রাজধানীর আন্ডারপাস: দিনে হকার-ভিক্ষুক, রাতে মাদকসেবীদের দখলে (ভিডিও)

আন্ডারপাসে হকাররানিরাপদে রাস্তা পারাপারের জন্য ফুট ওভারব্রিজের পাশাপাশি রাজধানীতে তিনটি আন্ডারপাস রয়েছে।পথচারীদের জন্য এসব আন্ডারপাস তৈরি করা হলেও বাস্তব চিত্র ভিন্ন। দিনের বেলায় হকার, ভিক্ষুক আর রাতের বেলায় মাদকসেবী-ছিনতাইকারী এবং ভাসমান যৌনকর্মীদের দখলে থাকে এসব আন্ডারপাস। সরেজমিনে রাজধানীর কাওরান বাজার, গুলিস্তান, গাবতলী আন্ডারপাসগুলো ঘুরে এ চিত্র দেখা গেছে।

রাজধানীর কাওরান বাজার এলাকার আন্ডারপাসটি পরিচ্ছন্ন ও পথচারীদের পারাপার নিরাপদ রাখতে কয়েক বছর আগে উদ্যোগ নেয় বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেল এটিএন নিউজ কর্তৃপক্ষ। আন্ডারপাসটির পাতাল সড়কটি সাজানো হয়েছিল প্রজাপতির রেপ্লিকা দিয়ে। বড় মনিটরের এলইডি টিভি, সার্বক্ষণিক নিরাপত্তা কর্মী, সিসিটিভি ক্যামেরা, বিশাল আকারের সব ছবির ফ্রেম, ময়লার ঝুড়ি বসানো হয়। আন্ডারপাসটির নতুন নামকরণ হয় প্রজাপতি গুহা। আইএফআইসি ব্যাংকের সহযোগিতায় এটি বাস্তবায়ন করে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন। বর্তমানে কর্তৃপক্ষের অবহেলা এবং সঠিক রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে ব্যবহারের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে এই আণ্ডারপাসটি।

সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, প্রজাপতি গুহা নামের আন্ডারপাসটির বর্তমান অবস্থা খুবই খারাপ। পশ্চিমপাশে ময়লার ভাগাড়ে পরিণত হয়েছে। ময়লার স্তুপ থেকে দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছে। ভেতরের অবস্থা স্যাঁতস্যাঁতে ভাব, গন্ধ ও অন্ধকার। কয়েক জন ভিক্ষুককে দেখা যায় ভিক্ষা করতে। দু’জন ভাসমান হকার কমলা, আপেল ও সবজি বিক্রি করছেন।এছাড়া ওজন মাপার মেশিন নিয়ে বসে আছেন আরেকজন। ভেতরের দেয়ালে এলইডি টিভি,সিসিটিভি ক্যামেরা কিংবা নিরাপত্তা কর্মী- এসব কিছুই চোখে পড়লো  না। সব যেন উধাও হয়ে গেছে। পূর্বপাশে ময়লা ও প্রসাব-পায়খানার ঝাঁঝালো দুর্গন্ধ নাকে লাগে।

আন্ডারপাস

ভাসমান হকারদের কথা- কী করবো ভাই, নিজের পেট ও পরিবারের পেট চালাতে হবে। এখান থেকে যা আয় হয়,তা দিয়েই সংসার চলে। তবে এখানেও ব্যবসা করতে চাঁদা দিতে হয়। কাকে চাঁদা দিতে হয় জানতে চাইলে বলেন, নাম বললে তো কালকে থেকে আর এখানে বসতে দেবে না।

একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মী শামীম আহসান যাচ্ছিলেন এই পথ দিয়ে। তিনি বলেন, ‘রাস্তা পারাপারের প্রয়োজনে প্রায় প্রতিদিনই আমার মতো অনেক লোক এই আন্ডারপাসটি ব্যবহার করেন। কিন্তু পূর্ব পাশে ময়লা ও প্রস্রাব-পায়খানার ঝাঁঝালো দুর্গন্ধ নাকে লাগে। তাছাড়া  প্রায় সময়েই জটলা বেঁধে নেশাখোরদের মাদক সেবন করতে দেখা যায়। ফলে চলাচলে বিঘ্ন ঘটে।’

রাত নামলেই এ আন্ডারপাসটির রূপ পাল্টে যায়। তখন মাদক ব্যবসায়ী, মাদকসেবী, ভাস্যমান যৌনকর্মীদের দখলে থাকে। এছাড়া এই নোংরা আর দুর্গন্ধময় পরিবেশেই প্রজাপতি গুহার অভ্যন্তরে সংসার পেতেছে কয়েকটি ছিন্নমূল পরিবার। পথচারীদের জন্য ছিনতাইয়ের ভয়তো আছেই। আন্ডারপাসটির পূর্বপাড়ে কয়েক তরুণকে গাঁজা সেবন করতে দেখা গেলো। এসব কারণে রাতের বেলা গুহার ভেতর দিয়ে এপার-ওপার যাতায়াতে এক ধরনের শঙ্কা কাজ করে।

গুহার ভেতরে আশ্রয় নিয়েছে রংপুর থেকে আসা জসিম উদ্দিনের পরিবার। তিনি বলেন,‘নদী ভাঙনে ঘরবাড়ি সব চলে গেছে। ঢাকায় কোথাও থাকার জায়গা নাই। সেজন্যই এখানে থাকি। কাওরান বাজারে কাজ করি। আর এখানে ঘুমাই। জসিমের মতো এখানে আশ্রিত সবার একই কথা- কোথাও থাকার জায়গা না পাওয়ায় তারা এখানে সংসার পেতেছে।  

