ঈদের দিনেও শুধু ডাল-ভাত খেয়েছেন যারা

 


রাজধানীতে তৃণমূলকোরবানির ঈদে রাজধানীজুড়ে গরু ও খাসির মাংসের ছড়াছড়ি। যেন এ শহরে এমন কেউ নেই, যিনি এ দিন মাংস-ভাত-রুটি খাননি। কিন্তু অপ্রিয় হলেও সত্য, রাজধানীতে এমন অনেকেই রয়েছেন, যারা কোরবানির ঈদের দিনও পার করেছেন একটু ডাল আর ভাত খেয়ে। তাদের খাওয়ার প্লেটে পড়েনি এক টুকরা মাংস। সকালে পরোটার সঙ্গে ডাল-ভাজি অথবা ভর্তা দিয়ে গরম ভাত খেয়ে বেরিয়েছেন কর্মস্থলে। অনেকে নেমেছেন রাজপথে রোজগারের সন্ধানে। এই শ্রেণির মানুষ দুপুরেও খেয়েছেন শুধু ডাল-ভাত।  কর্মস্থলে ঈদের সময় দায়িত্ব পালন করেছেন, এমন কয়েকটি দোকানের  কর্মচারী ও শ্রমজীবী মানুষের সঙ্গে কথা বলে এমন চিত্র পাওয়া গেছে।

শ্রমজীবীরা বলছেন, ঈদের সময় অধিকাংশ দোকান, বাজার, বিপনি বিতান বন্ধ থাকলেও রাজধানীতে খোলা রয়েছে ওষুধ ও মিষ্টির দোকান। সকালের দিকে মসলার দোকানগুলো খোলা থাকলেও দুপুরের পর বন্ধ দেখা গেছে। এসব দোকানে যে সব কর্মচারী বাড়তি রোজগারের আশায় ঈদের দিন কাজ করেছেন, তারাই এভাবে দিন পার করেছেন। এছাড়া ঢাকায় রয়ে গেছেন তৃণমূল মানুষ, সিএনজি ও রিকশাচালক। তারা যে মালিকদের প্রতিষ্ঠানে কাজ করছেন, সেই মালিকদের বাসা থেকেও আসেনি এক টুকরা মাংস।

নওগাঁর দোকান কর্মচারী কবির হোসেন। কাজ করেন মগবাজার এলাকায় মা ফার্মেসিতে। থাকেন শান্তিবাগের এক মেসে। গতকালও রাত ১২টার পর দোকান বন্ধ করে মেসে ফিরেছেন। সকালে পরোটার সঙ্গে ডাল আর ভাজি দিয়ে নাস্তা সেরেছেন মালিবাগের একটি দোকানে। কোরবানির সময় নানা ধরনের ওষুধের প্রয়োজন হয়। এই বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে রাজধানীর প্রায় ৮০ শতাংশ ওষুধের দোকানই খোলা। তাই কবির হোসেনও মালিকের নির্দেশে ফার্মেসি খুলেছেন। কাজ করছেন বিকাল পর্যন্ত। এই প্রতিবেদকের সঙ্গে কথা হয় বেলা ২টায়। সবেমাত্র দুপুরের খাবার খেয়ে দোকানে বসেছেন।

জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘তেলাপিয়া মাছ, করলা ভাজি আর মসুর ডাল দিয়ে দুপুরের খাবার খেয়েছি।’ খাবার সঙ্গে করে নিয়ে এসেছেন মেস থেকেই। গরুর মাংস খাননি? জানতে চাইলে সে জানায়, কোথায় পাবো? কে দেবে? আমি তো কোরবানি দেইনি। মালিকের বাসা থেকেও আসেনি? জানতে চাইলে মাথা নিচু করে থাকেন তিনি। ঈদের দিন এক টুকরা গরুর মাংস খেতে পারলেন না, এতে কষ্ট হয় না? এমন প্রশ্নের জবাবে কবির হোসেন জানান, ‘রাতে খাব। মালিবাগ বাজার থেকে এক ভাগ মাংস কিনে নিয়ে যাব। গরুর মাংসের আবার ভাগ হয় নাকি—জানতে চাইলে তিনি জানান, ‘সারাদিন যারা রাজধানীর বিভিন্ন বাসাবাড়িতে মাংস সংগ্রহ করেন, তারাই প্রয়োজনের টুকু রেখে অতিরিক্ত মাংস ভাগ দিয়ে বিক্রি করেন। সেখান থেকে একভাগ ভাগ মাংস কিনব।’     

