বৈঠকে কফি আনান অবিলম্বে রোহিঙ্গা নির্যাতন বন্ধ ও রাখাইনের উপদ্রুত এলাকাগুলোয় জাতিসংঘ, মানবিক সহায়তা সংস্থাগুলোসহ গণমাধ্যমের অবাধ প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করার ওপর জোর দেন। এসব পদেক্ষেপের আশু বাস্তবায়নের মাধ্যমে রাখাইন প্রদেশে এখন পর্যন্ত অবস্থানরত দুর্গত মানুষের মধ্যে আস্থার মনোভাব তৈরি করা সম্ভব বলে মতপ্রকাশ করেন তিনি।
চলমান পরিস্থিতিতে মানবিক ভূমিকা রাখার জন্য বাংলাদেশের সরকার ও জনগণের ভূয়সী প্রশংসা করেন। তিনি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে তার ব্যক্তিগত শুভেচ্ছা জ্ঞাপনের জন্য স্পিকারকে অনুরোধ করেন। তিনি মিয়ানমারের অব্যাহত অনুপ্রবেশের বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন। এখন পর্যন্ত সংকট চলমান থাকার প্রকৃত কারণ অনুসন্ধানের ক্ষেত্রে গুরুত্বারোপ করেন।
কফি আনানকে এ বিষয়ে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে তার ধারণা ও সুপারিশগুলো তুলে ধরার জন্য অনুরোধ জানান স্পিকার। তিনি আনানকে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর আমন্ত্রণের আলোকে দ্রুত সুবিধাজনক সময়ে বাংলাদেশ সফরের অনুরোধ জানান। ড. আনান চলমান মানবিক বিপর্যয়কালে তার পক্ষ থেকে সর্বাত্মক সহযোগিতার আশ্বাস দেন।
এদিকে সোমবার জাতিসংঘ সদরদফতরের ইকোসক চেম্বারে ‘রোহিঙ্গা সংকট ও বাংলাদেশের মানবিক সহযোগিতা বিষয়ে’ জাতিসংঘের মানবিক সহায়তা ও জরুরি ত্রাণ বিষয়ক সমন্বয়কারী এবং জাতিসংঘের আন্ডার সেক্রেটারি জেনারেল মার্ক লোকক্ সদস্য রাষ্ট্রগুলোর জন্য এক ব্রিফিং অনুষ্ঠানের আয়োজন করে। অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরী। সংবাদ সম্মেলনে মার্ক লোকক্ কক্সবাজারস্থ রোহিঙ্গা ক্যাম্প সরেজমিনে পরিদর্শনকালে তার সাম্প্রতিক বাংলাদেশ সফরের অভিজ্ঞতা তুলে ধরেন।
জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুত এসব রোহিঙ্গাকে উদারভাবে আশ্রয় ও মানবিক সহায়তা দেওয়ার জন্য বাংলাদেশ সরকার ও জনগণকে ধন্যবাদ জানান মার্ক লোকক্। এ সময় ২৩ অক্টোবর জেনেভায় অনুষ্ঠেয় প্লেজিং কনফারেন্সের কথা উল্লেখ করে পরিকল্পনা বাস্তবায়নে বাকি সহায়তার জন্য আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতি আহ্বান জানান।
ড. শিরীন শারমিন চৌধুরী রোহিঙ্গা শরণার্থীদের আশ্রয়দানে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ভূমিকার কথা উল্লেখ করে বলেন, ‘আমাদের প্রধানমন্ত্রী এই মানবিক আশ্রয়দানে অনন্য সাহসিকতা ও দৃঢ়তা প্রদর্শন করেছেন। অসহায় রোহিঙ্গাদের জন্য দ্বার উন্মুক্ত করে দিয়েছেন।’
স্পিকার রোহিঙ্গা ক্যাম্প পরিদর্শনে নিজের অভিজ্ঞতার আলোকে মিয়ানমার থেকে পালিয়ে আসা নির্যাতনের শিকার রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর অমানবিক অবস্থার বর্ণনা দেন। তিনি বলেন, ‘আমরা এই সমস্যার জরুরি সমাধান চাই, যেন রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী নিরাপদভাবে ও সম্মানের সঙ্গে তাদের ঘরে ফিরতে পারে। প্রতিবেশীদের সঙ্গে শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান ও অর্থপূর্ণ জীবন কাটাতে পারে।’ এই সংকটের শেকড় মিয়ানমারে এবং এর সমাধানও মিয়ানমারেই নিহিত উল্লেখ করে তিনি বলেন ‘রাজনৈতিক সদিচ্ছা থাকলে এ সমস্যা সমাধান সম্ভব।’
গত মাসে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে প্রদত্ত ভাষণে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা মিয়ানমার পরিস্থিতির সমাধানে যে ৫টি পদক্ষেপের কথা বলেছেন স্পিকার তার বক্তৃতায় সেগুলো উল্লেখ করে বলেন, ‘সহিংসতা ও একটি জাতিকে নির্মূলের প্রক্রিয়া বন্ধ, মিয়ানমারে জাতিসংঘের ফ্যাক্ট ফান্ডিং মিশন প্রেরণ, মিয়ানমারের অভ্যন্তরে সেফ জোন তৈরি, জোরপূর্বক উচ্ছেদকৃত মানুষদের নিজ ভূমিতে স্থায়ী প্রত্যাবর্তন এবং কফি আনান কমিশনের সুপারিশের পূর্ণ বাস্তবায়ন করতে হবে।’
এই ব্রিফিং অনুষ্ঠানে ইউএনএইচসিআর, আইওএম, ইউনিসেফ, ডব্লিউএইচও, রেডক্রস অ্যান্ড রেডক্রিসেন্টের প্রতিনিধিরা ছাড়াও কুয়েত, তুরস্ক, সৌদিআরব, সুইডেন, যুক্তরাষ্ট্র, দক্ষিণ কোরিয়া, সুইজারল্যান্ড, মিয়ানমার, বাংলাদেশ ও ইইউ’র রাষ্ট্রদূত ও প্রতিনিধিরা বক্তব্য রাখেন। সূত্র: বাসস