প্রস্তুত মেলা প্রাঙ্গণ, বইমেলার পর্দা উঠছে কাল

বইমেলার জন্য সেজে উঠছে বিভিন্ন প্রকাশনীর স্টল (ছবি- ফোকাস বাংলা)বাংলাদেশের সাহিত্য ও সংস্কৃতি অঙ্গনের প্রাণের আয়োজন ‘অমর একুশে গ্রন্থমেলা’। এই মেলা বাংলাদেশের মানুষের জাগরণের মেলা, গৌরবের মেলা। বাংলাদেশের সাহিত্য ও বুদ্ধিবৃত্তির বিকাশ ঘটাতে গত কয়েক দশক ধরে প্রতিবছর ফেব্রুয়ারি মাসের প্রথম দিনটিতে বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গণে অনুষ্ঠিত হচ্ছে এই বইমেলা। এরই ধারাবাহিকতায় এ বছরও শুরু হতে যাচ্ছে অমর ‘একুশে গ্রন্থমেলা ২০১৮’। সেই হিসাবে আগামীকাল বৃহস্পতিবার উঠতে যাচ্ছে বইমেলার পর্দা।
মেলার পরিসর বাড়ার কারণে প্রতিবছরের মতো এ বছরও মেলার মূল আয়োজন থাকবে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে, বাংলা একাডেমি চত্বরেও থাকবে বেশকিছু সংস্থা ও প্রকাশনার স্টল। মেলা শুরুর ঠিক আগের দিন বুধবার (৩১ জানুয়ারি) দুপুরে সরেজমিনে গিয়ে দেখা গেছে, মেলা প্রাঙ্গণে চলছে শেষ মুহূর্তের প্রস্তুতির কাজ। মেলার সবগুলো স্টল এখন দৃশ্যমান। চলছে রঙ-পালিশের কাজ। কোনও কোনও স্টলে বইও সাজানো হচ্ছে।
চলছে মেলার শেষ মুহূর্তের প্রস্তুতি (ছবি- ফোকাস বাংলা)জানা গেছে, গত বছরের মতো এবারও সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে থাকছে মেলার মূল আয়োজন। গত তিন বছরের ধারাবাহিকতায় এবার মেলার পরিসর আরও বেড়েছে। ২০১৫ সালে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে মেলার পরিসর ছিল দুই লাখ বর্গফুট, ২০১৬ সালে ছিল তিন লাখ বর্গফুট, ২০১৭ সালে ছিল সাড়ে ৪ লাখ বর্গফুট। এ বছর তা বেড়ে হয়েছে ৫ লাখ বর্গফুট। আগের বইমেলাগুলোতে নিয়মিত বরাদ্দ পাওয়া প্রকাশনা সংস্থা ছাড়াও এবার শতাধিক প্রকাশক স্টলের আবেদন করেছিলেন। এর মধ্যে যাচাই-বাছাই করে ১৫টি নতুন সংস্থাকে স্টল বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছে মেলা কমিটি।
মেলা কমিটির তথ্য অনুযায়ী, বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গণ ও সোহরাওয়ার্দী উদ্যোনে মোট ৪৫৫টি প্রতিষ্ঠানকে ৭১৯টি ইউনিট বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গণে ৯২টি প্রতিষ্ঠানকে ১৩৬টি ইউনিট এবং সোহরাওয়ার্দী উদ্যান অংশে ৩৬৩টি প্রতিষ্ঠানকে ৫৮৩টি ইউনিটের স্টল বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। আর বাংলা একাডেমিসহ ২৪টি প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানকে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে মোট ১৫ হাজার ৫৩৬ বর্গফুট আয়তনের ২৫টি প্যাভিলিয়ন। এর বাইরে লিটল ম্যাগাজিন কর্নারে স্টল বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে ১৩৬টি লিটল ম্যাগাজিনকে।
পাঠকদের স্বাগত জানাতে প্রায় প্রস্তুত বইমেলার স্টলগুলো (ছবি- নাসিরুল ইসলাম)‘অমর একুশে গ্রন্থমেলা’র পাশাপাশি ২২ থেকে ২৪ ফেব্রুয়ারি আয়োজন করা হয়েছে আন্তর্জাতিক সাহিত্য সম্মেলন। এতে বাংলাদেশসহ আটটি দেশের ১৫ জন কবি-লেখক-বুদ্ধিজীবী অংশ নেবেন।
মেলার সোহরাওয়ার্দী উদ্যান অংশে থাকছে প্রকাশকদের স্টল। তাই সেদিকেই বেশি নজর দিচ্ছে কর্তৃপক্ষ। সব স্টল যেন সমান গুরুত্ব পায়, সেদিকে দৃষ্টি দেওয়া হচ্ছে বিশেষভাবে। মেলা কমিটি আগেই জানিয়েছে, আগে মেলা রাত ৮টা পর্যন্ত খোলা থাকলেও এবার মেলা চলবে রাত ৯টা পর্যন্ত।
