‘স্কুলকে ভালোবাসি, পদকের আশা করিনি’

ইয়াসমিন আক্তারএ বছর দেশের সেরা স্কুল নির্বাচিত হয়েছে মাগুরার শালিখা উপজেলার আড়পাড়া গ্রামে অবস্থিত আড়পাড়া মডেল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। দেশের সেরা শিক্ষিকা নির্বাচিত হয়েছেন এই স্কুলের প্রধান শিক্ষক ইয়াসমিন আক্তার।  দুটি পদক একই স্কুলে, যা রীতিমত একটি রেকর্ড। সরকারের ১৫ সদস্যের কমিটি দেশের সব প্রাথমিক বিদ্যালয়ের তথ্য যাচাই-বাছাই করে এই স্বীকৃতি দিয়েছেন।

প্রাতিষ্ঠানিক ও ব্যক্তিগতভাবে  সেরা হওয়ার রহস্য সম্পর্কে জানতে চাইলে ইয়াসমিন আক্তার বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘আমি পদক পাওয়ার আশায় কখনও কিছু করিনি। আমি স্কুলকে ভালোবেসেছি, ভালোবেসেছি আমার স্কুলের কোমলমতী শিশুদের। আমি সবসময় অন্তরে লালন করি আমাদের প্রতিষ্ঠানকে। চিন্তা করি কীভাবে স্কুলটিকে  বড় করা যায়। ব্যতিক্রম আইডিয়া কাজে লাগিয়ে কীভাবে স্কুলকে সময়োপযোগী করা যায় সেটা নিয়েই রাত দিন ভেবেছি, পরিশ্রম করেছি। আর এটাই আমাকে আজকের এই অবস্থানে এনেছে।’

এই শিক্ষিকা জানান, স্কুলের শিক্ষার্থীদের আদব-কায়দাসহ বিভিন্ন মূল্যবোধ শেখানোর চেষ্টা করছেন তারা। তিনি বলেন, “২০১৫ সালে আমিই দেশের মধ্যে প্রথম ‘সততা স্টোর’ নামে একটি দোকান খুলি স্কুলে। আমরা  শিশুদের সৎ থাকতে উদ্বুদ্ধ করি। বর্তমানে সরকার সারাদেশের সব স্কুলে একটি করে ‘সততা স্টোর’ করার নির্দেশনা দিয়েছে বলে জেনেছি। এছাড়া আমার আরও একটি কার্যক্রম রয়েছে। সেটার নাম ‘মহানুভবতার দেয়াল’। এই দেয়ালে শিক্ষার্থীরা তার কাজে লাগে না এমন অতিরিক্ত যে কোনও জিনিস রেখে যায়। সেটা স্কুল ড্রেস, জুতা, ব্যাগসহ যে কোনও কিছু হতে পারে। পরে যাদের ওই জিনিসপত্রের মধ্যে যার যেটা লাগে, সে কাউকে না বলেই নিয়ে যেতে পারে। এতে করে যে শিশু একটু অভাবি সে উপকৃত হলো এবং যারা সেখানে জিনিসটি রাখলো সেও মনে করে, তার জন্য অন্যরা উপকৃত হলো। এছাড়া আমার স্কুলটি সম্পূর্ণরূপে ডিজিটালাইজড করার চেষ্টা করেছি।’

আড়পাড়া মডেল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়স্কুল ডিজিটালাইজ করার ক্ষেত্রেও অনুসরণীয় ভূমিকা পালন করেছে আড়পাড়া মডেল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। স্কুলের প্রধান শিক্ষক জানান, শিক্ষার্থীরা ফিঙ্গার প্রিন্ট দিয়ে ক্লাসে প্রবেশ করে। এতে তার উপস্থিতি নিশ্চিত হয়। এছাড়া শিশু যে স্কুলে এসেছে তার একটি মেসেজ ওই শিশুর অভিভাবকের মোবাইলে চলে যায়। আবার শিশুটি স্কুলে উপস্থিত না হলেও অনুপস্থিতির মেসেজ চলে যায় অভিভাবকের মোবাইলে। স্কুলের প্রতিটি শ্রেণিকক্ষে সিসি ক্যামেরা রয়েছে। যা দিয়ে লাইব্রেরিতে বসে সবগুলো কক্ষ পর্যবেক্ষণ করা যায়। এছাড়া একটি অ্যাপস আছে যে অ্যাপসের মাধ্যমে অভিভাবকরাও মোবাইল ব্যবহার করে তাদের সন্তানরা স্কুলে কী করছে, পাঠদান ঠিকমত হচ্ছে কিনা তাও তারা দেখতে পান। স্কুলে ডিজিটাল সার্ভিস পয়েন্ট নামে একটি জায়গা আছে। যেখানে শিশুরা নিজেরাই কম্পিউটার ব্যবহার করে, ওয়েবসাইট ব্যবহার করে। এছাড়া স্কুলের সব ভর্তি কার্যক্রম অনলাইনেই হয়। আর এই ভর্তি কার্যক্রমের প্রাথমিক আবেদন শিশুরাই করে। দরিদ্র অভিভাবকরা ফ্রিতে এই সুবিধা পান। এছাড়াও আচরণ ও নৈতিকতার ওপর শিশুদের পুরস্কৃত করা হয়।

