শহরের ৫৪ শতাংশ নারী সহিংসতার শিকার: অ্যাকশনএইড

‘কার শহর?’ শীর্ষক গবেষণা প্রতিবেদন প্রকাশ অনুষ্ঠান

বাংলাদেশের শহর অঞ্চলের ৫৪ শতাংশ নারী সহিংসতার শিকার হন। এসব নির্যাতিত নারী আইন বা আইন প্রয়োগকারী সংস্থার কাছ থেকে খুব বেশি সহযোগিতা পান না। দেশের শহরগুলোর গণপরিবহন ও নগর কাঠামোও নারীবান্ধব নয়।

বেসরকারি সংস্থা অ্যাকশনএইড-এর এক গবেষণায় এমন তথ্য উঠে এসেছে। বৃহস্পতিবার (৩০ নভেম্বর) রাজধানীর সিরডাপ মিলনায়তনে অ্যাকশনএইড ‘কার শহর?’ শীর্ষক এই গবেষণা প্রতিবেদন প্রকাশ করে। একই দিনে বাংলাদেশসহ ৪৫টি দেশে গবেষণা প্রতিবেদনটি প্রকাশ করা হয়।  যুক্তরাষ্ট্র, আফ্রিকা ও এশিয়ার ১০টি দেশের ওপর এই গবেষণা করা হয়েছে।

নারীর নিরাপত্তা বিষয়ে নেপাল, নাইজেরিয়া, কঙ্গো, জর্ডান, ব্রাজিল এবং জিম্বাবুয়ের মতো দেশগুলোর তুলনায় বাংলাদেশের অবস্থা খারাপ বলে গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছে।

গবেষণায় দেখা যায়, ১০টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের প্রাপ্ত নম্বর ১০০ এর মধ্যে ৩৯ দশমিক ৩২, অবস্থান ষষ্ঠ এবং প্রাপ্ত গ্রেড ‘ডি’। গবেষণায় প্রাপ্ত নম্বরের ভিত্তিতে বাংলাদেশে নারীর প্রতি সহিংসতার হার উচ্চ বলে উল্লেখ করা হয়।

প্রতিবেদনে বলা হয়, নগরে নারীর নিরাপত্তার বিষয়টি খুবই খারাপ পরিস্থিতিতে রয়েছে। নারীর প্রতি সহিংসতার ঘটনা, আইনের বাস্তবায়ন না হওয়া, জেন্ডারবান্ধব নগর পরিকল্পনার অভাব, নারী ও মেয়ে শিশুর জন্য সীমিত এবং অনিরাপদ গণপরিবহনের কারণে বাংলাদেশের এই অবস্থা। প্রতিবেদন বলছে, নারীর নিরাপত্তার বিষয়ে  বাংলাদেশের অবস্থা যুদ্ধ বিধ্বস্ত কঙ্গোর মতো।

গবেষণা প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, নারীরা নগরে তাদের প্রতিদিনের কাজ করতে গিয়ে নিরাপত্তাহীনতায় ভোগেন। শহরের ৫৪ দশমিক সাত শতাংশ নারী সহিংসতার শিকার হন। সহিংসতার বিরুদ্ধে অভিযোগ করতেও নারীরা নিরাপত্তাহীনতায় ভোগেন।

গবেষণার ফলাফলে বলা হয়, শহরের সহিংসতার শিকার নারীদের ৬৫ ভাগ সমাধান খুঁজতে গিয়ে পুলিশের কাছে দ্বিতীয়বার হয়রানির শিকার হন। ৫৭ শতাংশ নারী মনে করেন, তাদের অভিযোগ গুরুত্ব সহকারে নেওয়া হবে না।

গবেষণার তথ্য বলছে, নারীর প্রতি সহিংসতা নিরসনে বাংলাদেশে সমন্বিত আইন আছে। তবে গণপরিসরে নারীদের যৌন হয়রানির বিরুদ্ধে লড়াইয়ের জন্য কোনও সুনির্দিষ্ট আইন নেই। আবার যে আইন আছে, সেখানে যৌন হয়রানি বন্ধে সরাসরি কোনও বিধান নেই। যে কারণে জনপরিসরে যৌন হয়রানি হলে আইনিভাবে খুবই কম প্রতিকার পেয়ে থাকেন নারীরা। ‘যৌন হয়রানি’ শব্দটির সংজ্ঞায়ন কোনও আইনে পরিষ্কারভাবে নেই বলে গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।

