সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এ পদ্ধতির মাধ্যমে বর্ষা মৌসুমে যেমন নগরীর জলাবদ্ধতা কমানো যাবে, তেমনি ভূগর্ভের পানির স্তরের উচ্চতাও বাড়ানো যাবে।
নগর বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নগরীতে অন্তত ৬৬০টি গভীর নলকূপের মাধ্যমে ওয়াসা ভূগর্ভ থেকে পানি উত্তোলন করে বাসাবাড়িতে সরবরাহ করছে। এ কারণে ভূগর্ভের পানির স্তর নিচে নেমে যাচ্ছে। ওয়াসার নলকূপগুলো দিয়ে যেভাবে মাটির নিচ থেকে পানি উত্তোলন করা হয়, ঠিক একইভাবে মাটির উপরের পানি নিচে ঢুকিয়ে দেওয়া যাবে। এতে যেমন জলাবদ্ধতা কমবে, ভূগর্ভস্থ পানির স্তরও পূরণ হবে।
এজন্য কিছু পদ্ধতি অবলম্বন করতে হবে। প্রথমত, নিচু বা জলাবদ্ধতাপ্রবণ স্থানগুলোতে গভীর পাইপ বসিয়ে আশপাশের নিচু স্থানগুলোর সঙ্গে নেটওয়ার্কিং বা সংযোগ লাইন স্থাপন করে মূল পাইপের সঙ্গে যুক্ত করে দেওয়া হবে। এক্ষেত্রে পানি ময়লা ও আবর্জনামুক্ত করতে প্রাথমিক ফিল্টারিং ও বিশুদ্ধকরণ করতে হবে। এসব চিন্তাভাবনা এখনও প্রাথমিক অবস্থায় রয়েছে। এ পদ্ধতি বাস্তবায়ন করা যায় কিনা তা নিয়ে প্রকৌশলগত পরীক্ষা-নিরীক্ষার চিন্তাভাবনাও করা হচ্ছে।
এছাড়া, জলাবদ্ধতা নিরসনে নতুন একটি পদ্ধতি অন্তর্ভুক্ত করে ‘ইমারত নির্মাণ বিধিমালা ২০০৮’ সংশোধন করারও পরিকল্পনা নিয়েছে রাজউক। তাতে প্রতিটি বাড়িতে ‘রেইন হার্ভেস্টিং’ এর পাশাপাশি ব্যবহৃত পানি মাটির নিচে ঢুকিয়ে দেওয়া, গাড়ি ধোয়ার কাজে ব্যবহার করা, বাথরুম প্লাসিং বা বাগান ও বাড়িতে ব্যবহারের ব্যবস্থা সংযুক্ত করা হচ্ছে। এখন ‘ওয়াসার গভীর নলকূলের মতো পাইপ বসিয়ে জলাবদ্ধতা নিরসন সম্ভব’ বিশেষজ্ঞদের পক্ষ থেকে এমন আলোচনা উঠার পর এ নিয়ে ভাবছে প্রতিষ্ঠানটি। ইঞ্জিনিয়ারদের মতামত ইতিবাচক হলে বিষয়টি কিভাবে ইমারত নির্মাণ বিধিমালায় অন্তর্ভুক্ত করা যায় সে বিষয়ে চিন্তাভাবনা করবে রাজউক। এমনটি জানিয়েছেন রাজউকের সদস্য (উন্নয়ন নিয়ন্ত্রণ) মো. আসমাউল হোসেন।
রাজউক কর্মকর্তারা বলছেন, সম্প্রতি গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয় থেকে বাসাবাড়ির বৃষ্টির পানি সংরক্ষণের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। রাজউক থেকে বাড়ির নকশা অনুমোদনের ক্ষেত্রে বৃষ্টির পানি সংরক্ষণের জন্য ছাদে ‘রেইন রিজারভার’ এর ব্যবস্থা বাধ্যতামূলক করা হচ্ছে। তবে এতেও সমস্যার পুরোপুরি সমাধান হবে না। বর্ষা মৌসুমে জলাবদ্ধতা থেকেই যাবে। এ জন্য নতুন এই পদ্ধতিতে এগোনো যায় কিনা তা নিয়ে ভাবছে রাজউক।
এ বিষয়ে রাজউকের সদস্য (উন্নয়ন নিয়ন্ত্রণ) মো. আসমাউল হোসেন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘বৃষ্টির পানির কারণে নগরজুড়ে তীব্র জলাবদ্ধতা দেখা দেয়। কিন্তু নগরীতে কোনও উন্মুক্ত জায়গা না থাকায় সে পানি মাটি শোষণ করে নিতে পারছে না।’
