রোহিঙ্গা সংকট নিয়ে বৈঠক করতে দিল্লিতে শহীদুল হক

পররাষ্ট্র সচিব এম শহীদুল হকমাসদেড়েক আগে থেকে রোহিঙ্গা সংকট নতুন করে শুরু হওয়ার পর এই প্রথম দিল্লিতে এসেছেন বাংলাদেশের পররাষ্ট্র সচিব শহীদুল হক। যদিও তার সফরের ঘোষিত উদ্দেশ্য হলো দিল্লিতে অনুষ্ঠেয় ‘ইন্ডিয়া ইকোনমিক সামিটে’ অংশগ্রহণ। তবে সংশ্লিষ্ট সূত্রে নিশ্চিত হওয়া গেছে যে, রোহিঙ্গা সমস্যা নিয়ে তিনি ভারত সরকারের শীর্ষ নেতৃত্বের সঙ্গেও আলোচনা করবেন।
বৃহস্পতিবার (৫ অক্টোবর) সন্ধ্যা ছয়টা নাগাদ দিল্লিতে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কার্যালয় সাউথ ব্লকে শহীদুল হক বৈঠকে বসবেন ভারতে তার কাউন্টারপার্ট এস জয়শঙ্করের সঙ্গে। সেখানে চলমান রোহিঙ্গা সংকটে ভারতের কাছ থেকে ঠিক কী ধরনের ভূমিকা প্রত্যাশা করে বাংলাদেশ, সেই বিষয়টি তুলে ধরা হবে বলে একাধিক সূত্র বাংলা ট্রিবিউনকে নিশ্চিত করেছে।
এছাড়া, ওই একই সামিটে যোগ দিতে বাংলাদেশের পরিকল্পনামন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামালও বুধবার দিল্লিতে পৌঁছেছেন। তার সঙ্গেও এই বিষয়টি নিয়ে ভারত সরকারের শীর্ষ নীতি-নির্ধারকদের আলোচনা করার সম্ভাবনা আছে।
গত ২৫ আগস্ট নতুন করে বাংলাদেশে রোহিঙ্গা শরণার্থীদের ঢল নামা শুরু হওয়ার পর প্রথম দিকে ভারত যে ভূমিকা নেয়, তা বাংলাদেশকে বেশ হতাশ করেছিল। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ঠিক সে সময় মিয়ানমার সফরে গিয়ে সে দেশের নেত্রী আং সান সু চি’র সঙ্গেও দেখা করেছিলেন। কিন্তু রোহিঙ্গাদের সম্পর্কে তিনি যেহেতু প্রকাশ্যে একটিও শব্দ বলেননি, ফলে তার এই ভূমিকা বাংলাদেশে একটি ভুল বার্তা দিয়েছিল বলেই পর্যবেক্ষকরা একমত।

কিন্তু এর পরপরই ভারতে নিযুক্ত বাংলাদেশি রাষ্ট্রদূত সৈয়দ মোয়াজ্জেম আলী ভারতীয় পররাষ্ট্র সচিব এস জয়শঙ্করের সঙ্গে গিয়ে দেখা করেন এবং রোহিঙ্গা শরণার্থীদের স্রোত বাংলাদেশকে কী ধরনের গভীর সংকটে ফেলেছে, তা বিশদ ব্যাখ্যা করেন। মিয়ানমারের সঙ্গে ভারত যাতে তাদের সুসম্পর্ককে কাজে লাগিয়ে এই সংকট নিরসনে একটা ইতিবাচক ভূমিকা নেয়, প্রকারান্তরে সে অনুরোধও জানিয়েছিলেন তিনি।

