পুরান ঢাকায় অসহায় মানুষের জন্য কোরবানি

 

পুরান ঢাকায় অসহায় মানুষের জন্য কোরবানিপশু কোরবানির মাধ্যমে কে কত বেশি ত্যাগী হতে পারেন, কে কত অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়াতে পারেন; পুরান ঢাকায় বংশ পরম্পরায় চলে আসছে এমন প্রতিযোগিতা। ডজন ডজন পশু কোরবানি করছেন তারা। সব মাংস অসহায় মানুষের মাঝে বিলিয়ে দেওয়ার রেওয়াজও ধরে রেখেছেন। স্থানীয়ভাবে এই কোরবানিকে বলা হয় ‘সমাজের কোরবানি’ বা ‘অসহায় মানুষের জন্য কোরবানি’। পারিবারিক এতিহ্য ধরে রাখতে অনেকেই বিদেশ থেকেও দেশে আসেন ঈদুল আজহাতে। যাতে গরিব মানুষ ঈদের আনন্দ থেকে বঞ্চিত না হন। এবছরও তার ব্যতিক্রম ঘটেনি। শনিবার ভোরে পুরান ঢাকার নারিন্দা, মালিটোলা, সুরিটোলা, কলতাবাজার, তাতিবাজার, বংশাল ও ধোলাইখাল এলাকায় ঘুরে এমন চিত্র দেখা গেছে।

পুরান ঢাকার আদি বাসিন্দারা বাংলা ট্রিবিউনকে তাদের মহৎ ত্যাগের কথা ব্যক্ত করেন।

পুরান ঢাকার শিটের ব্যবসায়ী বংশালের বাসিন্দা আহসান হাসান (৪৫) বলেন, ‘আমি ছোটবেলা দেখেছি দাদা একসঙ্গে ৬ থেকে ৭ টি পশু কোরবানি দিতেন। তিনি নিজেই হাটে গিয়ে পশু কিনতেন। আবার কোরবানির দিন দাঁড়িয়ে থেকে কোরবানি দিতেন। পশুর সব মাংস আমাদের এলাকায় যারা কোরবানি দিতে পারতো না, তাদের বিলিয়ে দিতেন। তখন পুরো পুরান ঢাকায় এতো লোক ছিল না। সবাই সবাইকে খুব ভালো করে চিনতো।’

তিনি বলেন, ‘তখন সবাই সবার বাসার খবর রাখতো। দাদা সেই অনুযায়ী কোরবানি দিতেন। বর্তমানে আমরা কোরবানির আগে পরিবারের সবাই বসে একটা হিসাব করি। কত পরিবার আমাদের এলাকায় কোরবানি দিচ্ছে না। তারপর পশু কিনতে যাই। প্রতিটি পাড়া-মহল্লা কিংবা পঞ্চায়েতের কাছে গরিব ও অসহায় মানুষের একটি তালিকা রয়েছে। আমরা তালিকা অনুযায়ী কোরবানি দিয়ে প্যাকেট করে মাংস সরবরাহ করি। এই তালিকায় নিজেদের গরিব আত্মীয় স্বজনও থাকে।’

তিনি আরও বলেন, ‘আমরা ব্যবসা করি, আমাদের প্রতিষ্ঠানে অনেক কর্মচারিও থাকে। তাদের দিকটিও মাথায় রাখি আমরা। তারা বিভিন্ন এলাকা থেকে আসলেও তাদের কোরবানিতে যেতে দেই না। তারা কোরবানির পর মাংস নিয়ে পরিবারের সঙ্গে ঈদ করতে যায়।’

পারিবারিক এতিহ্য ধরে রাখতে অনেকেই বিদেশ থেকেও দেশে আসেন এই ঈদুল আজহাতে। যাতে গরিব মানুষ ঈদের আনন্দ থেকে বঞ্চিত না হন। পাড়া-মহল্লা কিংবা পঞ্চায়েতের অসহায়-গরিব মানুষদের মাংস দান করার জন্যই এ মহৎ কাজটি তারা করছে সাত পুরুষ ধরে। এই রেওয়াজ ধরে রেখেছেন উত্তরসূরিরা। এসব ঐতিহ্যবাহী পরিবারগুলোর সদস্যরা এমন ত্যাগ করতে পেরে গর্বিত।

নারিন্দার সৌদি প্রবাসী রাজ্জাক বাংলা ট্রিবিউন জানান, ‘তিনি পরিবার নিয়ে সঙ্গে ঈদ করতে বাড়িতে এসেছেন। তারা ছয় ভাই। সবাই কোরবানি দেবেন আলাদা। গরিব মানুষের জন্য আলাদা দুটি গরু কিনছেন। তা কোরবানি দিয়ে অসহায় মানুষকে মাংস নিতে বলেছেন।’

