‘ধ্বংসাত্মক নয়, মাদ্রাসা নৈতিকতার শিক্ষা দেয়’

‘ইসলাম শান্তির ধর্ম, এই ধর্ম কখনোই ধ্বংসাত্মক কর্মকাণ্ডে জড়াতে উৎসাহ দেয় না। যদি আজ কোরআনের সঠিক আলো সবার মধ্যে সঠিকভাবে সবার কাছে যেত, তাহলে শুধু বাংলাদেশ নয় পৃথিবীর শত শত কোটি মানুষের মধ্যে সৌহার্দ্য ও ভ্রাতৃত্বপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখা সম্ভব হতো। সব ধর্মের মানুষ সুন্দরভাবে বসবাস করতো। এত ধ্বংসাত্মক কার্যকলাপ ও জঙ্গিবাদ মাথা চাড়া দিয়ে উঠতো না। এজন্য মাদ্রাসা শিক্ষার গুরুত্বই সবচেয়ে বেশি।’ বৃহস্পতিবার ‘মাদ্রাসা শিক্ষার ভবিষ্যৎ’ শীর্ষক বাংলা ট্রিবিউন বৈঠকিতে অংশ নিয়ে বক্তারা এসব কথা বলেন।

বাংলা ট্রিবিউন বৈঠকিরাজধানীর শুক্রাবাদের বাংলা ট্রিবিউন স্টুডিও থেকে এ আয়োজন সরাসরি সম্প্রচার করে এটিএন নিউজ। মুন্নী সাহার সঞ্চালনায় বৈঠকিতে আলোচনায় অংশ নেন ইসলামিক ফাউন্ডেশনের মহাপরিচালক সামীম মোহাম্মদ আফজাল, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উর্দু বিভাগের অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ গোলাম রব্বানী, বাংলাদেশ কওমি মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ডের সহ-সভাপতি মুফতি ফয়জুল্লাহ, ঢাকা ট্রিবিউনের সাংবাদিক সোহেল মামুন এবং বাংলা ট্রিবিউনের চিফ রিপোর্টার উদিসা ইসলাম।

ইসলামিক ফাউন্ডেশনের মহাপরিচালক সামীম মোহাম্মদ আফজালইসলামিক ফাউন্ডেশনের মহাপরিচালক সামীম মোহাম্মদ আফজাল বলেন, ‘ধর্মীয় শিক্ষা এসেছে পৃথিবীর মানুষদের সুন্দর বানানোর জন্য, কিন্তু এর কারণে আধুনিক শিক্ষার কোনও ক্ষতি হবে না। মাদ্রাসাগুলোতেও বাংলা, ইংরেজি ইতিহাস পড়ানো হয়। ধর্মীয় শিক্ষার সঙ্গে সাধারণ শিক্ষাকে সাংঘর্ষিক করার কোনও যুক্তি নেই। মাদ্রাসাগুলো মূলত দিনি শিক্ষা দেয়, নৈতিকতা শিক্ষা দেয়। তাছাড়া যারা মাদ্রাসায় শিক্ষা গ্রহণ করে তারা ডাক্তার হচ্ছে, ইঞ্জিনিয়ার হচ্ছে।’

বাংলাদেশ কওমি মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ডের সহ-সভাপতি মুফতি ফয়জুল্লাহ বলেন, ‘প্রাথমিক পর্যায়ের মাদ্রাসাগুলোতে কোরআন শেখানোর পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের আরও যুগোপযোগী করে গড়ে তুলতে আরও বেশ কিছু বই পড়ানো হয়। মাদ্রাসাগুলোতে আদর্শিকতা, ইসলামিক, দিনি শিক্ষা দেওয়া হয়, নৈতিকতা শেখানো হয়। শুধু তাই নয়, আমরা অসাম্প্রদায়িকতায় বিশ্বাসী। ফলে আমরা সবসময়ই চাই বাংলাদেশের সবগুলো মাদ্রাসা একই সিলেবাসের ভিত্তিতে শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালিত হবে, একই বোর্ডের নিয়ন্ত্রণে থাকবে।’

মুফতি ফয়জুল্লাহতিনি আরও বলেন, ‘সরকারসহ দেশের সবাই স্বীকার করে, কওমি মাদ্রাসার মধ্যে কেউ কোনও সন্ত্রাস, দুর্নীতি ধ্বংসাত্মক কাজের সঙ্গে জড়িত হয় না। ইসলাম সবসময় নারীর অধিকার, নারীর মর্যাদাকে প্রাধান্য দেয়। এটা তো অস্বীকার করার কিছু নেই। বাংলাদেশে সাধারণ শিক্ষায় শিক্ষিত ২ কোটি শিক্ষার্থী বেকার আছে অথচ কওমি মাদ্রাসার শিক্ষার্থীরা এখন পর্যন্ত কেউ বেকার নেই। তারা নিজেদের যোগ্যতা দিয়ে চাকরিজীবনে প্রবেশ করে।’

