‘হেফাজতে মৃত্যু নিবারণ আইন’ সংশোধন চায় পুলিশ

পুলিশ সপ্তাহ ২০১৮-এর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখছেন প্রধানমন্ত্রী (ছবি- ফোকাস বাংলা)জামিন অযোগ্য ‘নির্যাতন এবং হেফাজতে মৃত্যু (নিবারণ) আইন-২০১৩’ এর সংশোধন চান পুলিশ সদস্যরা। সোমবার (৮ জানুয়ারি) পুলিশ সপ্তাহের উদ্বোধনী দিনে পুলিশ কল্যাণ সভায় প্রধানমন্ত্রীর কাছে এমন দাবি তুলে ধরেছেন তারা।

এছাড়া, পুলিশের স্বাস্থ্য ব্যবস্থা ঢেলে সাজানো, রেশনিং ব্যবস্থা পুনর্গঠন, মাঠ পর্যায়ের পুলিশ সদস্যদের মোটরসাইকেল দেওয়া ও আউট সোর্সিং রাজস্ব খাতে নেওয়ার বিষয়েও দাবি তোলা হয়। কনস্টেবল থেকে এডিশনাল এসপি পদমর্যাদার সদস্যরা প্রধানমন্ত্রীর কাছে এসব দাবি তুলে ধরেন। তাদের সব দাবির বিষয়ে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণের আশ্বাস দেন প্রধানমন্ত্রী।

এসময় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খাঁন কামাল, স্বরাষ্ট্র সচিব কামাল উদ্দীন,পুলিশ মহাপরিদর্শক একেএম শহীদুল হকসহ পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। 

রাজারবাগ পুলিশ লাইনের অডিটরিয়ামে ‘কল্যাণ সভায়’ সোমবার উপস্থিত ছিলেন এমন পুলিশ কর্মকর্তারা বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) বনানী থানার ওসি ফরমান আলী প্রধানমন্ত্রীর কাছে দাবি করেন, জামিন অযোগ্য ‘নির্যাতন এবং হেফাজতে মৃত্যু (নিবারণ) আইন’ সংশোধনের। ফরমান আলী প্রধানমন্ত্রীর উদ্দেশে বলেন, ‘‘হেফাজতে থাকা অবস্থায় ‘মানসিক চাপে’ কেউ মারা গেলেও পুলিশ দোষী হয়ে যায়। মানসিক চাপ না দিলে তো অপরাধীর কাছ থেকে তথ্য পাওয়া যাবে না। সারাবিশ্বে এ নিয়ম চালু রয়েছে। তাছাড়া, কেউ মিথ্যা মামলা করলেও এ মামলায় সেই পুলিশ সদস্য জামিন পাবেন না।’’ তার লিখিত পুরোবক্তব্য শুনে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আইনের ব্যাপারে কিছু বলা যাবে না। তবে কিছু বিষয়ে সংশোধনের দিকগুলো খতিয়ে দেখা হবে।’

পুলিশ বাহিনীতে সরকারি কর্মকমিশনের মাধ্যমে চিকিৎসক নিয়োগের বিষয়ে ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) সিনিয়র সহকারী পুলিশ কমিশনার নাদিয়া ফারজানা প্রধানমন্ত্রীর উদ্দেশে বলেন, ‘রাজারবাগ কেন্দ্রীয় পুলিশ হাসপাতাল, সারদা প্রশিক্ষণ একাডেমিসহ দেশের বিভিন্ন জায়গায় পুলিশ হাসপাতালগুলোতে চিকিৎসা ব্যবস্থা অপ্রতুল। হাসপাতালগুলোতে পর্যাপ্ত শয্যা নেই। এসব হাসাপাতালে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের খুবই অভাব। পোস্টিং নিয়ে আসলেও চিকিৎসকেরা থাকতে চান না। বর্তমানে সবগুলো হাসপাতালেই ২৫ থেকে ৭০ শতাংশ পদ খালি রয়েছে।’

এ প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘এটা একটা ভালো প্রস্তাব। সেনাবাহিনীতেও মেডিক্যাল কোর আছে। আপনারাও তো মেডিক্যাল ইউনিট গঠন করলেই পারেন।’ 

