মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে রোহিঙ্গা মুসলিমদের ওপর মিয়ানমার সেনাবাহিনীর বর্বরোচিত হত্যাযজ্ঞ ও নির্যাতনের পর বাংলাদেশে বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের স্বাভাবিক জীবন যাপন ব্যাহত হচ্ছে। বিশেষ করে বৌদ্ধ ভিক্ষুরা (যারা বৌদ্ধদের নির্ধারিত পোশাক পরেন) আতঙ্কে রয়েছেন। তবে কোনও অবস্থায় বাংলাদেশের বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীরা যাতে হেনস্তার শিকার না হন সেজন্য সরকারের সতর্ক থাকা উচিত বলে মনে করছেন দেশের আলেমরা। একই সঙ্গে উগ্রবাদীরা যেন রোহিঙ্গা সংকটের সুযোগে ষড়যন্ত্র না করতে পারে সেজন্য আলেমদের সতর্ক থাকার পরামর্শ দিয়েছেন তারা।
এ প্রসঙ্গে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের কেন্দ্রীয় প্রচার সম্পাদক আহমদ আবদুল কাইয়ুম বলেন, ‘রোহিঙ্গারা আক্রান্ত হয়েছেন মিয়ানমারের বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীদের দ্বারা। কিন্তু এজন্য আমাদের দেশের বৌদ্ধরা দায়ী নন। তাই বাংলাদেশের বৌদ্ধদের হেনস্তা করা অপরাধ হবে। অপরাধ যারা করেছে তাদের শাস্তি ভোগ করতে হবে। কোন নিরাপরাদ মানুষকে আক্রমন করা ইসলাম সমর্থন করে না। বাংলাদেশে যারা বৌদ্ধদের ওপর হামলা করছেন তারা স্বার্থান্বেষী।’
তিনি আরও বলেন, ‘এজন্য আলেমদের যার যার অব্স্থান থেকে বৌদ্ধদের ওপর আক্রমণ না করার পরামর্শ দেওয়া উচিত এবং কেউ এ ধরণের কাজ করতে গেলে তা প্রতিহত করা। একই সঙ্গে রাষ্ট্রের দায়ীত্ব প্রতিটি নাগরিকের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা।’
রাজধানীর জামিয়া আরাবিয়্যা দারুল উলুম মাদ্রাসার মুহাদ্দিস মাওলানা ওয়ালী উল্লাহ আরমান বলেন, ‘সংখ্যালঘুদের ওপর হামলার নাটক তৈরি করে রাখাইনে রোহিঙ্গাদের ওপর যে নজিরবিহীন বর্বরতা চলছে সেটাকে ভিন্নখাতে প্রবাহিত করার চক্রান্ত হতে পারে। সরকারকে অবশ্যই সতর্কতার সঙ্গে কাজ করতে হবে। বিশেষ করে যারা রোহিঙ্গাদের ওপর হত্যাযজ্ঞকে পরোক্ষভাবে সমর্থন করছে, তাদের ষড়যন্ত্রের ব্যাপারে সবাইকে সতর্ক থাকতে হবে।’
জানা গেছে, এরই মধ্যে বৌদ্ধরা রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে উগ্রবাদীদের হামলা ও ধাওয়ার শিকার হয়েছেন। বৌদ্ধ ভিক্ষুরা প্রয়োজন ছাড়া মন্দিরের বাইরে যাচ্ছেন না। মন্দিরগুলোর সামনে পুলিশি পাহারা বাড়ানো হয়েছে।
বাংলাদেশ বুদ্ধিস্ট ফেডারেশনের হিসাব অনুযায়ী, রাজধানীতে আটটিসহ সারাদেশে তিন হাজার আটশ বৌদ্ধ বিহার আছে। বাংলাদেশে বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী লোকের সংখ্যা ২৪ থেকে ২৫ লাখ।
রাজধানীর জামিয়া হোসাইনিয়া আশরাফুল উলুম বড়কাটারা মাদ্রাসার শিক্ষক মুফতী আনসারুল হক ইমরান বলেন, ‘রোহিঙ্গাদের ওপর হামলার প্রতিবাদে বাংলাদেশের বৌদ্ধদের ওপর হামলা কোনোভাবেই যুক্তিযুক্ত নয়। ইসলাম এ ধরণের কাজ সমর্থন করে না। আমরা শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদ জানাতে পারি। কিন্তু আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার সুযোগ নেই। কোনোভাবেই প্রপাগন্ডা চালিয়ে অশান্তি সৃষ্টি, নিরাপরাদ কোনও মানুষের ওপর হামলা চালানো ইসলামসম্মত নয়।’
তিনি আরও বলেন, ‘এ সময়ে আলেমদের সতর্ক থাকা উচিত। যে কোনও জায়গায় আলেমদের বক্তব্যে সতর্ক হওয়া উচিত। কোনও উগ্রবাদীতা বা কোনও ধর্মের প্রতি বিদ্বেষ প্রকাশ হয়, এমন বক্তব্য রাখা উচিত নয়। একই সঙ্গে অন্যদেরও উগ্রবাদীতা থেকে দূরে থেকে শান্তিপূর্ণ অবস্থানে থাকার আহবান জানাতে হবে।’
প্রসঙ্গত, যশোরের বেনাপোলে এক বৌদ্ধ ভিক্ষুকে হেনস্তা করার অভিযোগে তিন জনকে আটক করেছে পুলিশ। বৃহস্পতিবার রাতে অভিযান চালিয়ে তাদের আটক করা হয়। চট্টগ্রামের বাঁশখালির বাসিন্দা জ্ঞান মিত্র ভিক্ষু গত মঙ্গলবার (১২ সেপ্টেম্বর) ভারত থেকে দেশে ফেরার পর বেনাপোল সীমান্তে একটি দোকানে পানি কিনতে গেলে আচমকা কয়েকজন তরুণ তাকে ঘিরে ফেলে। তারপর ভিক্ষুকে একটি গাড়িতে তুলে ওই যুবকরা কয়েকটি বাক্য উচ্চারণ করতে বলে এবং পুরো ঘটনা মোবাইলে ধারণ করে।
আরও পড়ুন:
সম্প্রীতি রক্ষার আহ্বান জুমার খুতবায়
রোহিঙ্গা সমস্যার একমাত্র সমাধান আরাকান স্বাধীন করা: হেফাজত