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উর্দু বিভাগের অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ গোলাম রব্বানীঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উর্দু বিভাগের অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ গোলাম রব্বানী বলেন, ‘মাদ্রাসা কিন্তু কেবলমাত্র ইবতেদায়ি বা প্রাথমিক শিক্ষার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। মাদ্রাসায় মাস্টার্স পর্যন্ত আছে। অর্থ্যাৎ মাদ্রাসায় উচ্চতর শিক্ষার সুযোগ রয়েছে। আমি একটি ডকুমেন্টারি দেখেছিলাম, হেফজ পড়ছে কিন্তু তারা কোরআনের অর্থ জানছে না। তখন তার কাছে জানতে চাওয়া হয়, তুমি তো কোরআনের অর্থ জানছো না। তারা বলল না, বাস্তবতা হলো কুরআন হিফজ করার সময় শুধু মুখস্তই করবো। পরবর্তীতে মাদ্রাসায় কুরআনের অর্থ শেখানো হয়, ব্যাখ্যা শেখানো হয়, তার প্রয়োগ নিয়ে গবেষণা হয়। শুধু হিফজ শিক্ষা পরিপূর্ণ মাদরাসা না। মাদরাসা শিক্ষার একটি অংশ। শুধু এটি দেখেই পরিপূর্ণ মাদ্রাসা শিক্ষা ব্যবস্থার মূল্যায়ন করা যাবে না।’

সারওয়ার জাহান চৌধুরীব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্র্যাক ইনস্টিটিউট অব গভর্নেন্স অ্যান্ড ডেভলপমেন্টের হেড অব অপারেশন্স সারওয়ার জাহান চৌধুরী বলেন, ‘একটি শিশু যখন বেড়ে ওঠে তখন তাকে যে শিক্ষা দেওয়া হবে সেটাই সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ। ছোটবেলা থেকে শিশু যা শেখে তার মধ্যে সারাজীবন ওই শিক্ষার প্রভাব থাকে। তো সেই শিক্ষা যদি যথার্থ না হয় তাহলে তারা চাকরির বাজারে পিছিয়ে পড়বে, তাদের যুগোপযোগী করা কঠিন হবে। এটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ।’

বাংলা ট্রিবিউনের চিফ রিপোর্টার উদিসা ইসলামবাংলা ট্রিবিউনের চিফ রিপোর্টার উদিসা ইসলাম বলেন, ‘মাদ্রাসাগুলোর একটি সমন্বিত রূপ থাকতে হবে এমন ভাবার কোনও কারণ নেই। যেমন সাধারণ শিক্ষাতেও তো কিন্ডার গার্টেনসহ অন্যান্য অনেক ধরনের শিক্ষা প্রতিষ্ঠান রয়েছে। মূল সমস্যা হলো মাদ্রাসার কারিকুলাম সম্পর্কে না জানা। দুই ধারার শিক্ষার্থীরা এক জায়গাতে যখন এসে চাকরির জন্য আবেদন করে তখন চাকরিদাতারা জানেন না মাদ্রাসার শিক্ষার্থীরা কি পড়েন। ফলে মাদ্রাসা শিক্ষার্থীদের জন্য এটি একটি বড় সমস্যা।’

তিনি আরও বলেন, ‘মাদ্রাসাগুলোসহ সব ধরনের শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে যেসব শিক্ষার্থী বের হয় তারা কেউ কেউ ভুল শিক্ষা নিয়ে বের হয়, এটার জন্য মনিটরিং দরকার। তারা কি শিখছে কি পড়ছে, ভুল শিখছে কি না তা দেখার দায়িত্ব আমাদেরই। না হলে এর নেতিবাচক প্রভাব পড়বে।’

ঢাকা ট্রিবিউনের সাংবাদিক সোহেল মামুনঢাকা ট্রিবিউনের সাংবাদিক সোহেল মামুন বলেন, ‘মাদ্রাসা নিয়ে আমার আগে কোনও কাজের অভিজ্ঞতা ছিল না। সম্প্রতি রিপোর্টের প্রয়োজনেই সেই অভিজ্ঞতা হয়েছে। আমি দেখেছি দেশে কওমি, আলিয়াসহ বেশ কিছু ভিন্ন ভিন্ন মাদ্রাসা রয়েছে যেগুলোতে বেশ কিছু সমস্যা রয়েছে। কারিকুলামসহ অন্যান্য কিছুতে উন্নতি করতে হলে সবগুলো মাদ্রাসাকে এক বোর্ডের নিয়ন্ত্রণে আনতে হবে। তাহলেই ভবিষ্যতে মাদ্রাসা শিক্ষাকে আরও যুগোপযোগী করা সম্ভব হবে।’

ছবি: নাসিরুল ইসলাম