্যবহারের প্রবণতা বেশি দেখা যাচ্ছে কেন?—এমনপ্রশ্নের জবাবে আইন ও সালিশ কেন্দ্রের সাবেক নির্বাহী পরিচালক নূর খান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘মামলার বাদীদের তালিকা করলে এটা স্পষ্ট হয়ে যাবে যে, যাদের হাতে ক্ষমতা আছে, সমাজে যাদের প্রভাব আছে, তারাই মামলাগুলো করছেন৷ এই আইনকে ব্যবহার করে হয়রানি করার সুযোগ পাচ্ছেন বলেই ব্যক্তিগত শত্রুতার জায়গা থেকে বা প্রভাবশালীদের দ্বারা প্রভাবিত হয়ে মামলা দায়ের করা হচ্ছে। এ আইন ঠিক আছে, এটি বলার কোনও সুযোগ নেই।’ যে আইন ঠিক থাকবে সেখানে দুর্বলতা থাকবে না বলেও তিনি মন্তব্য করেন।