ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যকার দীর্ঘ স্থল সীমান্ত বরাবর যে ‘বর্ডার-পিলার’ বা সীমান্ত স্তম্ভ রয়েছে, দু’দেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনী তা আধাআধি করে রক্ষণাবেক্ষণ ও মেরামতে রাজি হয়েছে।
আর এই নজিরবিহীন পদক্ষেপে জোড়-বেজোড় (অড-ইভেন) ফর্মুলা অনুসরণ করা হবে বলেও স্থির হয়েছে। অর্থাৎ ভারতের বিএসএফ (বর্ডার সিকিউরিটি ফোর্স) যদি জোড় সংখ্যায় শেষ হয় এমন পিলারগুলোর দায়িত্ব নেয়, তাহলে বাংলাদেশের বিজিবি (বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ) ভার নেবে বেজোড় সংখ্যার পিলারগুলোর। কিংবা ঠিক উল্টোটা।
দিল্লিতে গত সপ্তাহে বিএসএফ ও বিজিবি’র মহাপরিচালক পর্যায়ে পাঁচ দিন ব্যাপী বৈঠকে এ ব্যাপারে বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে। বৈঠকের আগেই অবশ্য দুই বাহিনী তাদের নিজ নিজ দেশের সরকারের কাছ থেকে এ বিষয়ে অনুমতি পেয়েছিল।
বিএসএফের ডিজি কে কে শর্মা এ প্রসঙ্গে বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘আমাদের দুই দেশের মধ্যে সীমান্ত ৪০৯৬ কিলোমিটার লম্বা। অথচ এই দীর্ঘ সীমান্ত জমি যে পিলারগুলো দিয়ে চিহ্নিত, সেগুলোর বেশির ভাগের অবস্থাই খুব খারাপ। সে কারণেই দুই বাহিনী মিলে স্থির করা হয়েছে যে, সীমান্ত বরাবর একটা পিলার আমরা, তো পরেরটা ওরা। এভাবে আমরা সেগুলোর দেখাশুনো করবো ও দায়িত্ব নেবো। ভগ্নপ্রায় পিলারগুলো মেরামতও করা হবে।’
একই ধরনের সীমান্ত-পিলার আছে ভারত-পাকিস্তান আন্তর্জাতিক সীমান্তেও। কিন্তু সেগুলোর দেখাশুনো করে থাকে ভারতের বিএসএফ-ই। কারণ, পাকিস্তানি রেঞ্জার্স কখনও তার দায়িত্ব নিতে রাজি হয়নি। কিন্তু ভারত-বাংলাদেশের মধ্যে বন্ধুত্ব আর সুসম্পর্কের কারণে দুই বাহিনী এখন ‘যৌথভাবে’ পিলারগুলোর ভার নিচ্ছে, যেটা আগে কখনও হয়নি।
ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তে বর্ডার-পিলারগুলোর ভার এতদিন কাগজে কলমে ছিল বিভিন্ন রাজ্যের গণপূর্ত (পিডব্লিউডি) বিভাগের হাতে। অর্থাৎ পশ্চিমবঙ্গ, আসাম, ত্রিপুরা বা মেঘালয়ের সঙ্গে বাংলাদেশের সীমান্তে যে পিলারগুলো আছে, তা ওই সব রাজ্যের গণপূর্ত বিভাগেরই দেখাশুনা করার কথা। কিন্তু সে কাজে তারা কখনও তেমন গুরুত্ব দেয়নি। ফলে বহু পিলারই ভেঙে পড়েছে। কোনও কোনোটা প্রায় মাটির সঙ্গে মিশে গিয়ে আন্তর্জাতিক সীমানাকেও একরকম মুছে দিয়েছে।
এই কারণেই মাসকয়েক আগে বিএসএফের পক্ষ থেকে ভারত সরকার তথা পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে আর্জি জানানো হয়, ‘আমরা যদি পাকিস্তান সীমান্তের পিলারগুলোর দায়িত্ব নিতে পারি, তাহলে বাংলাদেশ সীমান্তেই বা নয় কেন?’ সেই অনুরোধ মেনে নিয়ে বিএসএফকেই এখন ওই পিলারগুলোর দায়িত্ব অর্পণ করা হয়েছে।
একইভাবে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি)-ও তাদের দেশের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কাছে এই বর্ডার পিলারগুলোর রক্ষণাবেক্ষণের অনুমতি চেয়েছিল। বিজিবি’র মহাপরিচালক মেজর জেনারেল আবুল হোসেন সম্প্রতি দিল্লি সফরে এসে বিএসএফকে জানান, তারাও সরকারের কাছ থেকে এ ব্যাপারে ‘নীতিগত সম্মতি’ পেয়ে গেছেন। ফলে দিল্লিতে মহাপরিচালক পর্যায়ের বৈঠকেই স্থির হয়েছে জোড়-বিজোড় ফর্মুলা অনুসরণ করেই এখন থেকে দুই বাহিনী যৌথভাবে পিলারগুলো সামলাবে।
তবে দীর্ঘ এই আন্তর্জাতিক সীমান্ত বরাবর ঠিক কতগুলো বর্ডার পিলার আছে, সেটা বিএসএফ বা বিজিবি কর্মকর্তারা চট করে কিছু জানাতে পারেননি।
বিএসএফের এক অতিরিক্ত মহাপরিচালকের কথায়, ‘অনেক জায়গাতেই হয়তো দেখা যাচ্ছে, মানচিত্র যেখানে বলছে পিলার থাকার কথা, বাস্তবে সেখানে দেখা যাচ্ছে পিলারের কোনও অস্তিত্বই নেই। হয়তো সেটা কবেই ভেঙে গেছে, কিংবা মাটির সঙ্গে মিশে গেছে। কাজেই আমাদের দুই বাহিনীকেই হয়তো বহু পিলার নতুন করে বানাতে হবে, ভেঙে পড়াগুলো সারাতে হবে’
প্রায় আড়াই বছর আগে ঐতিহাসিক স্থল সীমান্ত চুক্তি সম্পাদনের মধ্যদিয়ে ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে সীমান্ত বিরোধ ও ছিটমহলের সমস্যার স্থায়ী নিরসন হয়েছিল। এখন সীমান্ত পিলারের অভিনব যৌথ রক্ষণাবেক্ষণের মধ্যদিয়ে জমিতেও তার প্রতিফলন ঘটবে বলে দু’দেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনী আশা করছে।