একই ধরনের কথা বাংলা ট্রিবিউনকে জানিয়েছেন পুরানা পল্টন এলাকার একটি মিষ্টি দোকানের কর্মচারী আবুল হোসেন। তখন বেলা সাড়ে ৩টা। শরীয়তপুরের আবুল হোসেন জীবিকার প্রয়োজনে গত দুই বছর ধরে কাজ করেন এই মিষ্টির দোকানে। স্ত্রী ও এক কন্যা সন্তান নিয়ে সাবলেট থাকেন নারিন্দা এলাকার একটি বাসায়। তিনি বাংলা ট্রিবিউনকে জানান, ‘কোরবানি দেওয়ার সামর্থ্য নেই। সকালে গরম ভাত খেয়েছি ডিম ভাজা আর পাতলা ডাল দিয়ে। দুপুরের জন্য সঙ্গে এনেছিলাম ব্রয়লার মুরগীর মাংস আর ছিচিঙ্গা ভাজি। তাই খেয়েছি।’ কোরবানির দিন, গরুর মাংস খেলেন না? এমন প্রশ্ন করতেই আবুল হোসেন জানান, ‘২/৪জন আত্মীয় আছেন, যারা রাজধানীতেই থাকেন, কোরবানিও দিয়েছেন। সেই সব আত্মীয়  ও আমি যে বাসায় সাবলেট থাকি তারা যদি কোরবানির মাংস পাঠান, তাহলে তো আর কথা নেই। রাতে গরুর মাংসের তরকারি দিয়েই মেয়েকে নিয়ে ভাত খাব।’   

জামালপরের দিনমজুর কেরাম আলী। এলাকায় দিনমজুরের কাজ করলেও এখন সেখানে বন্যা। পানি আর পানি। কাজ নেই। ঘরে খাবার নাই। সংসার চালাতে তো টাকার প্রয়োজন। কাজ না করলে সেই টাকা পাবেন কই? তাই রাজধানীতে এসেছেন ২০দিন আগে। উদ্দেশ্য ভ্যান চালাবেন। তার ধারণা ঢাকায় একবেলা ভ্যান চালালে  ১ হাজার থেকে ১২০০ টাকা রোজগার করা সম্ভব। তাই ঢাকায় নেমেই রাজধানীর মান্ডা এলাকায় পরিচিত একজনের মাধ্যমে একটি গ্যারেজ থেকে একটি ভ্যান নিয়ে নেমে পড়েন রাস্তায়। ভ্যানের দৈনিক জমা দিতে হয় ১২০ টাকা।  রাতে ফিরে খাওয়া-দাওয়া সবই ওই গ্যারেজে। থাকা-খাওয়া বাবদ গ্যারেজ ম্যানেজারকে দিতে হয় আরও ১২০ টাকা। বিনিময়ে কেরামত আলী সকালে আলু ভর্তা বা ভাজি আর পাতলা ডাল দিয়ে গরম ভাত খেয়ে ভ্যান নিয়ে চলে আসেন কাওরানবাজার। পুরো একবেলা ভ্যান চালিয়ে দুপুরে এসে যেকোনও ধরনের মাছ বা ব্রয়লার মুরগির মাংস ও সবজি দিয়ে ভাত খেয়ে কিছুটা সময় বিশ্রাম নিয়ে আবারও রাস্তায় নামেন রিকশা নিয়ে। রাত পর্যন্ত চালান রিকশা। আর রাতে যখনই ফেরেন তখন ওই একই ধরনের খাবার খেয়ে গ্যারেজের পাটাতনের ওপরই ঘুমিয়ে পড়েন। এই নিয়মেই চলছে গত ২০ দিন। যা কোরবানির ঈদের দিনও অব্যাহত রয়েছে।

বাসাবাড়ি থেকে কোরবানির মাংস সংগ্রহ করে বিক্রি করছেন ছিন্নমূল মানুষেরা। ছবিটি খিলগাঁও রেলগেট থেকে তোলা (ফোকাস বাংলা)

