সাংবাদিকতায় নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে নারীর অবস্থান এখনও সীমিত

মাঠপর্যায়ে নারী সংবাদকর্মী বেড়েছে (ছবি: সাজ্জাদ হোসেন)

গণমাধ্যমভিত্তিক আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান আর্টিকেল নাইনটিনের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে সাংবাদিকতা পেশায় নারীর অংশগ্রহণ বৃদ্ধির হার ৭ শতাংশের নিচে। কিছু ইতিবাচক উদাহরণ থাকলেও কর্মস্থলে সিদ্ধান্ত গ্রহণে নারীর অংশগ্রহণের হার খুবই সীমিত। সাংবাদিকতা পেশার ক্ষেত্রে সম্পাদনা ও ব্যবস্থাপনায় তা মাত্র শূন্য দশমিক ৬ শতাংশ। বিশ্বের অন্যান্য দেশে এই হার ৩৮ শতাংশ।

দেশে পুরুষতান্ত্রিক মানসিকতা ও গণমাধ্যমগুলোর কর্তৃপক্ষের জেন্ডার সেন্সিটিভিটি না থাকাই নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে নারীদের না থাকার প্রধান কারণ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। একইসঙ্গে নারীর পারিবারিক আর সামাজিক চাপও তাকে পিছিয়ে রাখছে বলে মন্তব্য তাদের। তবে নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে ধীরে ধীরে দেশের গণমাধ্যমে নারীর সংখ্যা আরও বাড়বে বলে আশাবাদী তারা।

জাতীয় প্রেসক্লাবের সাধারণ সম্পাদক ফরিদা ইয়াসমিন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘পুরুষতান্ত্রিক সমাজ নারীকে এখনও সেভাবে মেনে নিতে পারে না। যেমন নারীকে তারা নিজেদের অধীন মনে করে থাকে। তারা ধরেই নেয়, নারী উল্লেখযোগ্য কিছু বা ভালো কিছু করতে পারবে না। এটা মনস্তাত্ত্বিক বাধা বলতে পারি। নারীর প্রতি পুরুষদের দৃষ্টিভঙ্গি ইতিবাচক নয়। এসব কারণে নারী উচ্চপদে আসতে চাইলে বিভিন্ন প্রতিকূলতা সৃষ্টি হয়।’

সংসার-অফিস শেষ করে নেতৃত্বে আসা নারীর জন্য বেশ কঠিন বলেও মনে করেন জাতীয় প্রেসক্লাবের সাধারণ সম্পাদক। তার কথায়, ‘নারীদের নিজের ঘরে অনেক সময় দিতে হয়। কারণ, সংসারের বেশিরভাগ দায়িত্বই থাকে তার ওপরে। এ কারণে নেতৃত্বে আসতে নারী নিজেও অনেকটা অনিচ্ছুক। এরপরও নেতৃত্বে আসতে হলে দৃঢ় মনোভাব প্রয়োজন হয়। কারণ, তাকে কেউ জায়গা ছাড়তে চায় না। তাকে জায়গা করে নিতে হয়। সবচেয়ে বেশি দরকার হয় নারীর আত্মবিশ্বাস। বিভিন্নভাবে কাজ দিয়ে তাকে বাধা ডিঙাতে হয়।’

