গত কয়েক বছর ধরে তীরশিলং জুয়া পুরো সিলেট জেলায় ছড়িয়ে পড়েছে। এতে করে স্থানীয় জুয়াড়িরা একদিকে যেমন অর্থ-সম্পদ হারাচ্ছে, তেমনি তাদের লোভের প্রতিক্রিয়ায় সামাজিক অস্থিতিশীলতাও তৈরি হচ্ছে (লিংক-১)। সম্প্রতি এই খেলাটি সিলেট জেলা ছাড়িয়ে সুনামগঞ্জ জেলার কিছু স্থানেও ছড়িয়ে পড়ছে। (লিংক: সুনামগঞ্জ) সুনির্দিষ্ট কয়েকটি ওয়েবসাইটকে কেন্দ্র করে খেলা হয় এই জুয়া। এক্ষেত্রে বাংলা ট্রিবিউনের অনুসন্ধানে কয়েকটি ওয়েবসাইট বেরিয়ে এসেছে।এগুলোর মধ্যে অন্যতম হচ্ছে, http://teertoday.com/ http://nightteer.com/ । এছাড়া কিছু ফেসবুক আইডি থেকেও জুয়াটির প্রচারণা চালানো হয়।
তীরশিলং জুয়া বন্ধে সিলেট জেলার আইনশৃঙ্খলা কমিটির বৈঠকেও আলোচনা হয়। জেলার উপজেলা প্রশাসন, স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরাও জানিয়েছেন, জুয়াটি বন্ধে প্রথমত ওয়েবসাইট বন্ধ করা উচিত। দ্বিতীয়ত, দুর্বল জুয়া আইন আরও সক্রিয় ও বাস্তবসম্মত করা দরকার। তাহলেই তীরশিলং সমূলে উৎপাটন করা সম্ভব হতে পারে।
এ বিষয়ে সিলেট মেট্রোপলিটন পুলিশের কমিশনার গোলাম কিবরিয়া বলেন, ‘ওয়েবসাইট বন্ধ করে দিলেই হয়। কিন্তু এটা ভালো করে বলতে পারবে বিটিআরসি। আমরা, বিভাগীয় কমিশনারসহ অনেকেই তাদের অবহিত করেছি। এখন যদি সাইটগুলো বন্ধ করে দিতে পারে তাহলে হয়তো এই তীরশিলং জুয়া বন্ধ হতে পারে।’
সিএমপি এডিসি (মিডিয়া) এম এ ওয়াহাব বলেন, ‘২০১৬ সালেই পুলিশ হেডকোয়ার্টারের মাধ্যমে চিঠি পাঠিয়েছি। ১৬-১০-২০১৬ এ চিঠি পাঠিয়েছি। এরপর আর পাঠানো হয়নি।’
তীরশিলং বন্ধে সিএমপির কোনও চিঠি পেয়েছেন কিনা, এমন প্রশ্নে বিটিআরসির চেয়ারম্যান শাহজাহান মাহমুদ বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘আমার জানামতে কোনও চিঠিপত্র পাইনি।’ তবে তিনি জোর দিয়েছেন, ওয়েবসাইট বন্ধে কোনও চিঠি পেলে ব্যবস্থা নেবেন। শাহজাহান মাহমুদ বলেন, ‘চিঠি পেলে অবশ্যই-অবশ্যই আমরা ব্যবস্থা গ্রহণ করবো।’
তীরশিলং জুয়ার সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত সিলেটের গোয়াইনঘাট উপজেলা। সেখানকার নির্বাহী অফিসার বিশ্বজিৎ কুমার পালও বাংলা ট্রিবিউনকে জানিয়েছেন, তার জানা মতে তীরশিলং এর ওয়েবসাইটগুলো বন্ধ করতে বিটিআরসিকে চিঠি দেওয়া হয়েছে।
তীরশিলং বন্ধে প্রচলিত জুয়া আইন সংশোধনের দাবি জানিয়েছেন জুয়ায় আক্রান্ত এলাকার প্রশাসন ও জনপ্রতিনিধিরা। তারা বলছেন, বর্তমান জুয়া আইনে জুয়াড়িকে ধরতে হলে প্রমাণসহ আটক করতে হয়। প্রকাশ্য জুয়া আইন-১৮৬৭ এর বিভিন্ন ধারায় জুয়ার সামগ্রীর যে কথা বলা হয়েছে, তীরশিলং জুয়ায় এ ধরণের সামগ্রীর ব্যবহার নেই। এক্ষেত্রে মোবাইল ফোনে জুয়াটি খেলায় আইনত শক্ত ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারছে না প্রশাসন।
গোয়াইনঘাট উপজেলা নির্বাহী অফিসার বিশ্বজিৎ কুমার পাল বলছেন, ‘বিদ্যমান জুয়া আইনে তীরশিলং জুয়া বন্ধে কার্যকর না। এক্ষেত্রে জুয়াটিকে সমূলে উৎপাটন করতে হলে আইন সংশোধন করতে হবে।’
সিলেট জেলার জৈন্তা উপজেলা চেয়ারম্যান মো. জয়নাল আবেদীন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘তীরশিলং খেলার কারণে সামাজিক-পারিবারিক বন্ধন দুর্বল হয়ে পড়ছে।’ গোয়াইঘাট উপজেলা চেয়ারম্যান আবদুল হাকিম চৌধুরীর ভাষ্য, ‘আইনশৃঙ্খলা কমিটির বৈঠকে এই জুয়া বন্ধে প্রশাসনকে তাগাদা দিলেও আইন না থাকায় কার্যকর কোনও ব্যবস্থা নেওয়া যাচ্ছে না।’
সক্রিয় সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমেও
এদিকে, জুয়া খেলায় আগ্রহ বাড়াতে ফেসবুক ও হোয়াটসঅ্যাপে দেওয়া হয় নানা প্রলোভন। আগের রাতেই দেওয়া হয় পরের দিনে জুয়ায় জিতে যাওয়ার সম্ভাব্য টোপ। আর গ্রাহকরা নির্দিষ্ট নম্বরে যোগাযোগ করে সিরিয়াল দেন। আর এই অগ্রিম যোগাযোগের জন্য পরেরদিনের খেলার টোপ দেওয়া হয় ফেসবুকে।
অনুসন্ধানে এমন অন্তত ৫০টি আইডি পাওয়া গেছে, যেখান থেকে তীর শিলং জুয়ার সম্ভাবনা, গুটি সম্পর্কে ধারণা দেওয়া হয়। কিছু আইডি সিলেট থেকে, কিছু শিলং থেকে সরাসরি চালানো হয়। একই সঙ্গে যোগাযোগের জন্য দেওয়া হয় মোবাইল নম্বরও।
আরও পড়ুন:
শিলংয়ের জুয়ায় দিশেহারা সিলেট (ভিডিও)
তীরশিলং জুয়া কী, কারা ছুড়ে দিচ্ছে তীর?
প্রাণ গেলো রফিকের, সচ্ছল পরিবার এখন পথে
শিলংয়ের ‘তীর’ এবার সুনামগঞ্জের দিকে