ঈদের দিন দেশের বন্যা দুর্গত এলাকায় একজন মানুষও যেন খাবারের কষ্ট না পায় সেদিকে বিশেষ নজর রাখছে সরকার। এর জন্য নেওয়া হয়েছে বিশেষ নজরদারি ও বিশেষ কর্মসূচি। বিষয়টি নিশ্চিত করতে মাঠে কাজ করছে জেলা প্রশাসক ও ইউএনওরা। সরকারের পাশাপাশি সামজিক, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলোকেও কাজে লাগানো হচ্ছে। যেখানে সমস্যা পাওয়া যাচ্ছে সেখানেই পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে সরকারের ত্রাণ হিসেবে চাল ও নগদ টাকা। একইসঙ্গে বন্যার্ত ঘরহীন মানুষ, ঘর ভেঙে গেছে, খোলা আকাশের নিচে থাকতে হচ্ছে, এরকম কাউকে পাওয়া গেলে তাৎক্ষণিক ঘর তৈরি করে দেওয়ার নির্দেশও দেওয়া রয়েছে। সেক্ষেত্রে এই সহায়তা সরকারের কোন কর্মসূচির আওতায় কিংবা এ সহায়তা দেওয়া যাবে কী যাবে না এসব বিবেচনায় না নেওয়ারও নির্দেশ রয়েছে।আগে প্রতিটি মানুষের ঘরে খাবার ও মাথার ওপর ছাদের ব্যবস্থা নিশ্চিত করার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। রাজধানী থেকে প্রতিনিয়ত বিষয়টি মনিটর করছেন সরকারের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণমন্ত্রী মোফাজ্জল হোসেন চৌধুরী মায়া ও সচিব শাহ্ কামাল।
এবারের ঈদে বন্যার্ত মানুষের জন্য ঈদের বিশেষ বরাদ্দ না থাকলেও তাদের প্রতি সরকারের সুনজর রয়েছে বলে বাংলা ট্রিবিউনকে জানিয়েছেন, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের সচিব শাহ্ কামাল।
তিনি জানিয়েছেন, স্বাভাবিক ত্রাণ সহায়তা কার্যক্রম তো চলছে। এর বাইরেও দেশের সবখানে জেলা প্রশাসকদের নেতৃত্বে জিআর চাল ও নগদ টাকা সহায়তা দেওয়া আছে। এর বাইরেও জেলা প্রশাসকদের চাহিদামতো চাল ও নগদ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হচ্ছে এবং হবে। এর জন্য সংশ্লিষ্ট বিভাগ ও মন্ত্রণালয় সার্বক্ষণিক কাজ করছে। বন্যা দুর্গত মানুষের পাশে থাকার জন্য এ মন্ত্রণালয় ও সংশ্লিষ্ট বিভাগের সব শ্রেণির কর্মকর্তা কর্মচারীদের ঈদের ছুটিও বাতিল করা হয়েছে বলে জানান সচিব। এটিকে যদিও ঈদের বিশেষ বরাদ্দ বলা যাবে না। তবে সরকারের মূল লক্ষ্য হচ্ছে দেশের বন্যা দুর্গত এলাকায় যেন একজন মানুষও কোনও কারণে খাবারের কষ্ট না পায় তা নিশ্চিত করা। ঈদকে কেন্দ্র করে সরকারের এই বিশেষ দৃষ্টি রয়েছে।
সরকারের এই বিশেষ কর্মসূচি বাস্তবায়ন করতে মাঠে কাজ করছেন জেলা প্রশাসক ও ইউএনওরা। তাদেরকে সহায়তা করছেন নিজ নিজ এলাকার জনপ্রতিনিধি, রাজনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলো। অনেক এলাকায় স্থানীয় সুধীজনরাও এগিয়ে এসেছেন এই সময়ে বন্যার্তদের পাশে থাকার জন্য। যেখানেই সমস্যার কথা জানছেন, সেখানেই প্রয়োজনীয় সহায়তা নিয়ে ছুটে যাচ্ছেন তারা। কেন্দ্র থেকে বিষয়টি মনিটর করছেন মন্ত্রী ও সচিব।
প্রায় প্রতি মূহুর্তেই ডিসি ও ইউএনও’র কাছ থেকে খোঁজ নিচ্ছেন, কথা বলছেন বন্যা কবলিত জেলার সার্বিক বন্যা পরিস্থিতির বিষয়ে।
বন্যা দুর্গত এলাকাগুলোকে গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনায় নিয়ে এবারের কোরবানির ঈদে বন্যা দুর্গত শতভাগ মানুষের পাশে থাকার জন্য সরকার বিশেষ নজর রাখছে বলেও জানান সচিব।
তিনি জানান, জিআর, খাদ্যবান্ধব ও ভিজিএফসহ সব ধরনের সহায়তা কার্যক্রম চালু আছে। প্রতি জেলায় পর্যাপ্ত পরিমাণের টিন ও নগদ টাকাও বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। যা ডিসিদের কাছে আছে। চাহিদা মাত্র মানুষের হাতে তা পৌঁছে দেওয়ার জন্য কাজ চলছে।
সুনামগঞ্জের জেলা প্রশাসক সাবিরুল ইসলাম টেলিফোনে বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘আমরা মাঠ পর্যায়ে কাজ করছি। ইউএনওরাও কাজ করছেন। এর সঙ্গে যুক্ত রয়েছেন জেলার সকল শ্রেণির জনপ্রতিনিধিরা। বন্যা দুর্গত এলাকার ঘরে ঘরে গিয়ে খোঁজ নিচ্ছি কোথাও কোনও ধরনের সমস্যা আছে কিনা। ঈদের দিন এলাকার একজন মানুষের ঘরেও যাতে খাবারের সংকট না থাকে এবং একজন মানুষও যাতে খোলা আকাশের নিচে না থাকে সে বিষয়টি নিশ্চিত করছি। এলাকার রাজনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলোও এ কাজে প্রশাসনকে সহায়তা করছে।’