নিউজ টোয়েন্টিফোরের প্রধান বার্তা সম্পাদক শাহনাজ মুন্নী বলেন, ‘পুরুষের চেয়ে নারীরা কর্মক্ষেত্রে এসেছেন দেরিতে। গণমাধ্যমেও পুরুষদের অনেক পরে নারী দৃশ্যমান হয়েছেন। স্বাভাবিকভাবেই ওপরের পদগুলোতে আছেন পুরুষরা। এটাই বাস্তবতা। এরপরও যেসব নারী সামনের দিকে এগিয়ে গেছেন, তাদের পাড়ি দিতে হয়েছে অনেক প্রতিকূলতা। কারণ, কর্মক্ষেত্রে এখনও ওই অর্থে সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে নারীদের দেখতে অভ্যস্ত নয় কেউ। এই অনভ্যস্ততার কারণে বড় পদে যেতে নারীকে অনেক প্রতিযোগিতা করতে হয়। সেই প্রতিযোগিতা কখনও কখনও পক্ষপাতদুষ্টও হয়। তবে মাঝে মধ্যে তা নিরপেক্ষও হয়। কিন্তু আমার মনে হয়, কিছু প্রতিবন্ধকতা থাকে যা পেরোনো যায় না। আমি নিজেকে দিয়ে বলতে পারি, ১৮-১৯ বছর পেরিয়ে একটা জায়গায় এসেছি। এটা একটা দীর্ঘপথের যাত্রা। এই পথে গন্তব্যে পৌঁছাতে মনোবল ধরে রাখতে হয়।’

সাংবাদিক শাহনাজ মুন্নী মনে করিয়ে দিলেন একটি প্রচলিত কথা—পুরুষ সাংবাদিকদের বয়স হলে বলা হয় তারা অভিজ্ঞ হয়েছেন। আর নারী সাংবাদিকদের বয়স বাড়লে বলা হয় তাদের অবসরে যাওয়ার সময় হয়েছে। নারীকে প্রতি পদে যোগ্যতার ডাবল প্রমাণ দিতে হয়।’

নিজের অভিজ্ঞতা থেকে এই নারী সংবাদকর্মী বললেন, “একই বয়সের একজন নারীর বেলায় পুরুষ সাংবাদিকটি বলছেন, ‘ওই আপার এখন আর ফিল্ডে যাওয়ার দরকার কী?’ কিন্তু তিনি নিজে আরও উচ্চপদে যাওয়ার জন্য তদবির করছেন বা উচ্চপদে চলে গেছেন। এই মানসিকতাও কিন্তু আছে।” তবে আশাও দেখছেন শাহনাজ মুন্নী। তিনি বলেছেন, ‘নারীরা সিনিয়র হচ্ছেন ধীরে ধীরে।’

মাঠপর্যায়ে নারী সংবাদকর্মী বেড়েছে (ছবি: সাজ্জাদ হোসেন)

মাঠপর্যায়ে নারী সংবাদকর্মী বেড়েছে (ছবি: সাজ্জাদ হোসেন)কোনও কোনও গণমাধ্যম নারী দিবসে বিশেষভাবে নারীদের গুরুত্বপূর্ণ পদের দায়িত্ব দিয়ে সেদিন কাজ করায় বলে উল্লেখ করলেন এই সাংবাদিক। তার কথায়, ‘এটাকে আমার কাছে খুব বেশি কার্যকর মনে হয় না। এটা শুধুই প্রতীকী বা আনুষ্ঠানিকতা। একদিনের বাদশাহীতে সত্যি বলতে কিছু হয় না, কোনও পরিবর্তন আনা যায় না। এই একদিনেও নারীরা রুটিন কাজটাই করে যায়। আর সেটা থাকে ছকে বাঁধা। এক্ষেত্রে খুব বড় বেশি প্রভাব পড়ে বলে আমার মনে হয় না।’

বাংলাদেশ নারী সাংবাদিক কেন্দ্রের সাধারণ সম্পাদক পারভীন সুলতানা ঝুমা বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘মাসুমা আপা, মিনু আপা, আম্মা (সেতারা মুসা), নিনি আপা, জলি আপা আমার সিনিয়র। তারা খুবই দক্ষ ছিলেন। কিন্তু প্রতিষ্ঠান বন্ধের সঙ্গে পেশাও কিন্তু চলে যায়। ছেলেরা অন্যখানে খোঁজ নিয়ে বা লবিং করে যেতে পারে। কিন্তু বেশিরভাগ ক্ষেত্রে মেয়েরা হতাশ হয়ে যায় বা আগ্রহ হারিয়ে ফেলে। তারা আর কোনও প্রতিষ্ঠানে যায় না। হয়তো তারা ওইরকম লবিং করতে পারে না। সিনিয়র হওয়ার পর কোনও কারণে চাকরি চলে গেলে বা কোনও কারণে চাকরিচ্যুত হলে কিংবা প্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে গেলে তারা আর এগোয় না।’

