জাটকা সংরক্ষণ সপ্তাহেও নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে চলছে নিধন

জাটকা-ইলিশের উৎপাদন বাড়ানোর লক্ষ্যে ২৪ ফেব্রুয়ারি থেকে জাটকা সংরক্ষণ সপ্তাহ শুরু হয়েছে। কিন্তু এর মধ্যেই চলছে জাটকা নিধন। সরকারি নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে পদ্মা, চাঁদপুরের মেঘনা, পিরোজপুরের সন্ধ্যা, ঝালকাঠির বলেশ্বর, ভোলার তেঁতুলিয়াসহ বড় বড় নদীতে অবাধে জাটকা ধরা হচ্ছে। জাটকা সংরক্ষণ সপ্তাহে নদীতে নৌকা বা মাছ ধরার ট্রলার নামানোর ওপর নিষেধাজ্ঞা আছে। কিন্তু এ নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে প্রতিদিন শত শত নৌকা ও ট্রলার নদীতে নামছে। এর জন্য কর্তৃপক্ষের তদারকি ও পর্যাপ্ত প্রচারণার অভাবকে দায়ী করছেন মৎস্য পেশাজীবী, সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ী ও আড়তদাররা।

‘জাটকা ইলিশ ধরব না, দেশের ক্ষতি করব না’ স্লোগান সামনে রেখে গত ২৪ ফেব্রুয়ারি থেকে শুরু হয়েছে জাটকা সংরক্ষণ সপ্তাহ-২০১৮। ইলিশ রক্ষার ধারাবাহিক কার্যক্রমের অংশ হিসেবে এ কর্মসূচি গ্রহণ করেছে সরকার, যা আগামী ২ মার্চ পর্যন্ত চলবে।

মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানান, জাটকা সংরক্ষণ সপ্তাহ উপলক্ষে মুন্সীগঞ্জের লৌহজং উপজেলার মেদিনীমণ্ডল ইউনিয়নের কালিরখিল মাঠে বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করা হয়। উদ্বোধনী দিনে পদ্মা নদীতে নৌ-র‍্যালিও হয়েছে।

জাটকা-২সরেজমিনে দেখা গেছে, দেশের ইলিশ অধ্যুষিত বেশ কিছু নদীতে অবাধে জাটকা ইলিশ ধরছেন জেলেরা। জেল-জরিমানার তোয়াক্কা না করেই তারা জাটকা শিকার করছেন। আর অসাধু ব্যবসায়ীরা কৌশলে বিভিন্ন বাজারে এসব জাটকা বিক্রি করছেন।

জেলেদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, জাটকা সংরক্ষণ সপ্তাহ উপলক্ষে যেসব কর্মসূচি পালন করা হচ্ছে, তার খবরই জানেন না তারা। জেলেদের দাবি, জাটকা সংরক্ষণ সপ্তাহ উপলক্ষে তেমন একটা প্রচার-প্রচারণাও নেই। তাদের ভাষ্য, জাটকা সংরক্ষণ সপ্তাহের সময়কাল সম্পর্কেও তাদের কোনও ধারণা নেই। তাই তারা প্রতিদিনের মতো নদীতে ইলিশ ধরতে বের হয়েছেন।

গত ২৪ ফেব্রুয়ারি সকালে পিরোজপুরের সন্ধ্যা ও বলেশ্বর নদীর মোহনায় মাছ ধরছিলেন জেলে আরিফুল হক। ওই সময় তিনি বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘অন্যান্য বছর জাটকা সংরক্ষণ সপ্তাহ শুরু হলে ডিসি অফিস থেকে জানানো হয়। এ বছর আমাদের কিছুই জানানো হয়নি। তাই জাল নিয়ে নদীতে এসেছি। তবে কেউ আমাদের বাধাও দেয়নি।’

বরিশালের হিজলা উপজেলার পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া মেঘনা নদীতে মাছ ধরতে আসা জেলে সিদ্দিক হাওলাদার বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘ডিসি অফিস বা থানা থেকে কেউ এখন পর্যন্ত বাধা দেয়নি। এছাড়া আমরা জানিও না সরকারি নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছে। অন্যান্য বছর প্রচার থাকলেও এ বছর তেমন কিছু দেখিনি। সরকারি নিষেধাজ্ঞা আছে জানলে অবশ্যই নদীতে আসতাম না।’

