‘বিরোধ হলে শুধু মামলা নয়, লিগ্যাল এইড অফিসে আপসও হয়’- এমন প্রতিপাদ্য নিয়ে ২০১৭ সালের এপ্রিলে ‘জাতীয় আইনগত সহায়তা দিবস’ পালন করে সরকার। আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের আইন ও বিচার বিভাগের অধীন ‘জাতীয় আইনগত সহায়তা প্রদান সংস্থা’র সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, যদি কোনও ব্যক্তি তার মামলাগুলো আপস মীমাংসার মাধ্যমে নিষ্পত্তি করতে চান, তাহলে তিনি জেলা লিগ্যাল এইড অফিসে শরণাপন্ন হতে পারেন। সেখানে দ্রুত সময়ের মধ্যে তার বিরোধ বা মামলা নিষ্পত্তির জন্য পদক্ষেপ গ্রহণ করবেন দায়িত্বে থাকা বিচারক।
সংশ্লিষ্টরা জানান, সরকার লিগ্যাল এইড অফিসারকে মামলা নিষ্পত্তির আইনি ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে। ২০১৫ সালের ৯ ফেব্রুয়ারি আইনি পরামর্শ ও বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তি বিধান প্রজ্ঞাপন আকারে জারি করা হয়। এরপর লিগ্যাল এইড অফিসাররা ২০১৫ সালের জুলাই মাস থেকে জেলা পর্যায়ে বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তি পদ্ধতির প্রয়োগ শুরু করেন।
সিনিয়র সহকারী জজ পদ মর্যাদার কর্মকর্তা জেলা লিগ্যাল এইড অফিসার হিসেবে মামলা পূর্ব বিরোধ (প্রি-কেস) এবং চলমান মামলা মধ্যস্থতার মাধ্যমে নিষ্পত্তির উদ্যোগ গ্রহণ করে থাকেন। ২০১৭ সালের ২১ সেপ্টেম্বর দেওয়ানি কার্যবিধি ১৯০৮ এর ৮৯-এ ধারা সংশোধন করে মধ্যস্থতার মাধ্যমে মামলার নিষ্পত্তির জন্য আদালত থেকে লিগ্যাল এইড অফিসারের কাছে মামলা পাঠানোর ক্ষমতা প্রদান করা হয়। জেলা লিগ্যাল এইড অফিসার আপসযোগ্য বিরোধ (প্রি-কেস) ও রেফার করা মামলা (পোস্ট কেস) মধ্যস্থতার মাধ্যমে নিষ্পত্তি করে আসছেন।
২০১৫ সালের জুলাই থেকে ২০১৭ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত জাতীয় আইন সহায়তা প্রদান সংস্থায় মোট ৬৫৭১টি বিরোধের অভিযোগ আসে। এরমধ্যে ৫৭৪০টি বিরোধ নিষ্পত্তি করা হয়। এছাড়া সংস্থাটির কাছে দায়ের করা মামলা (পোস্ট কেইস) পাঠানো হয় ৯০৫টি। এরমধ্যে মীমাংসা করা হয়েছে ৭৫২টি। বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তির মাধ্যমে (প্রি কেইস ও পোস্ট কেইস) ৪৭৮২ জন উপকারভোগীকে সহায়তা দেওয়া হয়েছে। মধ্যস্থতার মাধ্যমে ক্ষতিগ্রস্ত পক্ষকে ৬ কোটি ৬৮ লাখ ৫৯ হাজার ৯৪৯ টাকা আদায় করে দিতে সক্ষম হয়েছে এই সংস্থা।
বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তি ব্যবস্থার বিরোধিতা করে সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী শামীম সরদার বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, এই ব্যবস্থায় মামলার দীর্ঘসূত্রতা বাড়বে। আমাদের দেশে যদি বিরোধ নিষ্পত্তি করতে হয়,তাহলে সমাজে সালিশ মীমাংসার ব্যবস্থা আছে। দেওয়ানি কার্যবিধিতে অর্ডার-২৩ আছে। নতুন করে এডিআর এর জন্য ৩০, ৬০ ও ৯০ দিনের যে সময়টা নির্ধারণ করা হয়েছে, তাতে সময় নষ্ট হবে। মীমাংসা কিংবা বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তি হবে না বলেই তো তারা কোর্টে আসে। কোর্টে আসলে এ বিষয়ে আর বিকল্প বিরোধে না যাওয়াই ভালো। বরং দ্রুত বিচারটা কীভাবে নিষ্পত্তি করা যায়, সেটা নিয়ে চিন্তা করা উচিত। এছাড়া কোর্টের বাইরে মীমাংসা হলে, সেটা দু’পক্ষ এসে কোর্টকে জানালেই হয়। তখন কোর্ট মামলা নিষ্পত্তি করে দেবেন। আলাদা করে সময় ক্ষেপণের প্রয়োজন নাই। এটা বিচার ব্যবস্থায় আরেকটা দীর্ঘসূত্রতা সৃষ্টি করবে।’
এ বিষয়ে জানতে চাইলে জাতীয় আইন সহায়তা প্রদান সংস্থার উপপরিচালক (যুগ্ম জেলা জজ) আবেদা সুলতানা বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘একটি মামলা হলে সেটা নিষ্পত্তি হতে কম করে পাঁচ বছর সময় লাগে। সেটা আবার আপিল হয় জজ কোর্টে। আপিল নিষ্পত্তি হতে আরও দু-তিন বছর লেগে যায়। এরপর যায় হাইকোর্টে। সেখানে আরও তিন-চার বছর লাগে। সব মিলিয়ে একটি মামলা নিষ্পত্তি হতে ২০ বছরের মতো সময় লেগে যায়। আর এ মামলা যদি নিম্ন আদালতে থাকা অবস্থায় দু’পক্ষের মধ্যে নিষ্পত্তি করে দেওয়া যায়,তাহলে সময়টা বেঁচে যায়। তাহলে কীভাবে দীর্ঘসূত্রতা বাড়াবে।’
আবেদা সুলতানা আরও বলেন, ‘দেওয়ানি আইনে বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তির বিষয়টি উল্লেখ আছে। এজন্য তারিখও রাখতে হবে। কিন্তু নানা কারণে সেটা বিভিন্ন সময় বাধাগ্রস্ত হয়। জেলা লিগ্যাল এইড সেলে একজন বিচারককে নিয়ে এসব বিরোধ নিষ্পত্তি করা হচ্ছে। দীর্ঘ সময় মামলা চললে আর্থিক ক্ষতিসহ মামলার ভবিষ্যৎ কী হতে পারে— সেটা দু’পক্ষকেই জানিয়ে দেওয়া হয়। আপস হলে দু’পক্ষই মামলায় জিতে যায়। কেউ হেরে যায় না। দু’পক্ষই হাসি-খুশি থেকে যায়। দীর্ঘ বিরোধ কিংবা শত্রুতা আর থাকে না। এটা না হলে বংশপরম্পরায় শত্রুতা থেকে যায়। এসব কারণে উভয়পক্ষই বিরোধ নিষ্পত্তিতে আগ্রহী হয়।’