গত ১২ জুন রাতে প্রবল বর্ষণে রাঙামাটি, বান্দরবান, খাগড়াছড়ি ও চট্টগ্রামসহ দেশের ছয় জেলায় দেড় শতাধিক মানুষের প্রাণহানি হয়। পাহাড়ের ভূমি ধসে ১৬৬ জন মানুষের মৃত্যু হয়েছে বলে জানিয়েছে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা মন্ত্রণালয়। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে রাঙামাটি জেলা। এই জেলায় মারা গেছেন ১২০ জন মানুষ। জেলা প্রশাসনের হিসাবে শুধু রাঙামাটি পাহাড় ধসে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের সংখ্যা প্রায় দুই হজারের মতো। এর বাইরেও রয়েছে বান্দরবান, খাগড়াছড়ি, চট্টগ্রামের একটি অংশ ও কক্সবাজার জেলা। এই দুর্ঘটনায় কাছের মানুষ যারা হারিয়েছেন তাদের মুখে হাসি নেই এই ঈদে। বন্যার্ত এলাকার পাশাপাশি এদের প্রতিও সরকারের বিশেষ নজর রয়েছে বলে জানিয়েছেন সচিব শাহ্ কামাল। এ সব জেলার জেলা প্রশাসনকেও বিশেষ নজর রাখার জন্য নির্দেশনা দেওয়া রয়েছে বলে জানিয়েছেন তিনি। এ সব জেলার ত্রাণ সহায়তা কার্যক্রমও মনিটর করা হচ্ছে।
সচিব জানিয়েছেন, ওই দুর্ঘটনায় যারা বেঁচে আছেন তাদের অনেকেই আহত হয়েছেন। কেউ পঙ্গু হয়েছেন। কেউ বাড়িঘর হারিয়েছেন। কেউ হারিয়েছেন সহায় সম্বল।
দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের হিসাব মতে ৩০ আগস্ট রাত ৮টা পর্যন্ত দেশের মোট ৬৪ জেলার মধ্যে ৫০ শতাংশ অর্থাৎ ৩২ জেলা বন্যা কবলিত হয়েছে। এ সব জেলায় ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের মোট সংখ্যা ৭৪ লাখ ৮২ হাজার ৬৩৭ জন।
এবারের বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত জেলাগুলো হচ্ছে- ঢাকা জেলার বিস্তীর্ণ এলাকাসহ নীলফামারী, গাইবান্ধা, বগুড়া, সিরাজগঞ্জ, ফরিদপুর, টাঙ্গাইল, মানিকগঞ্জ, মাদারীপুর, মুন্সীগঞ্জ, নাটোর, চাঁদপুর, কুমিল্লা, শেরপুর, দিনাজপুর, জামালপুর, ঠাকুরগাঁও, পঞ্চগড়, ময়মনসিংহ, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, রাজবাড়ী, নওগাঁ, জয়পুরহাট, যশোর, মৌলভীবাজার, কুড়িগ্রাম, লালমনিরহাট, রংপুর, সিলেট, সুনামগঞ্জ, নেত্রকোণা ও রাঙামাটি জেলার বিস্তীর্ণ জনপদ এই দফায় বন্যার কবলে পড়েছে। বন্যার পানিতে এ সব জেলার ১০ হাজার ৫৮৩ হেক্টর ফসলি জমি সম্পূর্ণ এবং ৬ লাখ ৫৮৭ হেক্টর জমি আংশিক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এ সব জেলার মধ্যে ক্ষতিগ্রস্ত পৌরসভার সংখ্যা ৫১টি। উপজেলার সংখ্যা ২০১টি।
দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের উপসচিব জি এম আব্দুল কাদের বাংলা ট্রিবিউনকে জানান, বন্যা কবলিত ৩২ জেলার মধ্যে ২০ জেলায় এ পর্যন্ত ১৩২ জনের মৃত্যু হয়েছে। বন্যায় ৬ লাখ ৬২ হাজার ১৫৬টি বসতভিটা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এর মধ্যে ৭৫ হাজার ৩৩১টি ঘর সম্পূর্ণ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বাকি ঘর আংশিক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে জানিয়েছে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের অধীনস্থ ন্যাশনাল ডিজাস্টার রেসপন্স কো অর্ডিনেশন সেন্টার (এনডিআরসিসি)।
মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, বন্যা কবলিত ৩২ জেলার বন্যা দুর্গতদের জন্য এ পর্যন্ত ২০ হাজার ৭১৮ মেট্রিক টন চাল, ৫৫ হাজার প্যাকেট শুকনো খাবার ও ৯ কোটি ৫৯ লাখ ৪০ হাজার নগদ টাকা বিতরণ করা হয়েছে।
বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র সূত্রে জানা গেছে, এ যাবত শরীয়তপুর, ফরিদপুর, মুন্সিগঞ্জ, মানিকগঞ্জ, রাজবাড়ীর নিম্নাঞ্চলের বন্যা পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হতে শুরু করেছে। পদ্মা নদীর পানি কমতে শুরু করা ও বৃষ্টিপাত না হওয়ায় দেশের মধ্যাঞ্চল বলে খ্যাত এসব জেলার বন্যা পরিস্থিতির উন্নতি হয়েছে বলে জানিয়েছে বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র। এ ছাড়াও দেশের উত্তরাঞ্চলের জেলাগুলোয় বন্যা পরিস্থিতি আগে থেকেই উন্নতি হচ্ছে।