এ বিষয়ে নগর পরিকল্পনাবিদ ও স্থপতি মোবাশ্বের হোসেন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘আমরা দীর্ঘদিন ধরে বিষয়টি নিয়ে কথা বলে আসছি। গভীর নলকূপ দিয়ে যেভাবে পাম্পিং সিস্টেমে ভূগর্ভের পানি উত্তোলন করা হয়, ঠিক একই সিস্টেমে সে পানি মাটির নিচে ঢুকিয়ে দেওয়া যাবে। এতে খরচও কমবে। তাছাড়া, ভূগর্ভের তলিয়ে যাওয়া পানির স্তর পূরণ হবে।’
ওয়াসার ব্যবস্থাপনা পরিচালক তাকসিম এ খান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘ওয়াসার ৮৬ শতাংশ পানি আসে ভূগর্ভ থেকে। বাকি ১৪ শতাংশ পানি আসে নদী থেকে। ফলে দিন দিন ঢাকায় ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নিচে নেমে যাচ্ছে। স্তর নেমে যাওয়ায় ওয়াসার নলকূপগুলো পানিও পাচ্ছে না। আগে বৃষ্টি হলে প্রাকৃতিকভাবে সে পানি মাটি শোষণ করে নিত। কিন্তু এখন সে উন্মুক্ত স্থান নেই। প্রাকৃতিকভাবে শোষণ করার সব পথ বন্ধ হয়ে গেছে। যে কারণে কৃত্রিমভাবেই বৃষ্টি ও স্যুয়ারেজ লাইনের পানি অপসারণ করতে হচ্ছে। এ অবস্থায় আমরা বৃষ্টি ও স্যুয়ারেজ লাইনের পানি কিভাবে মাটির নিচে পাঠানো যায় সে বিষয়ে চিন্তাভাবনা করছি। প্রাথমিকভাবে আমাদের ৬টি ভবনে এ পদ্ধতি চালু রয়েছে। এতে আমরা সফল। এখন বিষয়টি নিয়ে আরও আলোচনা হচ্ছে।’
জানতে চাইলে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) মেয়র মোহাম্মদ সাঈদ খোকন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘বৃষ্টির ও স্যুয়ারেজ লাইনের পানি মাটির নিচে পাঠানোর উদ্যোগ আমাদের রয়েছে। তবে গভীর নলকূপের মাধ্যম অবলম্বন করা যায় কিনা সে বিষয়ে ভাবতে হবে। বিষয়টি আমার কাছে খারাপ বলে মনে হচ্ছে না। তবে ইঞ্জিনিয়ার বা বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে কথা বলে এর ভালোমন্দ পরীক্ষা করে দেখতে হবে।’
দক্ষিণ সিটির অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী আসাদুজ্জামান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘প্রথম অবস্থায় পাইলট প্রকল্প হিসেবে একটি প্রকল্প হাতে নিয়ে এর সাফল্য-ব্যর্থতা পরীক্ষা করা যেতে পারে। আবার বৃষ্টি বা স্যুয়ারেজ লাইনের পানির কারণে ভূগর্ভের পানি নষ্ট হয়ে যায় কিনা সে বিষয়টিও দেখতে হবে।’
এ বিষয়ে বিআইডব্লিউটিএর সাবেক নির্বাহী প্রকৌশলী পরিবেশ বাঁচাও আন্দোলনের (পবা) নির্বাহী সদস্য ও নগর বিশেষজ্ঞ তোফায়েল আহমেদ বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘এটি একটি সুন্দর পদ্ধতি হতে পারে। যদি এই পানিকে মাটির নিচে ঢুকিয়ে দেওয়ার ব্যবস্থা করা যায়, তাহলে নগরীর জলাবদ্ধতা আর থাকবে না। এ অবস্থায় ওয়াসার যেসব পাম্প দিয়ে পানি পাওয়া যাচ্ছে না সেগুলো দিয়ে বৃষ্টির পানি ভূগর্ভে ঢুকিয়ে দেওয়ার ব্যবস্থা করা যেতে পারে।’