গ্রাহকের টাকা নিয়ে লাপাত্তা ম্যানেজার বাসায় না গিয়ে ঘুমাতেন ব্যাংকে

সাইফুদ্দিন সবুজগ্রাহকের টাকা নিয়ে লাপাত্তা হয়ে যাওয়া সোনালী ব্যাংকের কিশোরগঞ্জ প্রধান শাখার সাবেক ম্যানেজার (এজিএম) সাইফুদ্দিন সবুজের বিরুদ্ধে নতুন নতুন তথ্য বেরিয়ে আসছে। শাখাটির কর্মকর্তারা বলছেন, সাইফুদ্দিন সবুজের কর্মকাণ্ড ছিল রহস্যজনক। তিনি সবসময়ই দালাল শ্রেণির লোকজন নিয়ে তার অফিস কক্ষে বসে থাকতেন। শুধু তা-ই নয়, তিনি রাতে ঘুমাতেনও অফিস কক্ষে। তার জন্য বরাদ্দ করা বাসায় কখনোই থাকতেন না তিনি।

এদিকে সূত্র জানিয়েছে, সাবেক ওই ম্যানেজারের বিরুদ্ধে গ্রাহকদের টাকা আত্মসাতের অভিযোগ জানাজানি হওয়ার পর বিষয়টি মীমাংসার চেষ্টায় নেমেছে একটি মহল। ক্ষতিগ্রস্ত গ্রাহকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে ম্যানেজারের পক্ষ হয়ে বিভিন্নভাবে মীমাংসার জন্য একটি মহল তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করছে। এমনকি টাকা ফেরতের আশ্বাস দিয়ে চেকও দেওয়া হচ্ছে বলে জানিয়েছে বিশ্বস্ত একটি সূত্র।

ব্যাংকের এসএমই ঋণের গ্রাহকদের টাকা হিসাব থেকে তুলে নেওয়ার ঘটনায় সোনালী ব্যাংকের কিশোরগঞ্জ অঞ্চলের ডেপুটি জেনারেল ম্যানেজার (ডিজিএম) বাদী হয়ে অভিযুক্ত ব্যবস্থাপক (এজিএম) সাইফুদ্দিন সবুজের বিরুদ্ধে দুর্নীতি দমন আইনে সদর মডেল থানায় মামলা করেছেন। এছাড়া, তার দেশত্যাগে ঠেকানোর ব্যবস্থা নিতে বিমানবন্দরসহ সংশ্লিষ্টদের চিঠি দেওয়া হয়েছে।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে কিশোরগঞ্জ সোনালী ব্যাংকের প্রধান শাখার একজন কর্মকর্তা জানান, অভিযুক্ত ব্যাংক ম্যানেজার সাইফুদ্দিন সবুজ সারাক্ষণ তার কক্ষে দালালদের নিয়ে বসে থাকতেন। অফিসের কাজে তার কক্ষে গিয়ে বসার জন্য চেয়ার পাওয়া যেত না। দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে কাজ করতে হতো।

ওই কর্মকর্তা আরও জানান, ম্যানেজারের জন্য খরমপট্টিতে প্রিন্সিপাল অফিসে থাকার জন্য নির্ধারিত ঘর থাকলেও সেখানে না থেকে তিনি এই শাখায় তার অফিস কক্ষেই রাত্রিযাপন করতেন। কক্ষের সোফায় ঘুমাতেন।’

এ বিষয়ে সোনালী ব্যাংকের কিশোরগঞ্জ অঞ্চলের ডেপুটি জেনারেল ম্যানেজার (ডিজিএম) নূর মোহাম্মদ বলেন, ‘আমি যোগদান করার পর থেকে কখনোই অভিযুক্ত ম্যানেজারকে তার জন্য বরাদ্দ করা বাসায় থাকতে দেখিনি। পরে জানতে পারি তিনি নাকি ব্যাংকেই নিজের অফিস কক্ষে রাত্রিযাপন করতেন।’

সোনালী ব্যাংকশহরের বিভিন্ন আমানতকারী, ঠিকাদার, ব্যবসায়ী, অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মকর্তা, সরকারি কর্মচারী, ইঞ্জিনিয়ারিং ওয়ার্কশপসহ বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের এসএমই গ্রাহকের সঙ্গে প্রতারণা করে জালিয়াতির মাধ্যমে কয়েক কোটি টাকা হাতিয়ে নেন সাবেক ম্যানেজার সাইফুদ্দিন সবুজ।

এসব ঘটনা ভুক্তভোগীরা ব্যাংকের অডিট টিম ও বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরের কাছে লিখিত আবেদন করেন। ঘটনা জানাজানি হলে প্রাথমিকভাবে তাকে ১৬ অক্টোবর স্ট্যান্ড রিলিজ করা হয়। কিন্তু সাইফুদ্দিন সবুজ আদেশমতো ময়মনসিংহ জিএম অফিসে যোগদান না করে পালিয়ে যান। এরপর থেকেই লাপাত্তা তিনি।

