নির্বাচন কমিশনকে (ইসি) জনগণের আস্থা অর্জন, ম্যাজিস্ট্রেসি ক্ষমতা না দিয়ে সেনা মোতায়েন, রাজনৈতিক সংলাপ আয়োজনের উদ্যোগ গ্রহণসহ নানা পরামর্শ এসেছে নির্বাচন বিশেষজ্ঞদের সংলাপে। একই সঙ্গে রাজনৈতিক দলগুলোকে সংবিধানে বিদ্যমান ব্যবস্থা মেনে নিয়েই নির্বাচনে আসার কথা বলেছেন তারা।
মঙ্গলবার অনুষ্ঠিত সংলাপে একাধিক সাবেক প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি), সাবেক কমিশনার, নির্বাচন সংশ্লিষ্ট সাবেক আমলারা নির্বাচন কমিশনকে এসব পরামর্শ দেন।
সংলাপে অংশ নেওয়া নির্বাচন বিশেষজ্ঞ ও ইসি সচিবালয়ের কর্মকর্তাদের সঙ্গে আলাপকালে এসব তথ্য পাওয়া গেছে।
জানা গেছে, সংলাপে ঘুরে ফিরে ইসির আস্থা অর্জনের কথা উঠে এসেছে। শক্ত হাতে ক্ষমতা গ্রহণের পরামর্শ এসেছে। পাশাপাশি নির্বাচন বর্জনের সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসতে রাজনৈতিক দলগুলোকেও অনুরোধ জানিয়েছেন নির্বাচন বিশেষজ্ঞদের কেউ কেউ।
সরকারি কর্মকর্তাদের দিয়ে সুষ্ঠু ভোট হবে না বলে মন্তব্য করেন সাবেক সিইসি আবদুর রউফ। তার যুক্তি, সরকারি চাকুরীজীবীরা রাজনৈতিকভাবে পক্ষপাতদুষ্ট থাকেন। তারা সরকারের অবস্থানের বাইরে যেতে পারেন না। এজন্য তিনি ভোটারদের নির্বাচনি দায়িত্ব পালনের কথা বলেন। তিনি ভোটারদের থেকে কিছু ব্যক্তিকে বাছাই করে তাদের ভোটগ্রহণ ও আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর ভূমিকায় থাকার কথা বলেন। এছাড়া তিনি প্রতি ৫শ’ ভোটারের জন্য একটি করে স্থায়ী ভোটকেন্দ্র নির্মাণেরও পরামর্শ দিয়েছেন। সরকারের স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় বা অন্য কোনও সংস্থার মাধ্যমে এই ভোটকেন্দ্র নির্মাণের কথাও বলেন তিনি।
সাবেক প্রধান নির্বাচন কমিশনার এটিএম শামসুল হুদা নির্বাচনের সময় খণ্ড খণ্ড করে সংলাপ ও সাময়িক সমস্যার সমাধান না করে দীর্ঘ মেয়াদে কাজ করে স্থায়ী সমাধানের কথা বলেন। বিভিন্ন সময়ে কমিশনের সঙ্গে সংলাপে যেসব সুপারিশ এসেছে সেগুলোকে ইসির এখতিয়ারভুক্ত ও এখতিয়ারের বাইরে এমন দুটি ভাগে বিভক্ত করে বিবেচনারও পরামর্শ দেন তিনি। তিনি বলেন, ইসির ক্ষমতার মধ্যে যেগুলো রয়েছে সেগুলো তারা বাস্তবায়ন করবে। অন্যগুলোর ক্ষেত্রে সরকারের মাধ্যমে বাস্তবায়নের প্রচেষ্টা চালাতে হবে। তিনি সংখ্যানুপাতিক প্রতিনিধিত্ব, নির্বাচনকালীন সরকার, সীমানা পুনর্বিন্যাসসহ সংবিধান সংশোধন সংশ্লিষ্ট বিষয়গুলোর ক্ষেত্রে রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে কথা বলে দীর্ঘ মেয়াদে একটা স্থায়ী সমাধানের পরামর্শ দেন।
জানা গেছে, সাবেক সিইসি হুদাসহ কয়েকজন প্রতিনিধি বিদ্যমান আইনের মধ্যে থেকে সেনা মোতায়েনের পক্ষে মত দিয়েছেন। কেউ কেউ আরপিও সংশোধন করে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীকে অন্তর্ভুক্তির কথাও বলেছেন। তবে, তারা সবাই সেনাবাহিনীকে বিচারিক ক্ষমতা দেওয়ার বিপক্ষে মত দিয়েছেন। দেশের বিচারবিভাগ সম্পূর্ণ স্বাধীন হওয়ায় এটা সম্ভব নয় বলেও তাদের কেউ কেউ মন্তব্য করেন।
সাবেক নির্বাচন কমিশনার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) এম সাখাওয়াত হোসেন সেনা মোতায়েনের পক্ষে মত দিয়েছেন। তবে, তিনি নির্বাচনে সেনাবাহিনী ইসির আওতায় রাখবেন নাকি ম্যাজিস্ট্রেটের নিয়ন্ত্রণে রাখবেন সে বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার পরামর্শ দেন।
সংলাপে এটিএম শামসুল হুদা ও এম সাখাওয়াতসহ কয়েকজন ‘না’ ভোটের বিধান চালু করার পরামর্শ দেন।