বাংলা ট্রিবিউনের এই প্রতিবেদকের সঙ্গে কেরামত আলীর কথা হয় কমলাপুর রেল স্টেশনে। তখন সকাল সাড়ে ৮টা। ঈদের দিনেও রাস্তায় কেন, জানতে চাইলে কেরামত আলী জানান, আমরা গরিব মানুষ। আমাদের আবার ঈদ। প্রায় এক মাস হতে চললো ঢাকায় এসেছি। এলাকায় কাজ নেই। দুই ছেলেমেয়েসহ ৪ জনের সংসার। সংসার চালাতে তো টাকা লাগে। তাই রোজগানের সন্ধানে ঢাকায় এসেছি। ঈদের সময় ছেলেমেয়েগুলোর জন্য মন টানে। কিন্তু কী আর করার? টাকার জন্য ঢাকায় এসেছি। সেই টাকা রোজগার না করে যদি বাড়ি গিয়ে ঈদের দিন বসে থাকি তাহলে তো আর চলবে না। তাই ঈদে বাড়ি যাইনি। ছেলেমেয়ের জন্য মাংস কেনার জন্য টাকা বিকাশে পাঠিয়েছি। ওরা সেই টাকা দিয়ে মাংস কিনে খাবে বলে মোবাইল করে জানিয়েছে।

ঈদের সময় আপনি কেন গেলেন না—জানতে চাইলে কেরামত আলী বলেন,  ‘কিছু বাড়তি আয়ের জন্যই যাইনি। ঈদের দিন রিকশা নিয়ে সকালেই নেমেছি। কাউকে স্টেশনে, কাউকে ঈদগাঁয়ে নামিয়েছি। ঈদের দিন বলে যাত্রীরা নির্ধারিত ভাড়ার কিছু বেশিই দিয়েছেন।’ মুখে একরাশ হাসি দিয়ে কেরামত আলী জানালেন, ‘আজ ঈদের দিন রাত পর্যন্ত রিকশা চালিয়ে যা পাব, তা নিয়ে কাল রবিবার সকালে বাড়ির উদ্দেশ্যে রওনা হবো।

শুধু কেরামত আলীই নয়, শনিবার কোরবানির ঈদের দিন বেলা সোয়া ১০টার দিকে মতিঝিল সোনালী ব্যাংকের সামনে কথা হয় রাজবাড়ির সেলিম মিয়ার সঙ্গে। সিএনজি নিয়ে বসে আছেন। জানতে চাইলে সেলিম মিয়া বাংলা ট্রিবিউনকে জানান, ‘ঈদের দিন, গাড়ি কম। পাবলিক বাস তেমন চলে না। কিন্তু যারা ঈদে গ্রামে যাননি তারা নিজের বাসার কাজকর্ম সেরে আত্মীয় স্বজনের বাসায় বেড়াতে যায়, তখন তাদের কাছে সিএনজিই একমাত্র ভরসা। এছাড়া ছোট ছেলেমেয়েরা দল বেঁধে ঈদের দিন শিশুপার্ক, জাদুঘর, চিড়িয়াখানায় ঘুরতে যায়। তাদেরও বাহন এই সিএনজি। ঈদের সময় বলে যাত্রীর সঙ্গে দরদাম করতে হয় না। মিটারে যেতে হয় না। পুলিশের বাড়াবাড়ি থাকে না। সবচেয়ে বড় কথা হচ্ছে রাস্তায় জ্যাম নেই। ট্রিপ নিয়ে খুব অল্প সময়ের মধ্যেই গন্তব্যে পৌঁছানো যায়। তাই আয়ও হয় ভালো।’

এক প্রশ্নের জবাবে সেলিম মিয়া বলেন, ‘আমরা গরিব মানুষ। ডাল-ভাত খেয়ে বেঁচে থাকতে পারলেই আল্লার কাছে হাজার শুকরিয়া আদায় করি। কোরবানি দেওয়ার সামর্থ্য নেই। এছাড়া কারও কাছে হাত তো পাততে পারব না। তাই ব্রয়লার মুরগিই ভরসা।’