২০১৪ সালের ২৬ জানুয়ারি সুড়ঙ্গ খুড়ে ব্যাংকের ভোল্ট থেকে ১৬ লাখ ৪০ হাজার টাকা লুটের ঘটনা ঘটেছিল এই ব্যাংকেই। নিরাপত্তার কথা বিবেচনা করে হারুয়া এলাকায় একটি আবাসিক ভবনে গত বছর স্থানান্তর করা হয় শাখাটি। শহরের বাণিজ্যিক এলাকায় না নিয়ে শহরের একপাশে ব্যাংকটি স্থানান্তর করায় দুর্ভোগ পোহাতে হয় গ্রাহকদের। তিন বছর পর এবার ওই ব্যাংকে ঘটল আরেক আর্থিক জালিয়াতির ঘটনা।

গত বুধবার (২৫ অক্টোবর) সোনালী ব্যাংক ময়মনসিংহের জেনারেল ম্যানেজার স্বাক্ষরিত এক চিঠিতে অভিযুক্ত ম্যানেজারের দেশত্যাগ ঠেকানোর অনুরোধ করা হয়েছে। চিঠিতে বলা হয়েছে, সোনালী ব্যাংক কিশোরগঞ্জ প্রধান শাখার সাবেক প্রধান সহকারী জেনারেল ম্যানেজার মো. সাইফুদ্দিন সবুজের (জি-২৭৯৮০) বিরুদ্ধে এফআইআর দায়ের হওয়ায় তা দেশের বিমান, নৌ ও স্থলবন্দরসহ সব ইমিগ্রেশনে অবহিত করা হয়েছে। অভিযুক্ত যেন দেশত্যাগ করতে না পারেন সে ব্যবস্থা নেওয়ার অনুরোধ করা হয়েছে চিঠিতে।

 মোল্লাপাড়া এলাকার একটি ওয়ার্কশপের মালিক আক্তার হোসেন ১০ লাখ টাকা ক্ষুদ্রঋণের জন্য আবেদন করেছিলেন সোনালী ব্যাংকের এই শাখায়। পরে খবর নিয়ে জানতে পারেন, তার নামে ১০ লাখ টাকা ইতোমধ্যেই উত্তোলন করা হয়েছে। আক্তার হোসেন বলেন, ‘ব্যবসার জন্য আমার টাকার দরকার ছিল। হোসেনপুর উপজেলার চরপুমদি এলাকার এসআরডি কলেজের কেরানি সোহেল আমারে বলেছিল, তোমার কাগজপত্র জমা দিলে আমি ঋণের ব্যবস্থা করে দেব। কিন্তু ঋণ পেলে ম্যানেজারকে ৭০ হাজার টাকা দিতে হবে। আমার টাকা খুব দরকার ছিল, তাই ওর কথায় রাজি হই। সোহেলের সঙ্গে গিয়েই ব্যাংকে কাগজপত্র জমা দিয়েছি। ম্যানেজার বললেন তিনটা চেকে সই দিয়ে রেখে যেতে, ঋণ পাস হলে সোহেলকে জানিয়ে দেবেন। পরে জানতে পারলাম, আমার নামে দশ লাখ টাকা ওই ম্যানেজার আর সোহেল মিলে উঠিয়ে নিয়েছেন।  এটা জেনে আমার মাথায় আকাশ ভেঙে পড়ছে।’

সোহেলের সঙ্গে মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘১০ লাখ টাকা ঋণ নেওয়ার জন্য আক্তার আমার সহযোগিতা নিয়েছিল।’ ঋণ পাইয়ে দেওয়ার বিনিময়ে ৭০ হাজার টাকা চাওয়ার বিষয়টি স্বীকার করে সোহেল বলেন, ‘ঋণ পেতে হলে অফিস খরচ বাবদ এই টাকা চাওয়া হয়েছিল। আমি সহযোগিতা করার মানসিকতা নিয়েই তাকে সঙ্গে নিয়ে তার কাগজপত্র জমা দিয়েছিলাম। তবে ম্যানেজারের কাছ থেকে টাকা ( ঋণের ১০ লাখ) আদায়ের চেষ্টা চলছে। খুব তাড়াতাড়ি তার টাকা আদায় করে ফেরত দেওয়া হবে।’

অনুসন্ধানে জানা যায়, বিআরডিসির সাবেক একজন চেয়ারম্যানের কাছে গত ১০ অক্টোবর পাঁচ লাখ টাকা টিটি করা হয়েছিল। ম্যানেজার সাইফুদ্দিন সবুজ স্বাক্ষরিত জমা ভাউচার থাকলেও সেই টাকা অ্যাকাউন্টে জমা না হওয়ায় সাবেক ওই কর্মকর্তা ঢাকায় সোনালী ব্যাংকের কেন্দ্রীয় শাখায় লিখিত অভিযোগ করেন। এ বিষয়ে তদন্তও শুরু করে সোনালী ব্যাংক। এরমধ্যেই গত ২২ অক্টোবর কিশোরগঞ্জ পৌরসভার নলকূপ মিস্ত্রি বোরহান উদ্দিন সোনালী ব্যাংক কিশোরগঞ্জ প্রধান শাখায় গিয়ে নতুন ম্যানেজার মাহবুবুল ইসলাম খানের সামনে বসে নগদ টাকা পরিশোধ করে দেন। বোরহানের কাছ থেকে টাকা পেয়ে যাওয়ায় লিখিত অভিযোগ প্রত্যাহার করে নেন বিআরডিসির সাবেক ওই চেয়ারম্যান।

