প্রতিবন্ধকতা জয় করে চাকরির খোঁজে তারা

 

বানু আক্তার ও খোরশেদ আলম দম্পতি

শারীরিক প্রতিবন্ধী বানু আক্তার থাকেন গাজীপুরের কোনাবাড়িতে। তার স্বামী খোরশেদ আলমও প্রতিবন্ধী। তিনি ঘরের কাজে স্ত্রীকে সহযোগিতা করেন। তাদের ছেলে বিল্লাল হোসেনের বয়স ৪ বছর। তাকে লেখাপড়া করানোর ইচ্ছা বানুর। কিন্তু এজন্য টাকা দরকার। চাকরি পেলে কাজটা সহজ হতো বলে মনে হয় তার। তাই রাজধানীর কাওরান বাজারের বিজিএমইএ ভবনে প্রতিবন্ধীদের চাকরির মেলায় এসেছেন তিনি। গতবারও এসেছিলেন। কিন্তু লাভ হয়নি। তার ভাষ্য, ‘হাত-পা ছাড়া কিভাবে কাজ করবো বলে চাকরি দেওয়া হয়নি আমাকে।’

চাকরির মেলায় এবার পুঁতির বিভিন্ন সামগ্রী নিয়ে বানু আক্তার। বাংলা ট্রিবিউনকে তিনি বললেন, ‘আমার দুটি হাত নেই। কিন্তু দুই পা দিয়ে পুঁতির বিভিন্ন ডিজাইনের নারীদের জন্য হাত ব্যাগ ও হরেক রকমের সামগ্রী বানাই। এর বাইরে পা দিয়ে সেলাই মেশিনের কাজ করি। এসব বিক্রি থেকে যা আয় হয় তা দিয়ে আমাদের সংসার চলে।’

এমন আরেক শারীরিক প্রতিবন্ধীর সঙ্গে কথা হলো। নাম ইন্দ্রজিৎ কুমার। এসেছেন নওগাঁ জেলা থেকে। তবে থাকেন রাজশাহীতে। সেখানে একটি স্থানীয় কলেজে ভূগোলে অর্নাস দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র তিনি। চাকরি করেন একটি গার্মেন্টে। তার কথায়, ‘বাড়িতে বৃদ্ধ মা-বাবা থাকেন। তাদের জন্য প্রতি মাসে কিছু টাকা পাঠাতে হয়। এখন একটি সরকারি চাকরি করতে চাই। কারণ গার্মেন্টে কাজে অনেক কষ্ট হয়। বেতনও খুব বেশি পাই না।’

20171209_115819

কম্পিউটার অপারেটর হিসেবে কাজ করতে চান ইন্দ্রজিৎ কুমার। এজন্য কম্পিউটারের কাজ শিখেছেন তিনি। শারীরিক প্রতিবন্ধকতার জন্য অনেক সময় হেয় প্রতিপন্ন হতে হয় বলে অভিযোগ ইন্দ্রজিতের। অবশ্য অনেকের সহযোগিতাও পান বলে জানালেন। তার ভাষ্য, ‘সহজে কেউ চাকরি দিতে চায় না। পায়ের প্রতিবন্ধকতা নিয়ে কিভাবে কাজ করবো, একথা বলে মুখ ফিরিয়ে নেয়।’

একই অভিজ্ঞতার সম্মুখীন হয়েছেন টঙ্গী সরকারি কলেজের সমাজকল্যাণ বিভাগের মাস্টার্সের ছাত্র হোসাইন আহমেদ। গতবার কৃষিবিদ ইনস্টিটিউটে আয়োজিত প্রতিবন্ধীদের জন্য চাকরির মেলায় ১১টি প্রতিষ্ঠানে আবেদন করেছিলেন তিনি। কিন্তু কোথাও থেকে ডাক পাননি। এবারও পাঁচটি প্রতিষ্ঠানে আবেদন করেছেন।   