আন্ডারপাসে দোকান

এখানে গাঁজা সেবন করছেন, পুলিশ কিছু বলে না? এ প্রশ্নে এক তরুণ জানান, গাঁজা খাচ্ছি এটা দেখলেন। ভেতরে যে আরও অনেক কিছু হয় তাতো দেখবেন না। আমরা তো কারও কোনও সমস্যা করছি না। 

আন্ডারপাসের মুখে বসে গাঁজা সেবন করছেন। এতে পথচারীদের যাতায়াতে সমস্যা হয়,এমন কথা বলা হলে তাদের জবাব, রাতের বেলা এখান দিয়ে মানুষ তেমন একটা যাতায়াত করে না। তাছাড়া, আমরা এক পাশে বসছি, অন্যপাশ তো খালি আছে।

গুলিস্তান আন্ডারপাসটি এখন আন্ডারগ্রাউন্ড মার্কেটে পরিণত হয়েছে। এখানে আটটি প্রবেশ ও বের হওয়ার পথ রয়েছে। যাতে বিভিন্ন দিক থেকে আসা লোকজন চলাচল করতে পারেন। এ আন্ডারপাসটি এখন পুরোদমে ইলেক্ট্রনিক্স মার্কেট, বলা যায় ব্যবসায়ীদের দখলে। বিভিন্ন দোকানের মালামাল পথের ওপর রাখায় প্রতিনিয়তই ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন পথচারীরা। প্রবেশ পথের মুখে ভবঘুরেদের জটলা দেখা যায়। সুযোগ পেলেই তারা পকেট কেটে নিচ্ছেন পথচারীদের। তাই সাধারণ মানুষেরা এই আন্ডারপাস ব্যবহার না করে, জীবনের ঝুঁকি নিয়ে ওপর দিয়েই রাস্তা পারাপার হচ্ছেন। এছাড়া, আন্ডারপাসটির ভেতরে শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত হলেও তা বেশিরভাগ সময়ই বন্ধ থাকে।

20171107_140330

তেজগাঁও কলেজের শিক্ষার্থী জানে আলম বলেন, ‘দুই মাস আগে রাতের বেলায় বাড়ি যাওয়ার জন্য গুলিস্তানে আসি। আন্ডারপাস পার হওয়ার সময় এক ব্যক্তি বলে- ভাই, আমার বোন হাসপাতালে। আমার মোবাইলটা নিয়ে আমারে পাঁচ হাজার টাকা দেন।খুব উপকার হবে। তখন আমি বলি- ভাই, আমার কাছে দুই হাজার টাকা আছে। এরমধ্যে পাঁচশ’ টাকা লাগবে গাড়ি ভাড়ায়। আমি কিনতে পারবো না। তার অনুনয়-বিনয়ের পর আমি মোবাইলটি কিনতে রাজি হই। তার হাতে টাকা দেওয়া মাত্রই তিনি দৌড়ে চলে যায়। পরে দেখি আগে যে মোবাইলটা প্রথমে দেখিয়েছিল, এটি সেটি নয়। নষ্ট একটি মোবাইল সেট দিয়ে চলে গেছে।

বেসরকারি ব্যাংকের কর্মকর্তা জহিরুল ইসলাম বলেন, ‘একদিন রাতে ছোটভাইকে নিয়ে  হোটেলে খেতে এসেছিলাম। আন্ডারপাস পার হওয়ার সময় পশ্চিমপাশের গেটে কয়েকজন যৌনকর্মী খুব অশ্লীল ভাষায় ডাকাডাকি শুরু করে দেয়। ছোট ভাইয়ের সামনে সেদিন ভীষণ বিব্রতকর অবস্থায় পড়েছিলাম।’            

দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) প্রধান সম্পত্তি কর্মকর্তা কামরুল ইসলাম চৌধুরী বলেন, ‘আন্ডারপাসের দোকান উচ্ছেদের জন্য আমরা অনুমতি নিয়ে রেখেছি। তবে কয়েকজন দোকান মালিক আদালতে রিট করে উচ্ছেদের বিরুদ্ধে স্থগিতাদেশ নিয়ে রেখেছেন। যে কারণে উচ্ছেদ করা যাচ্ছে না।’

তিনি জানান, এর আগেও কয়েকবার উচ্ছেদ করতে গিয়ে হকারদের বাধার মুখে পড়তে হয়েছে। সে সময় আন্ডারপাসের প্রবেশ মুখে সিলগালা করে দেওয়া হয়েছিল। পরবর্তীতে আবার তা উন্মুক্ত হয়ে যায়।

অন্যদিকে সংস্থার প্রধান রাজস্ব কর্মকর্তা ইউসূফ আলী সরদার বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘১৯৯৬ সালের দিকে গুলিস্তান আন্ডারপাসে ১০৪টি দোকান স্থায়ী বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। এগুলো উচ্ছেদের কোনও সুযোগ নেই।’

এ দুটি আন্ডারপাসের তুলনায় একেবারে ব্যতিক্রম গাবতলীর আন্ডারপাসটি। খুবই পরিচ্ছন্ন, চকচকে এ আন্ডারপাসের ভেতরের পরিবেশ। নেই কোনও হকার কিংবা ভিক্ষুক। আন্ডারপাসটির ভেতরে ময়লা ফেলার জন্য রয়েছে ১২টি ড্রাম। পুরো পাতাল সড়কটি সাজানো হয়েছে বিভিন্ন ধরনের কারুকাজ দিয়ে। ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের এ আন্ডারপাসটি সৌন্দর্যবর্ধন করে নতুন রূপে ২০১৪ সালের ১০ ডিসেম্বর উদ্ধোধন করা হয়।