টাকা পরিশোধের কথা স্বীকার করে বোরহান উদ্দিন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘আমি এই সাবেক চেয়ারম্যানের কাছ থেকে জায়গা কিনেছিলাম। জমির দাম বাবদ টাকা টিটি করে পাঠানোর পর তিনি তা পাননি। পরে তিনি আমাকে টাকা পরিশোধের জন্য চাপ দিলে আমি ম্যানেজারের সঙ্গে যোগাযোগ করি। তিনি কিছুদিনের মধ্যে টাকা জমা দেওয়ার আশ্বাস দিয়ে নিজের ব্যক্তিগত অ্যাকাউন্ট নম্বরের বিপরীতে আমাকে একটি চেক দেন। তাই আমি আবার সাবেক ওই চেয়ারম্যানের পাওনা টাকা পরিশোধ করেছি।’ বোরহান উদ্দিন আরও বলেন, ‘আমার কাছে ব্যাংকের টিটির জমার রশিদ ও ম্যানেজারের দেওয়া চেক রয়েছে। সময়মতো টাকা তুলতে না পারলে ম্যানেজারের বিরুদ্ধে মামলা করব।’

আরেক ভুক্তভোগী ব্যবসায়ী আশিকুজ্জামান এলিন বলেন, ‘আমি ব্যাংকে টাকা জমা দিতে গিয়েছিলাম। ম্যানেজার সাইফুদ্দিন সবুজ আমাকে বললেন, এখন তো অনেক ভিড়, আপনি আমার কাছে টাকা দিয়ে যান। আমি চার লাখ ২০ হাজার টাকা তার হাতে দিলে তিনি জমা ভাউচার স্বাক্ষর করে আমাকে ফেরত দেন। কয়েকদিন পর ব্যাংকে গিয়ে চেক দিলে আমাকে ক্যাশ থেকে জানানো হয় আমার অ্যাকাউন্টে টাকা নেই। আমার টাকা ফেরত পেতে আমি ব্যাংক কর্তৃপক্ষের কাছে ভাউচারসহ অভিযোগ করেছি।’ 

সাবেক ম্যানেজারের বিরুদ্ধে বিভিন্ন অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে সোনালী ব্যাংকের কিশোরগঞ্জ অঞ্চলের ডেপুটি জেনারেল ম্যানেজার (ডিজিএম) নূর মোহাম্মদ বলেন, ‘আমি নিজে বাদী হয়ে কিশোরগঞ্জ সদর মডেল থানায় মামলা করেছি। মামলায় প্রাথমিকভাবে দুটি ঘটনায় ১০ লাখ টাকা আত্মসাতের অভিযোগ আনা হয়েছে। এছাড়া, পরে আরও যেসব অভিযোগ আসবে বা পাওয়া যাবে সেসবও এ মামলার অন্তর্ভুক্ত করা হবে।’

কিশোরগঞ্জ সদর মডেল থানার ওসি খোন্দকার শওকত জাহান বলেন, ‘মামলাটি গ্রহণ করে তদন্তের জন্য দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) ময়মনসিংহ অঞ্চলের কার্যালয়ে পাঠানো হয়েছে।’

এদিকে, ঘটনাটি প্রকাশ হওয়ার পর ভীতি সৃষ্টি হয়েছে ব্যাংকের গ্রাহকদের মধ্যে। প্রতিদিনই গ্রাহকরা সঞ্চিত অর্থের খোঁজ নিতে ভিড় জমাচ্ছেন ব্যাংকে।

সোনালী ব্যাংক প্রধান কার্যালয়ের সিনিয়র প্রিন্সিপাল অফিসার ইসমাইল হকের নেতৃত্বে তিন সদস্যের একটি অডিট টিম ঘটনা তদন্ত করছে। প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে, গ্রাহকের অ্যাকাউন্ট থেকে হাতিয়ে নেওয়া টাকার পরিমাণ কয়েক কোটি টাকা হতে পারে।

ব্যাংকের বর্তমান ম্যানেজার মাহবুবুল ইসলাম খান বলেন, ‘আমি দায়িত্ব নেওয়ার পর গত দু’দিনে সাবেক ম্যানেজারের বিরুদ্ধে অসংখ্য গ্রাহকের অভিযোগ পেয়েছি। এখন পর্যন্ত কত টাকা খোয়া গেছে, তা বলা যাচ্ছে না। অডিট ও তদন্তের পরই তা জানা যাবে।’