মেলায় এসে ছাত্র হোসাইন আহমেদ বাংলা ট্রিবিউনকে বলেছেন, ‘শারীরিক প্রতিবন্ধী হওয়ার কারণে কেউ চাকরি দিতে চায় না। আমি নাকি ভারী কাজ করতে পারবো না। আরও অনেক কথা বলে, কিন্তু কেউ চাকরি দেয় না। সবাই আমাদেরকে বোঝা মনে করেন। আমরা সমাজের জন্য বোঝা নয়, সম্পদ হয়ে সাধারণ মানুষের মতো  চাকরি করে বাঁচতে চাই।’

ইন্দ্রজিৎ কুমার

যোগ্যতা অনুযায়ী চাকরি করে দেশ ও সমাজ গঠনে অবদান রাখতে চান বানু আক্তার, ইন্দ্রজিৎ ও হোসাইনের মতো প্রতিবন্ধীরা। তারা নিজেদের যোগ্য মনে করেন। সেই যোগ্যতার ভিত্তিতে এখন তাদের চাকরি প্রয়োজন। নিজেদের প্রস্তুত করে তোলা এই মানুষগুলো এখন সক্ষমতা প্রমাণে জায়গা চান। তাদের আশা, সরকার সেই জায়গা তৈরি করে দেবে।

গত ৯ ডিসেম্বর রাজধানীর কাওরান বাজারের বিজিএমইএ ভবনে প্রতিবন্ধীদের চাকরির মেলা ছিল দক্ষতায় পূর্ণ প্রতিবন্ধীদের আনাগোনায় মুখর। তারা বলছেন, ‘আমরা সমাজ ও পরিবারের বোঝা হয়ে বাঁচতে চাই না। অন্য সাধারণ মানুষের মতো সম্মান নিয়ে সমাজে বাঁচার অধিকার আছে আমাদের। আমরাও কাজ করতে পারি। যোগ্যতা অনুযায়ী আমাদের কাজ করার সুযোগ দেন।’

এদিকে চাকরির ক্ষেত্রে দেশের প্রতিবন্ধী জনগোষ্ঠীর জন্য পৃথক সিলেবাস, প্রশ্নপ্রত্র ও পরীক্ষা ব্যবস্থা চালু করার প্রয়োজনীয়তা দেখছেন প্রধানমন্ত্রী কার্যালয়ের টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি) বিষয়ক মুখ্য সমন্বয়কারী আবুল কালাম আজাদ। ৯ ডিসেম্বর দিনব্যাপী ‘প্রতিবন্ধীদের জন্য চাকরির মেলা’ শীর্ষক অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন তিনি।

হোসাইন আহমেদ

এসডিজি বিষয়ক মুখ্য সমন্বয়কারীর ভাষ্য, ‘চাকরির ক্ষেত্রে দেশের বিশেষ জনগোষ্ঠীর (প্রতিবন্ধী) জন্য আলাদা প্রশ্নপত্র ও পরীক্ষার ব্যবস্থা করা প্রয়োজন। তা না হলে এই শ্রেণির শিক্ষিত ও দক্ষ ব্যক্তিরা সমাজের অগ্রগতিতে অংশ নিতে পারবেন না। সাধারণ পরীক্ষার্থীদের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকাও তাদের জন্য দুষ্কর। ফলে সরকারের নির্ধারিত কোটাও পূরণ হবে না। এজন্য প্রতিবন্ধীদের জন্য আলাদা পরীক্ষা পদ্ধতি রাখা প্রয়োজন হয়ে দাঁড়িয়েছে। যার মাধ্যমে সরকারি চাকরির পাশাপাশি বেসরকারি পর্যায়ে যে কোটা রয়েছে তা পূরণ করা সম্ভব হবে।’

আয়োজকরা জানান, মোট ৯টি বেসরকারি সংস্থার (এনজিও) প্রচেষ্টায় মেলাটি অনুষ্ঠিত হয়। এতে তৈরি পোশাকসহ মোট ২০টি প্রতিষ্ঠান অংশগ্রহণ করে। মেলায় অর্ধশতাধিক প্রতিবন্ধীর চাকরি নিশ্চিত হয়েছে।