রোহিঙ্গাদের ছড়িয়ে পড়া নিয়ে দুশ্চিন্তায় সরকার

রোহিঙ্গা সংকটকক্সবাজার ও এর বাইরে রোহিঙ্গাদের ছড়িয়ে পড়া নিয়ে সরকারের নীতিনির্ধারণী মহলে দুশ্চিন্তা দেখা দিয়েছে। গণহত্যার মুখে মিয়ানমার থেকে প্রাণ বাঁচাতে ছুটে আসা রোহিঙ্গাদের অনুপ্রবেশে বাধা না দিলেও তারা দেশের সর্বত্র ছড়িয়ে পড়ুক– তা চায় না সরকার। কেননা, এতে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটার আশঙ্কা রয়েছে। এ অবস্থায় রোহিঙ্গাদের ছড়িয়ে পড়া রোধে কঠোর অবস্থান নেওয়া হয়েছে।

সরকারের নীতিনির্ধারণী মহলে কথা বলে জানা গেছে, অনুপ্রবেশ নিয়ে উদ্বেগ না থাকলেও রোহিঙ্গাদের ছড়িয়ে পড়া নিয়ে দুশ্চিন্তা রয়েছে সরকারের ভেতরে। সরকারের বিভিন্ন সংস্থার ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারাও রোহিঙ্গাদের ছড়িয়ে পড়া ঠেকাতে পরামর্শ দিয়েছেন। তারা জানিয়েছেন, রোহিঙ্গাদের ছড়িয়ে পড়া ঠেকাতে না পারলে সারাদেশের স্বাভাবিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি বিঘ্নিত হতে পারে। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের একটি সূত্র এ তথ্য জানায়। 

রোহিঙ্গাদের ছড়িয়ে পড়া রোধ করতে ইতোমধ্যেই তৎপরতা শুরু করেছে সরকার। এজন্য বেশ কিছু পরিকল্পনাও হাতে নিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। জানা গেছে, রোহিঙ্গারা যাতে কোনোভাবেই সারাদেশে ছড়িয়ে পড়তে না পারে সেজন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে প্রধানমন্ত্রীর দফতর থেকে ইতোমধ্যেই দায়িত্বশীল সবাইকে বলা হয়েছে।

সরকারের দুজন মন্ত্রীও জানিয়েছেন, অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা এড়াতে সরকার চায় বাংলাদেশে ঢুকে পড়া রোহিঙ্গাদের একত্রে রাখার বিষয়টি নিশ্চিত করতে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাও সংশ্লিষ্ট সবাইকে রোহিঙ্গাদের ছড়িয়ে পড়া ঠেকাতে কড়া নজরদারির নির্দেশ দিয়েছেন। পররাষ্ট্রমন্ত্রী এএইচ মাহমুদ আলী বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘আমরা অনুপ্রবেশ করা রোহিঙ্গাদের একত্রে রাখার চেষ্টা করছি। তারা যাতে কোনোভাবেই কক্সবাজারের আশপাশের এলাকার বাইরে যেতে না পারে সেদিকে নজর দিচ্ছি।’  

 স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খাঁন কামাল বলেন, ‘সরকার এ পর্যায়ে রোহিঙ্গাদের একত্রে রাখার দিকে গুরুত্ব দিয়েছে। এজন্য বিভিন্ন এলাকা পরিদর্শন করা হচ্ছে।’ তিনি আরও বলেন, ‘ইতোমধ্যে কক্সবাজারের  কয়েকটি উপজেলায় অস্থায়ী আশ্রয়কেন্দ্র তৈরি করা হয়েছে। আপাতত তাদের একত্রে রাখার জন্যে সংশ্লিষ্টদের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।’  

জানা গেছে, রোহিঙ্গাদের একত্রে রাখার অংশ হিসেবে ইতোমধ্যে বেশ কিছু পদক্ষেপও নেওয়া হয়েছে। এরমধ্যে অন্যতম হলো রোহিঙ্গাদের জন্যে নির্দিষ্ট স্থানে আশ্রয়কেন্দ্র গড়ে তোলা, ছবিসহ আইডি কার্ড ও তালিকা করা ইত্যাদি। তালিকায় তাদের নাম, মিয়ানমারের কোন এলাকা থেকে অনুপ্রবেশ করেছে সেই স্থানের নাম, ছবি এবং সম্ভব হলে ফিঙ্গার প্রিন্ট সংগ্রহের প্রক্রিয়া শুরু করা হয়েছে।

এরই মধ্যে রোহিঙ্গাদের সঠিক সংখ্যা নির্ধারণ করতে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ও একটি রোহিঙ্গা সেল গঠন করেছে। রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশ সম্পর্কিত প্রতিদিনের তথ্য, পুশব্যাক সম্পর্কিত তথ্য, চিহ্নিত বা নির্ধারিত স্থানের মধ্যে রোহিঙ্গাদের অবস্থান সীমাবদ্ধ রাখা সম্পর্কিত গৃহীত সর্বশেষ ব্যবস্থাসহ ১০ ধরনের কাজে যুক্ত থাকবে এই সেল। এ প্রসঙ্গে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আরও বলেন, ‘যারা নিবন্ধনের আওতায় আসবে না, তারা কোনও প্রকার সহায়তা পাবে না।’

কয়েকটি সূত্র জানায়, রোহিঙ্গারা বিভিন্ন অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়লে নানা ধরনের অপরাধের সঙ্গে তারা জড়িয়ে পড়তে পারে। রোহিঙ্গাদের আশ্রয়দাতারা তাদের অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের দিকে ঠেলে দিতে পারে। এর ফলে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি অস্বাভাবিক পর্যায়ে চলে যেতে পারে। তাই রোহিঙ্গাদের একত্রে রাখা সম্ভব হলে তাদের গতিবিধি নজরদারি করা যাবে, নিয়ন্ত্রণও করা সম্ভব হবে সহজে।   

এ প্রসঙ্গে ত্রাণ ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা মন্ত্রী মোফাজ্জল হোসেন চৌধুরী মায়া বলেন, ‘রোহিঙ্গাদের একত্রে এক এলাকায় আশ্রয় দেওয়ার ব্যাপারে সর্বাত্মক চেষ্টা চালাচ্ছে সরকার। এরই অংশ হিসেবে রোহিঙ্গাদের চিহ্নিত করার জন্যে ছবিযুক্ত আইডি কার্ড, নিবন্ধন ইত্যাদি পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।’   

এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে কক্সবাজারের রোহিঙ্গা অধ্যুষিত এলাকা পরিদর্শন করে আসা ক্ষমতাসীন দলের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহাবুবউল আলম হানিফ বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘সরকারের কাছে এখন গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো রোহিঙ্গারা যাতে কোনোভাবেই সারাদেশে ছড়িয়ে পড়তে না পারে তা নিশ্চিত করা। এজন্য সরকারের বিভিন্ন সংস্থা কাজ করছে।’