স্টলগুলোতে চলছে শেষ মুহূর্তের প্রস্তুতি (ছবি- নাসিরুল ইসলাম)সরেজমিনে দেখা গেছে, সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে গত বছরের চেয়ে আরও বেশি আকর্ষণীয় করে সাজানো হচ্ছে শিশু কর্নার। শিশুদের এ চত্বরটিতে প্রবেশের জন্য আলাদা গেটও রাখা হয়েছে। এবার শিশু কর্ণারে থাকবে শিশুদের জন্য বৈচিত্র্যময় খেলার সামগ্রী। এছাড়া, মেলার সোহরাওয়ার্দী উদ্যান অংশের পরিবেশ নান্দনিক ও মনোমুগ্ধকর করতে দু’টি ফোয়ারা, চত্বরজুড়ে বিভিন্ন স্থানে ফুলের চারা রোপণ, নির্বিঘ্নে চলাচল ও আড্ডার জন্য উন্মুক্ত স্থানও রাখা হচ্ছে বলে জানা গেছে।
ক্রেতা-পাঠক-দর্শনার্থীদের সুবিধার্থে সোহরাওয়ার্দী উদ্যোনে এবার খাবারের স্টল বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে পর্যটন মন্ত্রণালয়কে। থাকবে দর্শনার্থীদের বসার সুব্যবস্থা। এছাড়া, বরাবরের মতো এবারও মেলায় থাকছে দর্শনার্থীদের জন্য ডিজিটাল নির্দেশিকা।
কোনও কোনও স্টলে চলছে রঙের কাজ (ছবি- ফোকাস বাংলা)দোয়েল চত্বর ও টিএসসি এলাকায় মেলার দুই মূল প্রবেশপথের ফটকে থাকছে ইলেকট্রনিক বোর্ড। এতে মেলা সংক্রান্ত নির্দেশিকা উপস্থাপন করা হবে। বইমেলার সাজসজ্জাও আগের বছরগুলোর তুলনায় আকর্ষণীয় করে তোলা হয়েছে। নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তার জন্য মেলায় এলাকাজুড়ে ২৫০ ক্লোজড সার্কিট ক্যামেরার ব্যবস্থা করা হয়েছে। এবারের বইমেলা সম্পূর্ণভাবে পলিথিন ও ধুমপানমুক্ত থাকবে।
বইমেলার নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পুলিশ, র্যা ব ও গোয়েন্দা বাহিনীর সদস্যরা ছাড়াও মাঠে থাকবেন আনসার, ভিডিপি, ফায়ার সার্ভিস ও সাদা পোশাকের পুলিশ সদস্যরা। মেলায় কোনও ধরনের ব্যাগ নিয়ে প্রবেশ করতে পারবেন না দর্শনার্থীরা। এ ছাড়া এবার যেকোনও নতুন বইমেলায় এলে বাংলা একাডেমি তা যাচাই-বাছাই করে দেখবে বলেও গত মঙ্গলবার দুপুরে মেলা পরিদর্শনে এসে এসব কথা বলেন ডিএমপি কমিশনার আছাদুজ্জামান মিয়া।
মেলাপ্রাঙ্গণে এরই মধ্যে ছড়াতে শুরু করেছে নতুন বইয়ের গন্ধ (ছবি- ফোকাস বাংলা)মেলা পরিচালনা কমিটির সদস্য সচিব ও বাংলা একাডেমির পরিচালক জালাল আহমেদ মেলার নিরাপত্তা বিষয়ে বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘মেলার প্রবেশপথ বের হওয়ার পথে পর্যাপ্তসংখ্যক আর্চওয়ের ব্যবস্থা করা হয়েছে। মেলার সার্বিক নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকছেন পুলিশ, র্যা ব, আনসার, বিজিবি ও গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর নিরাপত্তাকর্মীরা। টিএসসি ও দোয়েল চত্বর দিয়ে মেলার দু’টি মূল প্রবেশপথ ছাড়াও সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে প্রবেশ ও বের হওয়ার জন্য মোট ছয়টি পথ থাকবে। আর মেলার বাংলা একাডেমি চত্বরের জন্য থাকছে তিনটি পথ।’
বইমেলার জন্য প্রস্তুত হচ্ছে বাংলা একাডেমির নজরুল মঞ্চ (ছবি- ফোকাস বাংলা)বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক শামসুজ্জামান খান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘বইমেলায় মাসব্যাপী থাকবে বিভিন্ন অনুষ্ঠানমালা। এর মধ্যে রয়েছে সেমিনার, বইয়ের মোড়ক উন্মোচন, প্রকাশনা উৎসব, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। এবারের মেলার বাংলা একাডেমি চত্বর উৎসর্গ করা হয়েছে সদ্যপ্রয়াত কথাসাহিত্যিক শওকত আলীকে। এছাড়া সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের অংশকে ভাগ করা হয়েছে ১১ জন বিশিষ্ট ব্যক্তির নামে। ফেব্রুয়ারির প্রথম দিনে বইমেলার উদ্বোধন করবেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।’