সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী,বাংলাদেশে মোট ১৫ লাখ ৪০ হাজার জন বা মোট জনসংখ্যার এক শতাংশ প্রতিবন্ধী।কিন্তু,তাদের মধ্যে খুব কম জনই বিয়ের সুযোগ পান। উইমেন উইথ ডিজ্যাবিলিটি ডেভেলপমেন্ট ফাউন্ডেশনের (ডাব্লিউডিডিএফ) তথ্যানুযায়ী শতকরা একজন প্রতিবন্ধী নারী বিয়ের পর মৃত্যু পর্যন্ত স্বামীর ঘর করার সুযোগ পান।
এ বিষয়ে শারীরিক প্রতিবন্ধী ও বাংলালিংকের এক্সিকিউটিভ গোলাম মাওলা বলেন, ‘বাংলাদেশের মানুষ প্রতিবন্ধীদের সেভাবে মেনে নিতে পারেন না। যা প্রতিবন্ধীর জন্য স্ট্রাগলের বিষয়। প্রতিবন্ধীদের বাইরে কাউকে এই কষ্টের কথা বোঝানো যাবে না। এদেশে প্রতিবন্ধীদের সঙ্গে যারা মেশেন তারা সমাজকে দেখানোর জন্য বা একটা মায়া থেকেই মেশেন। কেউই মন থেকে একজন প্রতিবন্ধীকে সম্মান করেন না। ফলে তাদের পক্ষে প্রতিবন্ধীকে বিয়ে করা বা সংসার করার চিন্তা সম্ভব না।’
তিনি আরও বলেন, ‘বিরল উদাহরণ প্রকৃত উদাহরণ হতে পারে না। আমার বন্ধুদের কাউকে প্রতিবন্ধীকে বিয়ে করতে দেখিনি। আমার সঙ্গে অনেকেই মেশেন, বন্ধুত্ব হয় কিন্তু যখন বিয়ের প্রসঙ্গ আসে তখনই তারা পিছিয়ে যান। আবার শুধু ছেলেরা নয়, মেয়েরাও প্রতিবন্ধী ছেলেকে বিয়ে করতে চান না।’
রূপসী (ছদ্মনাম) (২৮) নামের একজন প্রতিবন্ধী তরুণী বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন,‘বিয়ে নিয়ে আমি ভাবতে চাই না। কারণ, প্রতিবন্ধী হওয়ায় বিয়ের পর আমাকে অনেক ধকল সইতে হবে। যা আমার জন্য ভালো হবে না।’
শিউলি (ছদ্মনাম) নামে আরেক প্রতিবন্ধী বলেন, ‘অনেকে বিয়ের প্রস্তাব নিয়ে আসেন। কিন্তু আমি শুনেছি যারা লেখাপড়া জানেন না তারা প্রতিবন্ধীদের সঙ্গে ভালো ব্যবহার করেন না। তাই শিক্ষিত হয়ে অর্থ উপার্জনের জন্য কাজ না শেখার আগে বিয়ে করবো না।’
তেমনই একজন সুন্দরী (৫০)। তিনি একজন বাক প্রতিবন্ধী। দরিদ্র পরিবারের মেয়ে সুন্দরীর ৩০ বছর বয়সেই একজন বিবাহিত পুরুষের সঙ্গে বিয়ে হয়। সেই স্বামীর ঘরে ছিল তিন সন্তান। বিয়ের পর সুন্দরীরও একটি সন্তান হয়। কিন্তু সন্তানের বয়স দুই বছর হতেই সুন্দরীকে মা-বাবার কাছে পাঠিয়ে দেয় স্বামী। আর তার কাছ থেকে ছেলেটিকেও নিয়ে নেয়। এরপর থেকে সে মা-বাবার কাছে আছে।
আরেক প্রতিবন্ধী সুজয় (২২)পেশায় কারখানার শ্রমিক। তার সংসারে স্ত্রী এবং এক সন্তান রয়েছে। তিনজনে মিলে সুজয়ের সুখের সংসার।
আমাদের চারপাশে রুপসী, শিউলি, সুন্দরী বা সুজয়রা সংখ্যায় কম নয়। তারা প্রতিবন্ধিতাকে জয় করে টিকে আছে।
প্রতিবন্ধী সন্তানের মা ঝর্ণা বেগম বলেন, ‘কোনও মা-বাবা তার সন্তানকে প্রতিবন্ধী কারও সঙ্গে বিয়ে দিতে চান না। কেউ যেমন প্রতিবন্ধী বউ চান না তেমনি কেউ প্রতিবন্ধী ছেলের সঙ্গে মেয়ে বিয়ে দিতে চান না।’