আচরণের ওপর পুরস্কৃত করার পদ্ধতি সম্পর্কে ইয়াসমিন আক্তার বলেন, “আলোকিত আচরণ সংগ্রহশালা’ নামে একটি কর্মসূচি রয়েছে। এটির কাজ হলো-যেসব শিশু ভালো ও দৃষ্টান্তমূলক কাজ করে তাদের সেই ভালো আচরণের স্বীকৃতিস্বরূপ ওই শিশুর ছবি ও ভালো কাজের বর্ণনা লিখে আমরা একটি দেয়ালে টাঙিয়ে দেই। যাতে অন্যরাও সেই ভালোকাজে উদ্বুদ্ধ হয়। অন্য যারা একই কাজ করে তার ছবিও আগের জনের পাশে লাগিয়ে দেই। এতে সবাই অনুপ্রাণিত হয়। এছাড়া প্রায় প্রতিদিনই সকালে অ্যাসেম্বলিতে শিশুদের নীতিবাক্য শেখানো হয়। এছাড়া ‘এই দিনে’ নামে একটি কর্মসূচি আছে। এটি হলো, ওই দিন বিখ্যাত কেউ জন্মগ্রহণ করেছিল কিনা, অথবা ওই দিন বিশ্বে অথবা দেশে কিছু ঘটেছিল কিনা, তা একটি বোর্ডে লাগিয়ে দেওয়া হয়। বিশেষ করে শিশুদের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ টপিককেই গুরুত্ব দেওয়া হয়। ওই তথ্যটা শিশুরা পড়ে এবং পরের দিন অ্যাসেম্বলিতে শিক্ষার্থীদের মধ্যে জানতে চাওয়া হয়, কে সবচেয়ে ভালো করে সেটা বলতে পারবে। যে বলতে পারে তাকে আমরা ওইদিনের জন্য  ‘শ্রেষ্ঠ শিশু’ ঘোষণা করি এবং একটি মেডেল পরিয়ে দেই। দেশ প্রেমে উদ্বুদ্ধ করার জন্য একটি কর্মসূচি রয়েছে ‘দেশ প্রেমের আয়না’। স্কুলে একটি বক্স রাখা আছে সেখানে- দেশ প্রেম কী, দেশ তাকে কী দিয়েছে, দেশকে কীভাবে ভালোবাসতে হয়, এসব বিষয়ে একটি চিরকুট লিখে শিশুরা ওই বক্সে রাখে। তিন মাস পর আমরা ওই চিরকুট দেখে যাচাই-বাছাই করি যেটা সবচেয়ে সুন্দর বলে মনে করি, তখন তার নাম ঘোষণা করে ওই শিশুকে তিন মাসের জন্য সেরা শিশু ঘোষণা করি।’

শিক্ষার্থীদের অভিভাবকদের জন্য আনন্দ পাঠাগার নামেও একটি কর্মসূচি চালু আছে এই স্কুলে। স্কুলে একটি কক্ষ আছে যেখানে অভিভাবকরা অপেক্ষা করেন। সেখানে ওই অভিববাকদের কিছু শিশুতোষ গল্পের বই পড়তে দেওয়া হয়। সেই গল্পগুলো মায়েরা বাড়িতে গিয়ে তার সন্তানকে শোনান। একইসঙ্গে মায়েদের একটি কমিটি আছে। যারা শিক্ষিত তাদের মধ্যে থেকে বিভিন্ন জনকে স্কুলে শিক্ষক স্বল্পতা থাকলে ক্লাস নিতে বলা হয়। এতে ওই অভিভাবক মায়েরা নিজেরাই তাদের সন্তানের ক্লাসের পারফরমেন্স ও প্রতিক্রিয়া দেখতে পারেন।

স্কুল নিয়ে ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা সম্পর্কে ইয়াসমিন আক্তার বলেন, ‘আমি আমার স্কুলকে এগিয়ে নিতে চাই। আরও  একটি স্বপ্ন আমার আছে। সেটি হলো- যারা অসুস্থ শিশু, যারা স্কুলে আসতে পারে না, তারা যেন বাড়িতে বসেই  ক্লাস করতে পারে সেই সুযোগ সৃষ্টি করা। এটা করতে হলে আমাদের স্কুলের প্রতিটি ক্লাস রুমে প্রোজেক্টর লাগাতে হবে। ওই প্রোজেক্টরে ভিডিও ধারণ করা হবে এবং একই সঙ্গে মোবাইল অ্যাপের মাধ্যমে বাড়িতে বসেই ওই শিশুরা ক্লাসের আবহ পাবে, ক্লাস করবে।’

উল্লেখ্য, সারাদেশের প্রাথমিক স্তরের পড়াশোনার মান বাড়ানোসহ অন্যান্য ইতিবাচক বিষয়গুলোতে নজর দিতে প্রতিবছর স্কুল, শিক্ষক, শিক্ষার্থী, শিক্ষা অফিসারসহ ১৯টি ক্যাটাগরিতে শ্রেষ্ঠত্ব নির্বাচন করা হয়। প্রতিবছর জাতীয় শিক্ষা সপ্তাহ উপলক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠানের মাধ্যমে এসব ক্যাটাগরির শিক্ষকসহ সবাইকে পুরস্কৃত করা হয়। এ বছরও আগামী  ৬ মার্চ জাতীয় শিক্ষা সপ্তাহ-২০১৮ এর আয়োজন করা হয়েছে রাজধানীর ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তনে। এই মিলনায়তনে রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদের কাছ থেকে এই ১৯টি ক্যাটাগরিতে শ্রেষ্ঠত্ব অর্জনকারীরা পদক গ্রহণ করবেন।