গবেষণা প্রতিবেদনটি তুলে ধরেন অ্যাকশনএইড বাংলাদেশের ম্যানেজার কাশফিয়া ফিরোজ।

অনুষ্ঠানে মহিলা ও শিশু বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী মেহের আফরোজ চুমকি বলেন, ‘ঢাকা শহর একটি অপরিকল্পিত শহর। এ শহর পুরুষের। সকালে অফিসের জন্য বের হলে রিকশা বা পরিবহন চালকরা পুরুষ এবং অফিসের দাড়োয়ানও পুরুষ, যেখানে আমরা সভ্য মানুষ হিসেবে আচরণ করি না। এজন্য চাইলেও হুট করে আমরা একটি আইন করতে পারি না। আমাদের মধ্যে সামাজিক সচেতনতা বাড়াতে হবে। পরিবর্তন আনতে হবে মানসিকতায়।’

সিরডাপের অনুষ্ঠানে অংশ নিয়ে র‌্যাবের গণমাধ্যম শাখার পরিচালক কমান্ডার মোহাম্মদ মুফতি মাহমুদ খান বলেন, ‘রাস্তা-ঘাটে নারীদের হয়রানি বা সহিংসতার বিষয়ে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেওয়া কঠিন। কারণ, সহিংসতায় জড়িতদের পাওয়া যায় না। এছাড়া, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমেও অনেক নারী হয়রানির শিকার হচ্ছেন, যেগুলো সমাধান করাও কঠিন। সহিংসতার মাত্রা একদম শূন্যতে নিয়ে আসা অসম্ভব। সহিংসতার  অনেক ঘটনা ঘটে, কিন্তু সেটা প্রমাণ সহকারে আইন প্রয়োগকারী সংস্থা পর্যন্ত আসতে হবে ।’

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের অধ্যাপক ড. শাহনাজ হুদা বলেন, ‘দুঃখের বিষয় যৌন হয়রানি বন্ধে এখনও আমাদের সুনির্দিষ্ট আইন নেই। নারীরা পুলিশের কাছে সহযোগিতার জন্য গেলে, তাদের যেভাবে প্রশ্ন করা হয়, সেটাও এক ধরনের অপরাধ। রাস্তা-ঘাটে যে হয়রানি করা হয়, তা থামানোর জন্য আইন করতে হবে।’

গবেষণা প্রতিবেদনে বাংলাদেশের নগর পরিকল্পনায় জেন্ডার সংবেদনশীলতার বিষয়টি মাথায় নেওয়া হয় না। শহরের যেকোনও রাস্তা বা স্থাপনা নির্মাণের সময় নারীদের কথা বিবেচনা করা হয় না।’

এ বিষয়ে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নগর পরিকল্পনা বিভাগের অধ্যাপক ড. আক্তার মাহমুদ বলেন, ‘নগর পরিকল্পনায় নারীর অংশগ্রহণ কম থাকায় শহরটি পুরুষের শহরে পরিণত হয়েছে।  শহরের অবকাঠামো নারীবান্ধব না। রাস্তা, ফুটপাত, ভবন, যানবাহন, পার্ক, উন্মুক্ত স্থানে নারী স্বাভাবিক ও নিরাপদভাবে চলতে পারে না।’

নারীরা গণপরিবহনে চলাচল করতে গিয়ে বিভিন্ন অনাকাঙ্ক্ষিত স্পর্শ, না জানিয়ে ছবি তোলা, অঙ্গভঙ্গি ও কটুক্তিসহ বিভিন্ন ধরনের সহিংসতার শিকার হন বলে গবেষণা প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।  এতে বলা হয়েছে,  ৪৯ শতাংশ নারী গণপরিবহনে এবং ৪৮ শতাংশ গণসেবা গ্রহণে অনিরাপদ বোধ করেন।

এ বিষয়ে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন করপোরেশনের  সচিব শওকত আলী বলেন, ‘ঢাকা শহরে নারী যাত্রীদের বাসে উঠতে দেওয়া হয় না- এটা অন্যায়। আমরা সচেতনতা বাড়াতে কাজ করছি। নগর ব্যবস্থাপনায় যে কর্তৃপক্ষগুলো আছে, তারা ঠিকভাবে দায়িত্ব পালন করেন না। আছে সমন্বয়ের অভাব। সমন্বিতভাবে কাজ করলে পরিবহন ব্যবস্থা নারীবান্ধব হবে।’

আরও পড়ুন: 

শিক্ষার্থী-অভিভাবকদের সিদ্ধান্ত নেওয়ায় সহায়তা করতেই র‌্যাংকিং: জুলফিকার রাসেল