টার্নিং পয়েন্ট ফাউন্ডেশনের এক্সিকিউটিভ ডিরেক্টর এবং ওয়ার্ল্ড ব্যাংকের প্রতিবন্ধী বিশেষজ্ঞ জীবন উইলিয়াম গোমেজ বলেন, ‘প্রতিবন্ধীদের পরিবার গঠন ও যৌন জীবনের অধিকারের ক্ষেত্রে সমাজে নানা প্রতিবন্ধকতা রয়েছে। বিশেষ করে প্রতিবন্ধী নারীরা বিয়ে করতে পারেন না। তাদের বিয়ের প্রসঙ্গ এলে তারা কথা বলতে পারে কিনা, দেখতে পায় কিনা এগুলো বেশি বিবেচনায় আনা হয়।নারীদের যৌন প্রজনন স্বাস্থ্য, পরিবার গঠন ও অধিকার নিয়ে কেউ ভাবে না। প্রত্যেকের এ বিষয়টি নিয়ে ভাবা উচিত। তাদের নিজস্ব চাহিদা রয়েছে। কোনও প্রতিবন্ধী ব্যক্তি বিয়ে করলে তার প্রাইভেসি নিয়ে মশকরা করা হয়।দাম্পত্য জীবনে এর প্রভাব পড়ে।’
তিনি আরও বলেন, ‘বিয়ের পর প্রতিবন্ধীদের ওপর পরিবার ও সমাজ অনেক চাপ সৃষ্টি করে। ফলে তাদের দাম্পত্য সম্পর্ক নষ্ট হয়। তাছাড়া সামাজিক ও পারিবারিক বিভিন্ন বাধা তো আছেই। কোনও পরিবারে প্রতিবন্ধী মেয়ে থাকলেও সেই পরিবারে প্রতিবন্ধী ছেলে বউ নিতে চায় না। তাছাড়া মনে করা হয়, স্বামী বা স্ত্রী প্রতিবন্ধী হলে সন্তানও প্রতিবন্ধী হবে। দাম্পত্য জীবনে অপারগ থাকবে। সব মিলিয়েই বাধা আছে।’
অলিভিয়া রড্রিক্স ও প্রতিবন্ধী জীবন উইলিয়াম গোমেজকে ২০১০ সালের ২৯ ডিসেম্বর বিয়ে করেন। তাদের পাঁচ বছর বয়সী একটি সন্তানও রয়েছে। দাম্পত্য জীবন সম্পর্কে অলিভিয়া রড্রিক্স বলেন, ‘আমরা দাম্পত্য জীবনে অনেক খুশি আছি। প্রত্যেক ক্ষেত্রে গ্রহণ করার বিষয়টি জরুরি। প্রতিবন্ধী মানুষ বলে যে তার যৌন চাহিদা নেই বিষয়টি এমন নয়। আমার বিয়ের সময় পরিবার থেকে সবচেয়ে বেশি বাধা এসেছে। মা বাধা দিয়েছেন। পরে আমি মাকে বলেছি যদি বিয়ের পর সড়ক দুর্ঘটনায় আমি প্রতিবন্ধী হয়ে যাই তখন আমি কী করতাম? আমার বাবাও প্রথমে বাধা দিয়েছিলেন কিন্তু পরে বোন ও বাবার সহায়তায় বিয়ে করি।’
তিনি আরও বলেন, ‘আসলে দাম্পত্য জীবনে দুজনের মনের মিলটাই জরুরি। আমাদের ক্ষেত্রে সেটা হয়েছে।’
সেন্টার ফর সার্ভিসেস অ্যান্ড ইনফরমেশন অন ডিজ্যাবিলিটির (সিএসআইডি) নির্বাহী পরিচালক খন্দকার জহুরুল আলম বলেন, ‘বাংলাদেশে একজন প্রতিবন্ধীর বিয়ে করে সংসার করা খুব একটা সহজ না। নারীর জন্য তো খুবই কঠিন। কোনও পাত্র বিয়ে করতে চাইলেও যৌতুকের বিষয়টা মুখ্য হয়ে দাঁড়ায়। তবে প্রতিবন্ধী ছেলেরা বিয়ে করে। তারা কখনও কখনও প্রতিবন্ধী মেয়েকে বিয়ে করে, আবার সাধারণ মেয়েকেও বিয়ে করে।’
তিনি আরও বলেন, ‘প্রতিবন্ধীদের বিয়ের ক্ষেত্রে সামাজিক বাধাটা অনেক বেশি। সামাজিকভাবে প্রতিবন্ধীদের বিয়ের গ্রহণযোগ্যতা নেই। বাংলাদেশে একজন প্রতিবন্ধীদের অধিকারের বিষয়ে অনেকে বড় বড় কথা বলেন।কিন্তু নিজের মেয়েকে তিনি কখনও প্রতিবন্ধী ছেলের সঙ্গে বিয়ে দিতে রাজি হন না।’