আউট সোর্সিংয়ের মাধ্যমে জনবল না নিয়ে স্থায়ীভাবে রাজস্ব খাতের মাধ্যমে জনবল নিয়োগের বিষয়ে প্রধানমন্ত্রীর কাছে দাবি তোলেন ঢাকা জেলার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার গোলাম আজাদ খান। তিনি বলেন, ‘বাবুর্চি, ক্লিনার, ইলেকট্রিশিয়ানের মতো দুই হাজার ৬৭৩টি পদের বিপরীতে দুই বছর পরপর আউট সোর্সিংয়ের মাধ্যমে পুলিশ বাহিনীতে লোক নিয়োগ করা হয়ে থাকে। তবে আউট সোর্সিংয়ের মাধ্যমে লোক নেওয়া হলে পুলিশের মতো ডিসিপ্লিন ফোর্সের বিভিন্ন তথ্য ফাঁস হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। এতে করে অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তাও প্রশ্নের মুখে পড়ে।’  তিনি বলেন, ‘দুই বছর পর তাদের চাকরির মেয়াদ শেষ হয়ে যাবে, এমন ভাবনা থেকে নিয়োগ পাওয়া লোকেরা চাকরিতে থাকা অবস্থায়ই অন্য চাকরি খুঁজতে থাকেন। এতে করে তারা নিজেদের কাজে আন্তরিক হন না।’ তাই আউটসোর্সিং খাতটি রাজস্ব খাতে নিয়ে আসার দাবি জানান তিনি। প্রধানমন্ত্রী এ বিষয়টি অর্থমন্ত্রণালয়ের সঙ্গে আলোচনা করে সিদ্ধান্ত দেবেন বলে জানিয়েছেন।

কর্তব্যরত অবস্থায় কোনও পুলিশ সদস্যের মৃত্যু হলে তার পরিবারের জন্য রেশন সুবিধা অব্যাহত রাখার দাবি করে ডিএমপি’র কনস্টেবল নাসরিন আফরোজা বলেন, ‘পরিবারের উপার্জনকারী ব্যক্তিটির মৃত্যু হলে পুরো পরিবারটি অসহায় হয়ে পড়ে। বেতন বন্ধ হয়ে গেলেও সমস্যাগ্রস্ত পরিবারটির জন্য রেশন সুবিধা অব্যাহত রাখলে অন্তত তারা খেয়ে বাঁচতে পারবে। তিনি শতভাগ রেশন সুবিধা দাবি করেন প্রধানমন্ত্রীর কাছে। নাসরিন আফরোজার দাবিটিও বিবেচনায় রাখবেন বলে আশ্বাস দেন প্রধানমন্ত্রী।

শেরপুর জেলার এসআই গোলাম মোস্তফা তার দাবি তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রীর উদ্দেশে বলেন, ‘পুলিশ সদস্যদের যানবাহন সমস্যা অত্যন্ত প্রকট। দুর্গম এলাকায় অনেক কষ্ট করে দায়িত্ব পালন করতে হয়।’ মাঠ পর্যায়ে কর্তব্যরত এসআইদের মোটরসাইকেল কিনতে দুই লাখ টাকা লোন প্রদান এবং জ্বালানি সুবিধা দেওয়ার দাবি জানান তিনি। প্রধানমন্ত্রী জ্বালানির বিষয়ে না সূচক জবাব দিলেও স্বল্প সুদে ঋণের মাধ্যমে মোটরসাইকেল দেওয়ার জন্য পুলিশ কর্তৃপক্ষকে নির্দেশনা দেন।

এছাড়া, পুলিশের আবাসন, শতভাগ রেশন, চিকিৎসা সুবিধা বৃদ্ধি, প্রশিক্ষণ প্রদান এবং প্রয়োজনীয় যানবাহন ও অন্যান্য সরঞ্জামাদি অগ্রাধিকার ভিত্তিতে সরবরাহের বিষয়টিও সরকারের সক্রিয় বিবেচনায় রয়েছে বলে জানান প্রধানমন্ত্রী। এসময় তিনি বলেন, ‘পুলিশের জন্য স্টাফ কলেজ আওয়ামী লীগ সরকারই করেছে।’ পুলিশের সার্জেন্ট পদে নারী সদস্য নিয়োগসহ সুযোগ-সুবিধা এবং পদ মর্যাদা বৃদ্ধিতে তার সরকারের বিভিন্ন উদ্যোগও তুলে ধরেন তিনি।