একাধিক নির্বাচন বিশেষজ্ঞ ইসির বর্তমান কার্যক্রমের প্রশংসা করেছেন। সংলাপে সব দলের অংশগ্রহণকে ইতিবাচক উল্লেখ করে তারা বলেন, সংলাপে সবার অংশগ্রহণের মধ্য দিয়ে ইসির প্রতি তাদের একটি আস্থার জায়গা তৈরি হয়েছে। এটাকে আরও এগিয়ে নিতে হবে। এমন আচরন করা যাবে না যে আস্থার জায়গা থেকে মানুষ সরে যায়।
সাবেক কমিশনার শাহ নেওয়াজসহ কয়েকজন স্বতন্ত্র প্রার্থিতার ক্ষেত্রে এক শতাংশ ভোটারের স্বাক্ষরের বাধ্যবাধ্যকতা তুলে দেওয়ার প্রস্তাব করেন। তারা বলেন, এ ধরনের স্বাক্ষরের বিধান ভোটারের নিরাপত্তা হুমকিতে ফেলে দেয়। এটাকে সংবিধান বিরোধীও বলেও কেউ কেউ মন্তব্য করেন। তাছাড়া এই ধরনের বিধান না থাকলে নির্বাচনে স্বতন্ত্র প্রার্থী বাড়বে বলেও মত দেন তারা। এতে করে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচনের সুযোগ কমে আসবে।
সফল হোক বা না হোক, ইসিতে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে সমঝোতা আনতে রাজনৈতিক সংলাপ আয়োজনের উদ্যোগ নেওয়ার পরামর্শ দেন সাবেক কমিশনার ছহুল হুসাইন। তিনি বলেন, যেহেতু দলগুলোর মধ্যে দূরত্ব সৃষ্টি হয়েছে তাই এ অবস্থা উত্তরণে ইসি একটা উদ্যোগ নিতে পারে। দলগুলোর সমঝোতার এই উদ্যোগ যে সফল হবে এর কোনও গ্যারান্টি নেই। তবে সফল না হলে কোনও দোষ থাকবে না। জনগণকে তারা বলতে পারবেন যে তাদের প্রচেষ্টা ছিল।
সাবেক নির্বাচন কমিশনার মোহাম্মদ আবদুল মোবারক ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি নির্বাচনের সাফাই গেয়েছেন। জানা গেছে, তিনি বলেন, ওই নির্বাচন বাতিলের বিরুদ্ধে একশজন মানুষও রাস্তায় নামেনি, এমনকি মানববন্ধন করেনি। কিছু জ্ঞানপাপী লোক এ নিয়ে কথা বলছে, লেখালেখি করে। ওই নির্বাচনের পর সরকারের চার বছর কেটেছে, আরেক বছর কাটলে পাঁচ বছরের টার্ম পূর্ণ করবে।
সাবেক ইসি সচিব হুমায়ুন কবীর নির্বাচনে স্বচ্ছতা আনতে ও দ্রুত ফল প্রকাশে প্রযুক্তি ব্যবহারের পরামর্শ দেন। তিনি বলেন, মানুষ ভোটের পরদিন ফলাফল পত্রিকায় দেখতে চায়। এটা করতে হলে প্রযুক্তির সহযোগিতা নিতে হবে। ২০০৮ সালে প্রযুক্তির যে ব্যবহার শুরু হয়েছিল তা থেকে ইসি অনেকটা পিছিয়ে পড়েছে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
সংলাপে একাধিক সদস্য ইভিএম নিয়ে কথা বলেছেন। তবে তাদের বেশিরভাগই এর বিরোধিতা করেছেন। সংসদ নির্বাচনের যে সময় বাকি আছে তাতে কোনোক্রমেই ইভিএম ব্যবহার সম্ভব নয় বলে মনে করেন তারা। এছাড়া বিশ্বের অনেক উন্নত দেশ ইভিএম চালু করেও তাতে ত্রুটি ধরা পড়ায় সেখানে থেকে সরে এসেছে বলে উদাহরণ টানেন।
এদিকে সংলাপের পর নির্বাচনকালীন সরকার নিয়ে নির্বাচন বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে সাংবাদিকদের কথা হলেও এ বিষয়ে সংলাপে কোনও আলোচনাই হয়নি। সংলাপে অংশ নেওয়া নির্বাচন বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, ওই বিষয়টি যে নির্বাচন কমিশনের এখতিয়ারের মধ্যে নেই। এটা হয় তো জেনে বুঝেই কেউ এটা নিয়ে কথা বলেননি।
সংলাপে আবদুল মোবারক, এম সাখাওয়াতসহ কয়েকজন সাবেক কমিশনার লিখিত প্রস্তাবও দিয়েছেন বলে জানা গেছে।
সংলাপের শুরুতে রাজনৈতিক দলগুলো থেকে যেসব সুপারিশ এসেছে তার মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তাবগুলো কমিশনের পক্ষ থেকে নির্বাচন বিশেষজ্ঞদের অবহিত করা হয়।
মঙ্গলবার নির্বাচন বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে আয়োজিত সংলাপের মধ্য দিয়ে ইসির তিনমাসব্যাপী সংলাপ কর্মসূচি শেষ হলো।