বাংলাদেশে পালিয়ে আসার পথ সহজ ছিল না রোহিঙ্গাদের জন্য। পদে পদে ছিল মৃত্যুফাঁদ। দেশ থেকে তাড়া খেয়ে পালিয়ে আসার সময় অনেক রোহিঙ্গাই স্বজন হারিয়েছেন। কেউ মিয়ানমারের সেনাদের হাতে,কেউ নৌকা ডুবিতে প্রাণ হারিয়েছেন। আবার কেউ কেউ জঙ্গল ও পাহাড়ে হারিয়ে গেছেন। কারও কারও লাশ মিলেছে, কারও মেলেনি। বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গাদের সঙ্গে কথা বলে এসব কথা জানা গেছে।
২০ বছরের আসমিরার বিয়ে হয় ১৬ বছর বয়সে। স্বামী আজিজুল হকের সঙ্গে থাকতেন মিয়ানমারের বুচিদং থানার সাংগামা পাড়ায়। বাবার বাড়িও একই জায়গায়। মিয়ানমারের সেনাবাহিনী তাদের বাড়িতে আগুন দেওয়ার পর শ্বশুর ও বাবার বাড়ির সবাই একইসঙ্গে বাংলাদেশের দিকে রওনা দেন। ১৩ দিন ধরে তারা পাহাড়-জঙ্গল পাড়ি দিয়ে বৃহস্পতিবার (৭ সেপ্টেম্বর) বিকালে উখিয়ার বালুখালী পৌঁছান। তার কোলে দুই বছরের মেয়ে। শ্বশুর বাড়ির সবাই বাংলাদেশে আসতে পারলেও তার স্বামী, মা-বাবা ও ভাই-বোন কাউকেই খুঁজে পাচ্ছেন না। অথচ বাবা আবুল কালাম (৬০), মা খোদেজা বেগমকে (৫০)সঙ্গে নিয়েই রওনা হয়েছিলেন।
আসমিরা বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন,‘আমার দুই ভাই জোনাব ও সোয়াব। তারা বিয়ে করেছে। বউ নিয়ে আলাদা থাকে। ৯ বোনের মধ্যে ২ জনের বিয়ে হয়েছে। বাকিরা বাবা-মায়ের সঙ্গেই ছিল। তারাও বাংলাদেশে আসতেছিল। কিন্তু পথের মধ্যে হঠাৎ তারা হারিয়ে গেছে।’
তিনি বলেন,‘তারা কোথায় আছে,কি করছে,জানি না। আসার পথে অনেক মানুষ মিলিটারির হাতে আটক হয়েছেন। তাদের ধরে নিয়ে গেছে মনে হয়।’
রোহিঙ্গা এই গৃহবধূ বলেন, ‘আমরা শিরহালি সীমান্ত দিয়ে পার হয়ে বুধবার (৬ সেপ্টেম্বর) রাতে আসছি। এই ১৩ দিন না খেয়ে হাঁটতে হয়েছে। বাচ্চা নিয়ে এখনও রাস্তায় আছি।’
ঘর-বাড়ি পুড়িয়ে দেওয়ার কারণে তিনি সঙ্গে কিছু নিয়ে আসতে পারেননি। সবাই যেদিকে হাঁটছে তিনিও সেদিকে হেঁটেছেন। প্রতিদিন রাতে সবাই জঙ্গলে একসঙ্গে থেকেছি।
তিনি বলেন, ‘মিয়ানমার সেনাবাহিনী কম বয়সী পোলাদের ধরে নিয়ে যায়। আমার স্বামী আজিজুলকেও নিয়ে যেতে পারে। আমি জানি না সে কোথায় আছে।’
জোহরা খাতুন নামে এক রোহিঙ্গা নারী বলেন, ‘আমার স্বামীর নাম আলী জোহর। তিন ছেলে ও তিন মেয়ে নিয়ে তিনি বাংলাদেশে এসেছি। স্বামী ও এক মেয়েকে খুঁজে পাচ্ছি না।’
রশিদা বেগম (২৫) বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় টেকনাফের লম্বাবিল সীমান্ত দিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করেছেন। তার মা দিল বাহার ও ভাই নূর হোসেনকে খুঁজে পাচ্ছেন না তিনি। তাকে হোয়াইটক্যং এলাকায় বসে কাঁদতে দেখা যায়।
বিলাপ করে কাঁদতে কাঁদতে তিনি বলেন, ‘আমার ভাই ও মাকে নিয়ে বাড়িতে ছিলাম। বাবা ছয় বছর আগে মারা গেছেন। ২৭ আগস্ট আমাদের বাড়িতে মিলিটারি আগুন দেয়। এরপর যে যার মতো করে পালিয়ে আসি। ভাইকে হয়তো মিলিটারি ধরে নিয়ে গেছে। তার মোবাইল বন্ধ। ভাই ও মা ছাড়া এই পৃথিবীতে তার আর কেউ নেই।’
রাখাইনের নাগপুরের বাসিন্দা মো.ইসলাম। তারা তিন ভাই। মো. ইয়াহিয়া, মো.ইসলাম ও মো. তাসকিন। নাগপুর গ্রামে ২৫ আগস্ট আগুন দেয় সেনাবাহিনী। এরপর তারা বাবাকে বাড়িতে রেখে পালিয়ে বাংলাদেশে আসেন। তবে ভাই ইয়াহিয়াকে এখনও খুঁজে পাচ্ছেন না। তার ভাগ্যে কী ঝুটেছে তাও তিনি জানেন না।
তিনি বলেন, ‘মিলিটারিরা সবসময় পুরুষদের টার্গেট করে হত্যা করে। আমরা দিনের আলোতে পালিয়ে থাকি পাহাড়ে। এরপর রাতের বেলা হাঁটতে থাকি। পুরুষ দেখলেই তারা গুলি করে হত্যা করে।’
ছবি: ফোকাস বাংলা
আরই পড়ুন: