কোরবানির পশুর হাট: দুই সিটির চেয়ে ইজারাদারের আয় ৯ গুণ বেশি

কোরবানির পশুর হাট, ফাইল ছবিরাজধানী ঢাকার ১৬টি অস্থায়ী কোরবানির পশুর হাট থেকে ১২৩ কোটি ৭৫ লাখ টাকা আয় করেছেন ইজারাদাররা। আর হাট থেকে ১৩ কোটি ৯৫ লাখ ৬৩ হাজার ৪২৯ টাকা রাজস্ব পেয়েছে ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ দুই সিটি করপোরেশন (ডিএসসিসি ও ডিএনসিসি)। এর মধ্যেও হাট পরিষ্কারসহ অন্যান্য কাজে সিটি করপোরেশনের আরও অন্তত দুই কোটি টাকা খরচ হয়েছে। ফলে এবছর হাট থেকে ১২ কোটি টাকার বেশি আয় করতে পারেনি সংস্থা দুটি। অভিযোগ উঠেছে, ক্ষমতাশীনদের সিন্ডিকেট ও কর্মকর্তাদের দুর্নীতির কারণে হাট ইজারা থেকে পর্যাপ্ত আয় করতে পারেনি সিটি করপোরেশন। ইজারাদারদের এমন আয়কে ‘অস্বাভাবিক’ বলে মন্তব্য করেছেন বিশেষজ্ঞরা।

দুই সিটি করপোরেশনের তথ্য অনুযায়ী, এবছর রাজধানী ঢাকায় ৪ লাখ ৭৫ হাজার কোরবানির পশু জবাই করা হয়েছে। এসব পশু রাজধানীর একটি স্থায়ী হাটসহ অস্থায়ী ১৬টি হাট থেকেই বেচা-কেনা হয়েছে। এর মধ্যে ৪ লাখ গরু-মহিষ ও ৭৫ হাজার ছাগল। সিটি করপোরেশনের গত বছরের তথ্যের সঙ্গে মিলিয়ে প্রতিটি গরু-মহিষের গড় মূল্য ৭০ হাজার টাকা ধরা হলে মোট ৪ লাখ পশুর মূল্য দাঁড়ায় ২ হাজার ৮০০ কোটি টাকা। ৭৫ হাজার ছাগলের গড় মূল্য ১০ হাজার টাকা করে ধরা হলে মোট হয় ৭৫ কোটি টাকা। সব মিলিয়ে এবছর দুই হাজার ৮৭৫ কোটি টাকার কোরবানি পশু বিক্রি হয়েছে। বিক্রিয় মূল্যের ৫ শতাংশ হারে ইজারাদার হাসিল আদায় করেছেন ১২৩ কোটি ৭৫ লাখ টাকা।

এদিকে, দুই সিটি করপোরেশনের হাট ইজারা বাবদ পেয়েছে ১৭ কোটি ৪৪ লাখ ৫৪ হাজার ২৮৬ টাকা। এর মধ্যে সিটি করপোরেশনকে ২০ শতাংশ (১৫ শতাংশ ভ্যাট ও ৫ শতাংশ আয়কর) হারে ভূমি রাজস্ব দিতে হয়েছে ৩ কোটি ৪৮ লাখ ৯০ হাজার ৮৫৭ টাকা। ফলে দুই সিটি করপোরেশনের তহবিলে কোরবানি পশুর হাট ইজারা বাবদ থাকছে ১৩ কোটি ৯৫ লাখ ৬৩ হাজার ৪২৯ টাকা। আর ইজারাদারদের আয় হয়েছে ১০৬ কোটি ৩০ লাখ ৪৫ হাজার ৭১৪ টাকা।