হাইকমিশনার আলীর সঙ্গে বৈঠকের পর সেরাতেই ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় রোহিঙ্গা সংকট নিয়ে একটি নতুন বিবৃতি জারি করে, যাতে সংশ্লিষ্ট সব পক্ষকে সংযম দেখানোর আহ্বান জানানো হয়। তারপর ‘অপারেশন ইনসানিয়তের (মানবিকতা) আওতায় বাংলাদেশে আসা শরণার্থীদের জন্য বিপুল পরিমাণ ত্রাণসামগ্রীও পাঠাতে শুরু করে ভারত। প্রথমদিনেই বিমানযোগে পাঠানো হয় ৫৩ টন ত্রাণসামগ্রী। পরে সমুদ্রপথে আরও বেশ কয়েকশো টন ত্রাণসামগ্রী চট্টগ্রামের পথে রওনা হয়ে গেছে।

দিল্লিতে বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় মো. শহীদুল হক ও সুব্রহ্মণ্যম জয়শঙ্করের মধ্যে বৈঠক হতে যাচ্ছে এই পটভূমিতেই। ইতোমধ্যে ঢাকায় মিয়ানমারের এক মন্ত্রী এসেও আশ্বাস দিয়ে গেছেন, তারা রোহিঙ্গাদের শর্তসাপেক্ষে মিয়ানমারে ফিরিয়ে নিতে রাজি। 

বাংলা ট্রিবিউনকে ভারতীয় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একটি সূত্র জানিয়েছে, রোহিঙ্গা সংকট নিরসনের চেষ্টায় ভারত কিভাবে পর্দার আড়ালে ও নীরবে মিয়ানমারের সঙ্গে আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছে, বাংলাদেশের পররাষ্ট্র সচিবকে সে ব্যাপারে 'ব্রিফ' করা হবে।

অন্যদিকে, বর্তমান পরিস্থিতিতে বাংলাদেশ ভারতের কাছ থেকে ঠিক কী ধরনের সাহায্য আশা করছে, ত্রাণসামগ্রী পাঠানোর পাশাপাশি রোহিঙ্গাদের মিয়ানমারে ফেরত পাঠানোর ক্ষেত্রেও ভারত কোনোভাবে সাহায্য করতে পারে কিনা, সে বিষয়গুলো সম্ভবত শহীদুল হক বৈঠকে উত্থাপন করবেন।

ভারতীয় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে বাংলাদেশ-মিয়ানমার ডেস্ক যার তত্ত্বাবধানে, সেই যুগ্মসচিব শ্রীপ্রিয়া রঙ্গনাথন ও আরও কিছু ভারতীয় কর্মকর্তা আগামীকাল সন্ধ্যার বৈঠকে যোগ দেবেন। বাংলাদেশের তরফে সচিব শহীদুল হক ছাড়াও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দক্ষিণ এশিয়া বিভাগের মহাপরিচালক মো. মনোয়ার হোসেনও উপস্থিত থাকবেন।

এই বৈঠকের আগে বৃহস্পতিবার দিনের প্রথমার্ধে দিল্লিতে তিন দিন ব্যাপী (৪ থেকে ৬ অক্টোবর) ইন্ডিয়া ইকোনমিক সামিটে অন্যতম বক্তা হিসেবে থাকছেন বাংলাদেশের পরিকল্পনামন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল ও পররাষ্ট্র সচিব শহীদুল হক দু’জনেই।

এই  সামিটের আয়োজন করেছে আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন সংস্থা ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরাম, যারা সুইজারল্যান্ডের ডাভোসে প্রতিবছর বিশ্বনেতা ও অর্থনৈতিক জগতের দিকপালদের নিয়ে সামিটের আয়োজন করে থাকে। ভারতেও ঠিক একই ধাঁচের সম্মেলনে এ দেশের ‘হুজ হু’-দের সামনে বাংলাদেশের দুই প্রতিনিধি রোহিঙ্গা সমস্যার কথা তুলবেন কিনা, বা তুললেও কিভাবে, সেদিকেও অবশ্যই সবার নজর থাকবে। 

আরও পড়ুন: দ্বিপাক্ষিক বৈঠকে রোহিঙ্গা ইস্যুতে বাংলাদেশের উদার পদক্ষেপের প্রশংসা যুক্তরাষ্ট্রের