তিনি বলেন, ‘বাবা-দাদাদের ঐতিহ্য তারা ধরে রেখেছেন। ঈদের পরে তিনি পরিবার নিয়ে আবার সৌদি আরব যাবেন। সাধারণ মানুষকে এভাবে ঈদের আনন্দ ভাগ করে দিতে পেরে তিনি খুশি।’

পুরান ঢাকায় ঘুরে এমন অন্তত ২৪ থেকে ২৫ টি পরিবার পাওয়া গেছে। যারা সমাজে কোরবানি দিয়ে থাকেন। এরা অন্তত ৫০ থেকে ৬০ টি পশু কোরবানি দেন। যারা নিজেরা কোনও মাংস নেন না। একেকটি পরিবার একটি থেকে শুর করে সর্বোচ্চ ১০ টি পশু কোরবানি দেয় অসহায় মানুষের জন্য। এর পেছনে একটি মহতি উদ্যোগ রয়েছে। ত্যাগের মহিমায় তারা উদ্ভাসিত।

মালিটোলার বাসিন্দা হাফেজুর রহমান বলেন, ‘ব্রিটিশ আমল থেকেই এমন ঐতিহ্য ছিল। তখন প্রজাদের সবার কোরবানি দেওয়ার সামর্থ ছিল না। যাদের অবস্থা ভালো ছিল তারা গরিবের জন্য কোরবানি দিয়ে তা বিলিয়ে দিতো। এই কাজটি কয়েকজন মিলে করতেন। তাদের মধ্যে মলিটোলার প্রয়াত হাজি মাইনুদ্দীন ও বংশালের হাজি মাজহারুল হক অন্যতম। তারা নিজেরাই ডজন ডজন পশু কোরবানি দিয়ে মানুষের মাঝে বিলিয়ে দিতেন। কোরবানির দিন থেকে পরবর্তী তিন দিন ধরে তারা কোরবানি দিতেন। হাজি মাজহারুল হক দানশীল ছিলেন। তিনি গরিব ও অসহায় মানুষকে বিভিন্নভাবে সহযোগিতা করতেন। পুরান ঢাকার ওসমান গনি রোড তার বাবা নামানুসারে।

তিনি বলেন, ‘মূলত তাদের দুজনের বংশে যারা আছেন তারাই এই সমাজে অসহায় মানুষের নামে কোরবানি দেন। তারা এলাকায় দানশীল হিসাবেই পরিচিত।’

নাজিমউদ্দিন রোডের বাসিন্দাদের মধ্যেও রয়েছে এমন কোরবানি দেওয়ার ঐতিহ্য। প্রতিবছরের মত এবারও ব্যতিক্রম হয়নি ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের ২৭ নম্বর ওয়ার্ডের (পুরাতন ৬৩) সাবেক কমিশনার শাহিদা মোরশেদের বাড়িতে। প্রতি বছরের ন্যায় এবারও তার পরিবার একাধিক পশু কোরবানি দিচ্ছেন অসহায় মানুষের জন্য।

অপরদিকে পুরান ঢাকার ইতিহাস থেকে জানা যায়, কে কত দান করতে পারে এনিয়ে পুরান ঢাকার বিত্তবানদের মধ্যে সুষ্ঠু প্রতিযোগিতা লাভবান হতেন গরিবার। বংশালের ব্যবসায়ী মরহুম হাজি বদরুদ্দিন ওরফে ভূট্টো হাজির সঙ্গে ঢাকার নওয়াব খাজা আব্দুল গনির সঙ্গে এমন প্রতিযোগিতা ছিল।

পুরান ঢাকার পঞ্চায়েত সমাজকল্যাণ পরিষদের সাধারণ সম্পাদক মো. রহমত উল্লাহ বলেন, ‘অসহায়ের জন্য পুরান ঢাকায় যে পরিমাণ কোরবানি হয়, তা বাংলাদেশের আর কোথাও হয় না।’

উদাহরণ দিয়ে তিনি বলেন, ‘তার দাদার নাম রবিউল্লাহ বেপারী। তিনি মাহুতটুলীতে থাকতেন। তিনি একসময় একাই অনেক পশু কোরবানি দিতেন। পরবর্তীতে আমার বাবা-চাচা তিন ভাই মিলে অসহায়ের জন্য কোরবানি দিতেন। এখন আমরা দেই। এটা কোন লোক দেখানোর জন্য না।’