যুক্তরাষ্ট্রের প্রখ্যাত সংবাদ সাময়িকী ‘নিউজউইকে’র টনি ক্লিফটন যুদ্ধকালীন ভারতের শরণার্থী শিবির পরিদর্শন করে বর্ণনা করেন, ‘যে কেউ বা যারা ভারত সীমান্তে শরণার্থী শিবিরে গিয়েছেন, তারা বিশ্বাস করতে বাধ্য— পাঞ্জাবি সেনাবাহিনী যেকোনও জঘন্য কাজ করতে পারে। আমি গুলিবিদ্ধ শিশু এবং অনেক লোকের পিঠে চাবুক মারার ক্ষত চিহ্ন দেখেছি। আমি অনেককে বাকরুদ্ধ অবস্থায় দেখেছি।’ এই পত্রিকাটি ১৯৭১-এর ২৮ জুন প্রকাশিত একটি নিবন্ধে লিখেছে— ‘পাকিস্তানি সৈন্যদের বর্বরতার ছবি স্পষ্ট। ঢাকায় বারবার পাকিস্তানি সামরিক এবং বেসামরিক কর্তৃপক্ষ বলেছে, তাদের অভিপ্রায় হচ্ছে ব্যাপক হত্যাযজ্ঞ চালিয়ে পূর্ব পাকিস্তানে বিচ্ছিন্নতাবাদীদের নির্মূল করা। এতে ২০ লাখ মানুষ নিহত হতে পারে। এটা ছিল এক ভয়ঙ্কর ঘটনা।’
২৫শে মার্চ। গণহত্যা চালায় পাকিস্তানি সেনাবাহিনী। এই খবর যাতে বাইরে না যায়, সেজন্য বন্দুকের মুখে সব বিদেশি সাংবাদিককে ঢাকার ইন্টারকন্টিনেন্টাল হোটেলে আটকে রাখা হয়। পরের দিনই তাদের ধরে ধরে করাচি পাঠিয়ে দেওয়া হয়।
ব্রিটেনের ডেইলি টেলিগ্রাফ পত্রিকার ২৬ বছর বয়সী সাংবাদিক সাইমন ড্রিং পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর চোখ এড়িয়ে ঢাকায় থেকে যান। এরপর পূর্ব পাকিস্তান থেকে ব্যাংককে গিয়ে তিনি তার পত্রিকায় যে প্রতিবেদন পাঠান, সেটি ১৯৭১ সালের ৩০ মার্চ ডেইলি টেলিগ্রাফ পত্রিকায় ছাপা হলে বিশ্ববাসী জানতে পারে— কী নৃশংসতার শিকার হয়েছে বাংলাদেশ। সাইমন ড্রিং লিখছেন, ‘ঢাকা এখন ধ্বংস এবং ভীতির নগরী। পাকিস্তান সেনাবাহিনীর ঠাণ্ডা মাথায় ২৪ ঘণ্টাব্যাপী অবিরাম গুলি বর্ষণে সেখানে সাত হাজারেরও বেশি লোক নিহত হয়েছেন। ছাত্রাবাসে নিজেদের বিছানাতেই ছাত্রদের হত্যা করা হয়েছে। বাজারগুলোতে নিজেদের দোকানের পেছনে কসাইদের হত্যা করা হয়েছে।’
তিনি লিখেছেন, ‘(সেনাবাহিনীকে ফাঁকি দিয়ে) একদিন পর সকাল সাতটার ৫-৬ মিনিট পর মিশেলকে নিয়ে অত্যন্ত সাধারণ কাপড়ে বের হলাম। আমরা প্রথমেই গেলাম ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইকবাল হলে (বর্তমান সার্জেন্ট জহুরুল হক হল)। আশপাশের মানুষের সঙ্গে কথা বলি। জানলাম ব্রিটিশ কাউন্সিল থেকে কিভাবে কামান চালানো হয়েছে। আমরা দেখলাম—দুই দিন পরও পুড়িয়ে দেওয়া কক্ষগুলোতে ছাত্রদের মৃতদেহ একটু-একটু করে পুড়ছিল। অনেক মৃতদেহ বাইরে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে ছিল। অবশ্য হলের পার্শ্ববর্তী পুকুরেই বেশিরভাগ মৃতদেহ ভেসে ছিল। চারুকলার একজন ছাত্রের মৃতদেহ পড়ে ছিল তার ইজেলের পাশেই হাত-পা ছড়িয়ে। সাত জন শিক্ষক নিহত হন। বাইরের ঘরে লুকিয়ে থাকা ১২ সদস্যের এক পরিবারের সবাইকেই হত্যা করা হয়েছে।’
একাত্তরে বাংলাদেশের অনেক সাংবাদিক অস্ত্র হাতে সরাসরি যুদ্ধে অংশ নিয়েছিলেন। পাশাপাশি যুদ্ধের খবর দেশি-বিদেশি পত্রিকায় প্রকাশও করতেন তারা। তাদের মধ্যে অন্যতম হারুন হাবীব বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘বিদেশি সংবাদপত্রগুলো যাতে খবর প্রকাশ করতে না পারে, সেকারণে অনেক বিদেশি সাংবাদিককে দেশ থেকে বের করে দেওয়া হয়েছিল। এর মধ্যেই অনেকে ছদ্মবেশ নিয়ে আসতেন এবং যেতেন।’
আর দেশি সাংবাদিকরা হাতে লিখে পত্রিকা বিলি করতো জানিয়ে তিনি বলেন, ‘যুদ্ধের সময় দেশের সীমান্তবর্তী অঞ্চল থেকে অসংখ্য পত্রপত্রিকা বেরিয়েছিল, যেগুলো বেশিরভাগই হাতে লেখা এক, দুই বা তিন পৃষ্ঠার। সেগুলোকে আমি রণাঙ্গনের সংবাদপত্র বলি।’
স্বাধীনতার পরে প্রকাশিত বইতেও একাধিকবার উঠে এসেছে সেসময়ের নৃশংসতা। ১৯৭২ সালে প্রকাশিত সাংবাদিক রবার্ট পেইনের ‘ম্যাসাকার’ বইতে লেখা হয়— ‘‘১৯৭১ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি পশ্চিম পাকিস্তানে অনুষ্ঠিত এক সামরিক বৈঠকে প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান বাঙালিদের খতম করার সিদ্ধান্ত নেন। ওই সেনা বৈঠকে ইয়াহিয়া খান বলেছিলেন, ‘কিল থ্রি মিলিয়ন অব দেম, অ্যান্ড দ্য রেস্ট উইল ইট আউট অব আওয়ার হ্যান্ডস।’ এই পরিকল্পনার পথ ধরে ২৫ মার্চ রাতে ঢাকা পরিণত হয় লাশের শহরে। রাজারবাগ পুলিশ লাইন, পিলখানা ইপিআর সদর দফতর, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল, বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়, নীলক্ষেতসহ বিভিন্ন স্থানে তারা নির্বিচারে বাঙালিদের নিধন করে।’’