বাংলাদেশ মাংস ব্যবসায়ী সমিতির মহাসচিব রবিউল আলম বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘ঢাকাবাসী যে পরিমাণ পশু জবাই দেন সেসব পশুর প্রায় সবই ঢাকা থেকে কেনা হয়। কিন্তু ঢাকার বাইরের জেলার কোরবানিদাতা ও ব্যবসায়ীরাও ঢাকা থেকে ঈদের ৩-৪ দিন আগে পশু কিনে বিক্রি করেন। এ থেকেও ইজারাদাররা বিশাল অংশ খাজনা পান।’

কোরবানির পশুর হাট, ফাইল ফটো

তিনি আরও বলেন, ‘এবছর ইজারাদাররা অন্তত ১৬০ কোটি টাকা হাসিল আদায় করেছে। কিন্তু সিটি করপোরেশনের আয় হয়েছে মাত্র ১২ কোটি টাকা। যদি সিন্ডিকেট বা দুর্নীতি না হতো তাহলে সিটি করপোরেশন আরও কয়েকগুণ বেশি টাকা আয় করতে পারত।’

তিনি বলেন, ‘মাংস ব্যবসায়ীদের জন্য পশুপ্রতি নির্ধারিত খাজনা ১০০ টাকা। কোরবানির পশুর ক্ষেত্রে ৫ শতাংশ না করে যদি নির্ধারিত একটা অর্থ ধরে দেওয়া হয় তাহলে ভালো হয়। এক্ষেত্রে গরু বা মহিষ প্রতি সর্বোচ্চ ৫০০ টাকা করা যেতে পারে। এটা করা গেলে হাটকেন্দ্রিক এতো অনিয়ম হতো না।’

সিটি করপোরেশনের শর্ত মতে, হাটে হাসিল আদায়ের রশিদের কপিসহ কী পরিমাণ পশু বিক্রি হয়েছে তার একটি তথ্য সিটি করপোরেশনকে জমা দিতে হবে। কিন্তু অধিকাংশ ইজারাদারকে হাট শেষ হওয়ার পরপরই আর খুঁজে পায় না সিটি করপোরেশন। এমনকি নিজ দায়িত্বে হাট পরিষ্কার করে দেওয়ার কথা থাকলেও তাও করে না কোনও ইজারাদার। দু-একজন থেকে পশু বিক্রির তথ্য নেওয়া হলেও তা ঠিক নয়। নামকাওয়াস্তে একটা তথ্য দিয়েই দায় সেরে নেয় ইজারাদাররা।

ঈদ পরবর্তী সময়ে দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের মেয়র সাঈদ খোকন জানিয়েছেন, এবছর তার সংস্থায় দুই লাখ ৭৫ হাজারের মতো কোরবানি পশু জবাই হয়েছে। উত্তর সিটিতে জবাই হয়েছে ২ লাখ। ২০১৬ সালেও সমপরিমাণ পশু জবাই হয়েছে। কিন্তু ওই বছরের হাট ইজারাদারা সংস্থায় যে তথ্য জমা দিয়েছেন, তা থেকে দেখা গেছে, ডিএসসিসির ১৪টি হাটে মোট ১ লাখ ৭২ হাজার ৯৪৫টি গরু এবং ২৪ হাজার ৬২০টি ছাগল বিক্রি হয়েছে। যদি ইজারা দারের তথ্যই সঠিক হয় তাহলে সংস্থার অধীনে জবাই হওয়া বাকি পশু কোথায় থেকে এসেছে-এই প্রশ্ন সংশ্লিষ্টদের। অপরদিকে উত্তর সিটি করপোরেশনে এ সংক্রান্ত কোনও তথ্যই জমা দেননি ইজারাদাররা।

