বাংলাদেশ পাট গবেষণা ইনস্টিটিউট (বিজেআরআই) সূত্রে জানা গেছে, ২০১০ সালে সারাদেশে পাটের চাষ হয়েছিল সাড়ে ৭ লাখ হেক্টর জমিতে। ওই সময় পাটের উৎপাদন ছিল গড়ে ৭০ থেকে ৮০ লাখ বেল। এর পরের বছরগুলোর চিত্রও ছিল একই। তবে ২০১৭ সালে মোট ৮ দশমিক ১৭ লাখ হেক্টর জমিতে পাট চাষ হয়েছে। এ বছর ৯২ লাখ বেলেরও বেশি পাট উৎপাদনের সম্ভাবনা রয়েছে। লক্ষ্যমাত্রা পূরণ হলে তা হবে পাটের আবাদি জমি ও উৎপাদনের নতুন রেকর্ড।
পাট মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, দেশে পাটের সম্ভাবনা কাজে লাগাতে বহুমুখী উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। এ খাতে গবেষণা বাড়ানো, নতুন পাটনীতি প্রণয়ন, জুটমিল করপোরেশনকে সংস্কারের আওতায় আনা, পাট পণ্যের ব্যবহার উদ্বুদ্ধ করতে পলিথিনের ওপর ইকো ট্যাক্স আরোপ ইত্যাদি উদ্যোগ নিয়ে সরকার কাজ করছে। পাটজাত পণ্যের ব্যবহার দেশে বাড়ানোর পাশাপাশি এসব পণ্য বিদেশে রফতানির দিকেও মনোযোগ রয়েছে সরকারের। এর মাধ্যমে এ খাতের বিশাল বাজার তৈরি করে কর্মসংস্থান বাড়াতে চায় সরকার।
বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, এর বাইরেও বিভিন্ন আসবাব, তৈজসপত্র, পোশাক, শীতবস্ত্র, সোফা, বিভিন্ন ধরনের কাগজ, হার্ডবোর্ড তৈরিতেও পাট ব্যবহৃত হচ্ছে। পরিবেশবান্ধব বলে বিশ্বব্যাপী এগুলোর চাহিদা বাড়ছে। বিভিন্ন পণ্যের মোড়ক বা প্যাকেজিং করতে এখন পাটের ব্যবহার অনেক বেড়েছে।
জানা গেছে, দেশের বস্ত্র কারখানাগুলোয় এখন তুলার সঙ্গে পাট মিশিয়ে সুতা তৈরি করা হচ্ছে। সেগুলো দিয়ে তৈরি হচ্ছে কাপড়। এসব পোশাক বিদেশেও রফতানি হচ্ছে। রফতানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) হিসাবে, অস্ট্রেলিয়া, কানাডা, যুক্তরাষ্ট্র, বেলজিয়াম, ভারত, ইন্দোনেশিয়া, থাইল্যান্ড, চীন, পাকিস্তান ও ফিলিপাইন বাংলাদেশ থেকে পাটের বস্তা কেনার চেষ্টা চালাচ্ছে। আর কাঁচা পাট রফতানিতে প্রবৃদ্ধি এখন ৪৪ দশমিক ৩৫ শতাংশ।
গত কয়েক বছরে পাটের ব্যবহার বাড়তে থাকায় তাই আবার পাট নিয়ে ইতিবাচক দিকে হাঁটছে সরকার। এ কারণেই গত বছর থেকে সরকার পালন করতে শুরু করেছে জাতীয় পাট দিবস। এ বছর দ্বিতীয়বারের মতো দিবসটি পালিত হবে আগামী ৬ মার্চ। এ বছর দিবসটির প্রতিপাদ্য রাখা হয়েছে— ‘সোনালী আঁশের সোনার দেশ, পাট পণ্যের বাংলাদেশ’।
জানতে চাইলে বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী মির্জা আজম বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘দেশে পাটের বাজার বাড়াতে ধান, গম, চাল, ভুট্টা, চিনি, মরিচ, হলুদ, আদা, পেঁয়াজ, রসুন, ধনিয়া, আটা, ময়দা, খুদ, কুড়াসহ ১৭টি পণ্যের মোড়কে পাটজাত পণ্যের ব্যবহার বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। পাট খাতের উন্নয়নে সরকার পাট আইন- ২০১৭ প্রনয়ণ করেছে। বিশ্ববাজারে পাটকে তুলে ধরতে ২৩৫ ধরনের পাটজাত পণ্য উদ্ভাবন করেছে জুট ডাইভারসিফিকেশন প্রমোশন সেন্টার (জেডিপিসি)।
প্রতিমন্ত্রী আরও বলেন, ‘‘পণ্যে পাটজাত মোড়কের ব্যবহার বাধ্যতামূলক করায় অভ্যন্তরীণ বাজারে একশ কোটি পাটের বস্তার চাহিদা তৈরি হয়েছে। পাট চাষিদের উদ্বুদ্ধ করার পাশাপাশি ‘বাংলার পাট বিশ্বমাত’ শীর্ষক স্লোগান নিয়ে পাট শিল্পকে আন্তর্জাতিক বাজারেও পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে।’’
রফতানি উন্নয়ন ব্যুরো সূত্র জানায়, ২০১৫-১৬ অর্থবছরে ১৯ দশমিক ৬২ লাখ বেল পাট ও পাটজাত দ্রব্য রফতানি করে সাত হাজার ২৯৪ কোটি ৪০ লাখ টাকা আয় করেছে বাংলাদেশ। আগের অর্থবছরের তুলনায় এই পরিমাণ ৮৭৫ কোটি ৫০ লাখ টাকা বেশি। এ ছাড়া, বছরে ১২ লাখ বেল কাঁচা পাটও রফতানি হচ্ছে।
বস্ত্র ও পাটমন্ত্রী জানিয়েছেন, বিজেএমসি’র পাটকলগুলো ২০১৪-১৫ অর্থবছরে ৯৫ হাজার মেট্রিক টন পাটপণ্য উৎপাদন করেছে। এই অর্থবছরে বিজেএমসি’র মোট আয় একহাজার ১৫৬ কোটি ৫৩ লাখ টাকা, ব্যয় এক হাজার ৮৫০ কোটি ৯ লাখ টাকা। গত অর্থবছরেও বিজেএমসি’র পাটকলের লোকসান ছিল ৬৯৩ কোটি ৫৬ লাখ টাকা। তবে এ বছর তা অনেক কমে গেছে।
বিজেএমসি’র লোকসান প্রসঙ্গে বস্ত্র ও পাট প্রতিমন্ত্রী মির্জা আজম বলেন, ‘‘এ বছর বিজেএমসি’র লোকসান ১৮০ কোটিতে নামিয়ে আনা হয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর দৃষ্টিতে বিজেএমসি রাষ্ট্রের ‘ডিজ্যাবল’ সন্তান। রাষ্ট্র বিজেএমসির প্রতি বিশেষ নজর রাখছে।’’
জানা গেছে, পাটের হারানো দিন ফিরিয়ে আনতে পাটকল আধুনিকিকরণেও কাজ করছে সরকার। এরই মধ্যে বিজেএমসি’র অধীন মিলগুলোর মধ্যে প্রাথমিকভাবে তিনটি পাটকলের আধুনিকায়নে চীনের সরকারি একটি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সমঝোতা চুক্তি সই হয়েছে।
আরও পড়ুন-
খালেদা জিয়াকে বাইরে রেখে নির্বাচনে তৃণমূলের ‘না’
নির্ধারিত সময়ে শেষ হয়নি ফসলরক্ষা বাঁধের কাজ, শঙ্কায় কৃষকরা