সামারি ট্রাইব্যুনাল করে নদী দখল রোধে ব্যবস্থা: মুজিবুর রহমান

 

‘বিপন্ন নদ-নদী, হাওর-জলাশয় সুরক্ষা এবং জনমানুষের জীবিকা: আমাদের করণীয়’ শীর্ষক সেমিনারে আলোচকরাসংশ্লিষ্ট সরকারি এজেন্সিগুলোর সঙ্গে সমন্বয় করে কাজ করা হচ্ছে বলে জানিয়েছেন ‘জাতীয় নদী রক্ষা কমিশন’-এর চেয়ারম্যান ড. মুজিবুর রহমান হাওলাদার। তিনি বলেন, ‘সামারি (সংক্ষিপ্ত) ট্রাইব্যুনাল গঠন করে নদী দখল রোধের ব্যবস্থা করা হবে।’ শনিবার (৩১ মার্চ) সকালে ঢাকা রিপোর্টারস ইউনিটি (ডিআরইউ) মিলনায়তনে ‘বিশ্ব পানি দিবস ২০১৮’ উপলক্ষে ‘বিপন্ন নদ-নদী, হাওর-জলাশয় সুরক্ষা এবং জনমানুষের জীবিকা: আমাদের করণীয়’ শীর্ষক এক সেমিনারে তিনি এসব কথা বলেন।

মুজিবুর রহমান বলেন, ‘নদীরক্ষা আইন সংশোধনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। জেলা-উপজেলা পর্যায়ে থেকে তথ্য সংগ্রহের মাধ্যমে ডাটাবেজ তৈরি কাজ চলছে। কাজে বাধা আসতেই পারে কিন্তু আমরা পিছিয়ে যাবো না। এজন্য সামারি ট্রাইব্যুনাল গঠন করে নদী দখল রোধের ব্যবস্থা করবো।’

প্যানেল আলোচনায় লেখক ও কলামিস্ট সৈয়দ আবুল মকসুদ বলেন, ‘আমাদের আর্থ-সামাজিক অবস্থা নদ-নদী, হাওর নিয়েই গঠিত। এর বিপন্নতার জন্য এই অর্থনীতি ধ্বংস হচ্ছে। গত ২০-৩০ বছরের মধ্যে এর বিপন্নতা বেড়েছে। কিছু দুর্নীতিপরায়ণ জনপ্রতিনিধি ও ক্ষমতাশালী রাজনৈতিক কুশীলবরা এর জন্য দায়ী। যদিও অনেক আইন ও ব্যবস্থাপনার ব্যবস্থা রয়েছে কিন্তু তাদের কোনও কাজ নেই। তাই গণপ্রতিরোধ ছাড়া কোনও বিকল্প নেই।’

গবেষক ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. মাহবুবা নাসরীন বলেন, ‘আমরা হাওড় নিয়ে এখন কথা বলছি। ৫০-এর দশকের দিকে হাওরে তিনটি ফসল হতো। হাওরের ফসল নিয়ে ব্যাপক গবেষণা দরকার। কীভাবে একফসলি জমি দুই ফসল তিন ফসলে পরিণত করা যায়। তিনি দুর্নীতিরোধ জনসচেতনতা তৈরি করার প্রতি গুরুত্ব আরোপ করেন।’ তিনি আরও বলেন, ‘চলনবিলের খালগুলো খনন করা দরকার। চাষের জন্য ভূ-গর্ভস্থ পানির ব্যবহার বন্ধ করতে হবে।’

হাওর অঞ্চলের উপস্থাপনায় কাশমির রেজা বলেন, ‘কাজের বিনিময়ে টাকা’ (কাবিটা) নীতিমালায় কিছু পরিবর্তন করা হয়েছে। তবে নীতিমালা অনুযায়ী বাঁধ নির্মাণ করা হয়নি। এ বছর হাওরের সর্বোচ্চ বাজেট  ১৭৭ কোটি টাকা বরাদ্দ হয়েছে। যা অন্যান্য বছরের তুলনায় বেশি। কিন্তু আমরা যা আশা করেছিলাম, তা হয়নি। এ সমস্যা সমাধানে কিছু কিছু স্থায়ী বাঁধের প্রয়োজন রয়েছে বলে আমি মনে করি।’ তিনি এও সুপারিশ করেন, ‘যে মাছের উৎপাদন বাড়নোর জন্য প্রতিটি হাওরে একটি করে অভয়াশ্রম তৈরি করতে হবে।’ হাওরে মৎস্য গবেষণা কেন্দ্র থাকার জোর দাবিও জানান তিনি। 

সাংবাদিক গৌরাঙ্গ নন্দী দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের লবণাক্ততা ও পানি সমস্যার উপস্থাপনায় বলেন, ‘জোয়ার-ভাটা, লবণাক্ততা নিয়ে এই অঞ্চলে জটিলতা রয়েছে। ১৯৬১ সালের স্থায়ী পানি ব্যবস্থাপনার উদ্দেশ্যে ‘ক্রগ মিশন’-এর পরামর্শে বাস্তবায়িত কর্ডন অ্যাপ্রোচই মূলত এই জটিলতা সৃষ্টির জন্য দায়ী। কৃষি কাজের সুবিধার্থে আগে কৃষকেরা ৮ মাসের জন্য বাঁধ নির্মাণ করতেন। তা আবার তা সময়মতো খুলেও দিতেন। তখন কোনও সমস্যা ওইভাবে হতো না। পরে স্লুইসগেট তৈরির ফলে জোয়ারের পানি বাধাগ্রস্ত হয়েছে। যে কারণে পলি ও জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়। সে কারণে এই এলাকায় জলাবদ্ধতার প্রবণতা বৃদ্ধি পেতে থাকে। ফলে খাবার পানির ভয়াবহ সংকট দেখা দেয়।’

চলনবিল অঞ্চলের পানি সমস্যা ও নদী দখলের ওপরে উপস্থাপনায় স্থানীয় পর্যায়ে জনসচেতনতা বৃদ্ধির ওপর গুরুত্ব দিয়ে এসএম মিজানুর রহমান বলেন, ‘চলনবিল এলাকার আশেপাশে অনেক শিল্পকারখানার বর্জ্য, অটো রাইস মিলের ছাই, পৌরসভার বর্জ্য, পোল্ট্রি খামারের বর্জ্য, হোটেল/রেস্টুরেন্টের বর্জ্য, গৃহস্থালি বর্জ্য নদীতে ফেলার ফলে তা নদী, খাল, বিল, পুকুর, জলাশয় দূষিত করছে। অসংখ্য অপরিকল্পিত রাস্তা, কালভার্ট, স্লুইসগেট নদীগুলোকে হত্যা করেছে। ফলে বিলগুলো ধীরে ধীরে পানিশূন্য হয়ে গেছে।  বরেন্দ্র প্রকল্পের ৩০০টির বেশি ডিপটিউবওয়েল চলনবিলে স্থাপন করে ভূ-গর্ভস্থ পানি উত্তোলন করছে। ফলে গত ২০ বছরে এ অঞ্চলের ভূ-গর্ভস্থ পানির স্তর ১৫ থেকে ১৬ ফিট নিচে নেমে গেছে। চলনবিলের জন্য একটি কর্তৃপক্ষ থাকা দরকার। এ জন্য একটি আলাদা বাজেট থাকা খুবই গুরুত্বপূর্ণ।