জাটকা-১

তবে কয়েকজন জেলে জানান, মৎস্য অধিদফতর ও কোস্টগার্ড হাতেগোনা কিছু অভিযান চালিয়ে নিষিদ্ধ কারেন্ট জাল ও ইলিশসহ কিছু জেলেকে আটক করে। পরে জেল-জারিমানা দিয়ে আবার তাদের ছেড়েও দেয়।

এ প্রসঙ্গে চাঁদপুরের বিদায়ী জেলা প্রশাসক আব্দুস সবুর মণ্ডল বলেন, ‘জাটকা সংরক্ষণ সপ্তাহ পালন উপলক্ষে মেঘনা নদীতে মাইকিং করা হয়েছে। জেলার বিভিন্ন জায়গায় পোস্টারিং করাসহ নানা ধরনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সরকারি আদেশ পালন করা হচ্ছে কিনা তা তদারকিও করা হবে। মোবাইল কোর্টও পরিচালনা করা হবে। সরকারি নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে নদীতে কেউ জাটকা ইলিশ শিকার করলে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, বাংলাদেশ আজ মাছ উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণ। ২০০৮-০৯ সালে ইলিশের মোট উৎপাদন ছিল ২ লাখ ৯৮ হাজার ৯২১ মেট্রিক টন। ২০১৬-১৭ সালে ইলিশের মোট উৎপাদন বৃদ্ধি পেয়ে ৪ লাখ ৯৬ হাজার ৪১৭ মেট্রিক টনে উন্নীত হয়েছে। মাত্র আট বছরের ব্যবধানে ইলিশের উৎপাদন বেড়েছে ৬৬ শতাংশের বেশি।

জাটকা-৩সূত্র আরও জানায়, বর্তমান সরকার ইলিশের স্থায়িত্বশীল উৎপাদন নিশ্চিত করতে বিজ্ঞানসম্মত ও সমাজবান্ধব কর্মসূচি বাস্তবায়ন করছে। সুফলভোগীদের অংশগ্রহণে অভয়াশ্রম ব্যবস্থাপনা, প্রজনন মৌসুমে মা ইলিশ আহরণ নিষিদ্ধ, জাটকা সংরক্ষণ, সম্মিলিত বিশেষ অভিযান, মৎস্যজীবীদের বিকল্প কর্মসংস্থানসহ বহুমাত্রিক কার্যক্রম বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। দেশের উপকূলীয় এলাকাসহ ইলিশ-সমৃদ্ধ নদী অববাহিকার পাঁচ লাখের বেশি মৎস্যজীবীর জীবন-জীবিকা বহুলাংশে ইলিশ শিকারের ওপর নির্ভরশীল। সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির আওতায় জাটকা আহরণে নিষেধাজ্ঞা থাকাকালে দুই লাখ ৩৮ হাজার ৬৭৩টি পরিবার এবং মা ইলিশ আহরণে নিষেধাজ্ঞা থাকাকালে তিন লাখ ৫৬ হাজার ৭২৩টি পরিবারকে মাসে ৪০ কেজি খাদ্য সহায়তা দেওয়া হচ্ছে। প্রণোদনা ও সহায়তা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে ইলিশ আহরণে সম্পৃক্ত মৎস্যজীবীসহ দেশের ১৪ লাখ ২০ হাজার মৎস্যজীবীকে পরিচয়পত্র দেওয়া হয়েছে।

এ ব্যাপারে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদমন্ত্রী নারায়ণ চন্দ্র চন্দ বলেন, ‘মানুষকে সচেতন করতেই এ সপ্তাহ। এ লক্ষ্যে সপ্তাহব্যাপী বিভিন্ন কর্মসূচি পালিত হবে।’

আরও পড়ুন:
এইচএসসি’তে প্রশ্নপত্র ফাঁস ঠেকাতে আনা হচ্ছে দুই পরিবর্তন