প্রতিবছরের মতো এবছরও ইজারাদারের পরিবর্তে ঢাকার কোরবানি পশুর হাটগুলোকে পরিষ্কার করতে হয়েছে সিটি করপোরেশনকে। এজন্য ঘোষিত সময়ের মধ্যে সংস্থা দুটি পশু কোরবানি পশুর বর্জ্য অপসারণ করতে পারেনি। তখন দুই সিটির বর্জ্য ব্যবস্থাপনার সমন্বয়ের দায়িত্বে থাকা দক্ষিণের মেয়র সাঈদ খোকন বলেছিলেন, ‘হাট ভেঙে যাওয়ার পর মেরাদিয়া হাটসহ কয়েকটি হাটের ইজারাদারকে খুঁজে পাওয়া যায়নি। সিটি করপোরেশনের পক্ষ থেকে আমরা হাটের বাঁশ-খুঁটিসহ অন্যান্য বর্জ্য অপসারণ করেছি। এবছর যারা ইজারার শর্ত ভঙ করেছেন তাদের জামানত বাতিল করে দেবো।’

গতবছর ১৪টি কোরবানির পশুর হাট থেকে ১০ কোটি এক লাখ ৭ হাজার ২৬৩ টাকা আয় করেছে দক্ষিণ সিটি করপোরেশন। কিন্তু এবছর সরকার নির্ধারিত দর না ওঠায় ৫টি হাট ইজারা দিতে পারেনি সংস্থাটি। হাটগুলোতেও আশানুরূপ দর পাওয়া যায়নি। এজন্য সংস্থার প্রধান সম্পত্তি কর্মকর্তাকে দায়ী করছেন অনেকেই। অভিযোগ রয়েছে, এই কর্মকর্তা অর্থের বিনিময়ে একটি সিন্ডিকেট তৈরি করে হাটগুলো ইজারা দিয়েছেন। কিন্তু দেশের বাইরে থাকায় এ বিষয়ে তার বক্তব্য নেওয়া যায়নি।

কোরবানির হাটে উট

কোরবানির হাটের এমন পরিস্থতি নিয়ে কথা বলার জন্য দুই সিটি করপোরেশনের ঊর্ধ্বতন কাউকে পাওয়া যায়নি। দক্ষিণ সিটির মেয়র মোহাম্মদ সাঈদ খোকন, প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা খান মো. বিলাল ও হাট ইজারা সংশ্লিষ্ট দফতর সম্পত্তি বিভাগের প্রধান সম্পত্তি কর্মকর্তা কামরুল ইসলাম চৌধুরী দেশের বাইরে রয়েছেন। সংস্থাটির ভ্রারপ্রাপ্ত মেয়রের দায়িত্বে থাকা সারোয়ার হোসেন আলোকে ফোন করলেও বন্ধ পাওয়া যায়।

উত্তর সিটি করপোরেশনের প্যানের মেয়র ওসমান গনির ফোন বন্ধ রয়েছে। সংস্থাটির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মেসবাহুল ইসলামকে বেশ কয়েকবার ফোন করলেও পাওয়া যায়নি। সম্পত্তি কর্মকর্তা আমিনুল ইসলামও ফোন ধরেননি।

হাট ইজারার রাজস্বর আদায় বিষয়ক এই সংকট প্রসঙ্গে জানতে চাইলে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘এক্ষেত্রে সিটি করপোরেশনকে দুটি পদক্ষেপ নিতে হবে। একটি স্বল্প মেয়াদী এবং অন্যটি দীর্ঘ মেয়াদী।’

তার মতে, স্বল্পমেয়াদী পদক্ষেপ হচ্ছে-যারা এই অনিয়মের সঙ্গে জড়িত তাদেরকে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দিতে হবে। তাহলে ভবিষ্যতে এ ধরনের কাজ আর হবে না। দ্বিতীয়ত, আইন করে সংশ্লিষ্ট সবাইকে জবাবদিহিতার আওতায় আনতে হবে। তাছাড়া এর সঙ্গে জড়িত সবাইকে সচেতন হতে হবে। রাষ্ট্রীয় বৃহৎ স্বার্থে যদি সবাই সচেতন হয় তাহলে এমন কাণ্ড আর ঘটাবে না।