মিয়ানমারের রাখাইনে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর ওপর গণহত্যা ও নির্যাতনের তদন্তে গঠিত নাগরিক কমিশন তাদের প্রতিবেদন ডিসেম্বরের মধ্যে আন্তর্জাতিক আদালতে নিতে চায়। কমিশনের চেয়ারম্যান, সদস্যসচিব ও সদস্যরা জানিয়েছেন, আগামী শুক্রবার কমিশনের প্রথম সভায় কর্মপদ্ধতি নির্ধারণ হবে এবং সাক্ষ্য গ্রহণের জন্য আগামী সপ্তাহে কক্সবাজারে যাবে কমিশন। ডিসেম্বরের মধ্যেই প্রতিবেদন প্রস্তুত করা হবে, বলেও কমিশনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে।
কমিশনের কাজের বিষয়ে সদস্য সচিব শামসুদ্দিন চৌধুরী মানিক বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘আগামী শুক্রবার কমিশনের সভা হবে। আগামী সপ্তাহে কক্সবাজারে যাওয়াটাই কমিশনের কাজের প্রথম পদক্ষেপ। সেখানে সাক্ষীদের সাক্ষ্য নেওয়া হবে।’
তিনি আরও বলেন, ‘দুই দেশের অনুমোদন পেলে আমাদের মিয়ানমার যাওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। সেখানে কী ঘটেছে বা এখনও ঘটছে তা পর্যবেক্ষণের জন্য। এরপর ডিসেম্বরে জেনেভায় জাতিসংঘের মানবাধিকার কমিশনের বৈঠকে গিয়ে আমরা আন্তর্জাতিক কমিশন গঠনের চেষ্টা করব।’ এরমধ্যে কোনও তথ্য সংগ্রহ শুরু হয়েছে কিনা প্রশ্নে তিনি বলেন, ‘এখনও তেমন কিছু শুরু হয়নি। কক্সবাজার দিয়েই আমাদের কাজ শুরু হবে।’
পরিকল্পনাটা অনেক বড় উল্লেখ করে নাগরিক কমিশনের চেয়ারম্যান বিচারপতি শামসুল হুদা বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘আমাদের পরিকল্পনা বড়। এতে গণশুনানির মতো বিষয় অনুষ্ঠিত হবে। এরপর চিন্তা করব প্রতিবেদনটি কীভাবে আন্তর্জাতিক আদালতে নেওয়া যায়। আগামী শুক্রবার কমিটি মিলিত হয়ে বাকি সিদ্ধান্তগুলো নেবে।’
কমিশনের সদস্য মেজর জেনারেল (অব) আবদুর রশীদ আন্তর্জাতিক অঙ্গনে এ ধরনের কমিশনের বৈধতা প্রশ্নে বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘সাধারণত এধরনের কমিশনের আইনগত ভিত্তি নেই, এটির বড় ভিত্তি নৈতিকতার ভিত্তি। অপরাধ হয়েছে কিনা তদন্ত করে প্রতিবেদন করবে কমিশন। সেটি বিদেশে সচেতনতা বাড়ানোর জন্য, তাদের একটি ধারণা হিসেবে সামনে আসবে এবং বিবেক জাগ্রত করা সম্ভব হয় যেন সেটিই মূল লক্ষ্য। এই বিবেচনায় নৈতিকতার জায়গা থেকে এর অনেক গুরুত্ব আছে।’
আমরা নিশ্চিত এ ধরনের নৈতিকতার জয় হলে বিবেক জাগ্রত হলে ওখানে যারা অপরাধ করেছে তাদের আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের নেওয়ার সুযোগ হবে জানিয়ে তিনি বলেন, ‘এই কাজটির মধ্য দিয়ে সেই প্রক্রিয়া শুরু করাটাই মূল লক্ষ্য।’
প্রতিবেদন নিয়ে করণীয় প্রশ্নে তিনি আরও বলেন, ‘আমরা জাতীয়ভাবে প্রতিবেদন করে আন্তর্জাতিক সব সংস্থার কাছে দিতে চাই। পরবর্তীতে বিদেশে গিয়েও সেটি নিয়ে ক্যাম্পেইন করা হবে।’ আগামী ডিসেম্বরের মধ্যেই প্রতিবেদন প্রস্তুত করে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে যাওয়া সম্ভব হবে বলেও তিনি জানান।
কমিশনের আরেক সদস্য আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউটর রানা দাশগুপ্ত বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘নাগরিক কমিটি যে প্রতিবেদন তৈরি করবে সেটি আন্তর্জাতিক আদালতে নেওয়া যায় কিনা সেটি অন্যতম লক্ষ্য। এ ধরনের প্রতিবেদন রেফারেন্স হিসেবে কাজে লাগে। একাত্তরে পাকিস্তান আর্মিদের বিষয়ে হামিদুর রহমান তদন্ত কমিশনের রিপোর্ট পরবর্তীতে কাজে লেগেছে।’
এ ধরনের কমিশনের প্রতিবেদন আন্তর্জাতিক আদালতে নেওয়া হয়েছে এমন নজির আছে কিনা জানাতে চাইলে তিনি ‘বিষয়টি জানেন না’ উল্লেখ করে বলেন, ‘মিয়ানমারের নাগরিকরা যেহেতু দেশত্যাগ করে বাংলাদেশে পালিয়ে এসেছে, এমন পরিস্থিতিতে যদি এই নাগরিক কমিশন সাক্ষ্য-সাবুদ নিয়ে আসে এবং কোনও না কোনওসময় যদি আন্তর্জাতিক আদালতে মামলা হয় সেই মামলায় এটি পজেটিভ রেফারেন্স হিসেবে কাজে লাগবে। কারণ ওই নাগরিকরা দেশত্যাগ করে বাংলাদেশে আসতে বাধ্য হয়েছে। ফলে মিয়ানমারে কী ঘটেছিল, সেই অপরাধ কে করেছে, মিয়ানমার সেনাবাহিনী ও সরকারের কী ভূমিকা ছিল এটা যদি তাদের কাছ থেকে আমরা জানতে পারি এবং সেই জানার ওপর যদি পজেটিভ কমিশন রিপোর্ট হয় সেটা আন্তর্জাতিকভাবে গুরুত্ব পাবেই।’
উল্লেখ্য, বুধবার প্রেসক্লাবে কমিশন ঘোষণাকালে দেশের বিশিষ্ট নাগরিকরা উপস্থিত ছিলেন। এই কমিশনে শতাধিক বিশিষ্ট নাগরিককে সদস্য করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছেন বুদ্ধিজীবী, সুশীল সমাজের সদস্য, বিচারপতি, আইনজীবী, শিক্ষক, সাংবাদিক, লেখক ও কয়েকজন আলেম।
আরও পড়ুন: মিয়ানমারে রোহিঙ্গা নির্যাতন তদন্তে নাগরিক কমিশন গঠন