এরপর একটি ঘটনা তুলে ধরলেন বাংলাদেশ নারী সাংবাদিক কেন্দ্রের সাধারণ সম্পাদক। শুনুন তার মুখে— ‘মেয়েটি সিনিয়র সাব-এডিটর। তাকে শিফট ইনচার্জ হতে বলা হয়েছিল। কিন্তু সে রাজি হয়নি। কারণ, বেশি রাত পর্যন্ত অফিসে থাকতে হবে। পরিবারের অসুবিধা হবে ভেবে সে রাজি হয়নি। এই একটি কারণে অনেক সময় নারীরা বড় পদে যেতে চায় না।’

নারী সাংবাদিক কেন্দ্রের সাধারণ সম্পাদকের অভিযোগ, ‘একজন নারীকে বার্তা সম্পাদক বা নির্বাহী সম্পাদক পদে দেখতে চায় না বেশিরভাগ মিডিয়া। পাকিস্তান আমলে হাসিনা আশরাফ দৈনিক বাংলার খুবই ভালো রিপোর্টার ছিলেন। আব্বা (এবিএম মুসা) একবার বলেছিলেন, সে যদি নারী না হতো তাহলে দৈনিক বাংলার চিফ রিপোর্টার বা নিউজ এডিটর হতে পারতো।’

মাঠপর্যায়ে নারী সংবাদকর্মী বেড়েছে (ছবি: সাজ্জাদ হোসেন)মাঠপর্যায়ে নারী সংবাদকর্মী বেড়েছে (ছবি: সাজ্জাদ হোসেন)গণমাধ্যমে ম্যানেজমেন্ট থেকে নবীন বা শিক্ষানবিস অনেক মেয়ে নেওয়া হয় বলে অভিজ্ঞতা থেকে জানালেন পারভীন সুলতানা ঝুমা। তার ভাষ্য, আমাকে অনেক অফিস থেকে বলা হয়, ‘আমরা অনেক মেয়ে নিয়েছি।’ তখন আমি বলি, নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে মেয়ে কই? তখন তারা বলেন, ‘আমরা ফ্রেশার অনেক মেয়ে নিচ্ছি।’ তারা নবীন বা শিক্ষানবিস অনেক মেয়ে নিয়েই ভাবে নারীর ক্ষমতায়ন হয়ে যাচ্ছে! নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে মেয়ে নেবে, এমন মানসিকতা তাদের নেই।

পারভীন সুলতানা ঝুমা বললেন, ‘মেয়েরা নিজেদের ঘাটতির জন্য কর্মস্থলে যেতে পারছে না, এটা একটা দিক। ঘাটতি কিন্তু সক্ষমতা বা যোগ্যতার ঘাটতি নয়, সমাজ ও সংসার তাকে টেনে ধরে। পেশার জন্য যতটা সময় দেওয়া প্রয়োজন তা সে দিতে পারে না। অন্য সমস্যা হলো— মেয়েদের উল্লেখযোগ্যভাবে এগিয়ে যাওয়া দেখতে চায় না বেশিরভাগ প্রতিষ্ঠান। তবে এখন কিছু কিছু প্রতিষ্ঠান ওই ট্যাবু থেকে বেরিয়ে আসছে। যদিও যতটা হলে মেয়েরা নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে যেতে পরে তেমন অবস্থা গড়ে ওঠেনি। তবে আমি আশাবাদী, ভবিষ্যতে পরিবর্তন আসবে।’