সোমবার (২ এপ্রিল) ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নবাব নওয়াব আলী চৌধুরী সিনেট ভবনে অ্যাকশনএইড বাংলাদেশ, ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয় এবং সেন্টার ফর জেনোসাইড স্টাডিজ আয়োজিত ‘রোহিঙ্গা শরণার্থী সংকট: টেকসই সমাধানের লক্ষ্যে’ শীর্ষক দুই দিনের আন্তর্জাতিক সম্মেলনের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে বক্তারা এসব কথা বলেন।
সম্মেলনের উদ্বোধনী দিনে রোহিঙ্গা সংকটের বর্তমান প্রেক্ষাপটে পাঁচটি ঝুঁকি নিয়ে একটি বিশ্লেষণপত্র তুলে ধরেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক ড. ইমতিয়াজ আহমেদ। তিনি বলেন, ‘মিয়ানমারে রোহিঙ্গাদের নিয়ে জাতিগত বিদ্বেষ এই সমস্যা সমাধানে বড় প্রতিবন্ধকতা। চীন ও ভারতের মতো দেশ এ সমস্যা সমাধানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। তবে জাতিসংঘ যদি আন্তর্জাতিক আইন ও বড় রাষ্ট্রগুলোর সম্মতি নিয়ে এগিয়ে না আসে, তবে এ সমস্যার সমাধান করাটা কঠিন হবে।’
রোহিঙ্গা ইস্যুটি এখন আর মিয়ানমার ও বাংলাদেশের সংকট নয় উল্লেখ করে এই অধ্যাপক আরও বলেন, ‘একটা বিষয় আমাদের পরিষ্কারভাবে বুঝতে হবে— এটা একইসঙ্গে জাতীয়, আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক সংকট। এই সমস্যার দ্রুত সমাধান না হলে বাংলাদেশসহ দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোতে নিরাপত্তাহীনতা তৈরি হবে। মানবিক,অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক সমস্যা প্রকট হবে। সর্বহারা রোহিঙ্গাদের উপর যে গণহত্যা ও নিপীড়ন চালানো হয়েছে তার বিচার হওয়াটাও জরুরি।’
সম্মেলনের আয়োজক ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের সেন্টর ফর পিস অ্যান্ড জাস্টিসের নির্বাহী পরিচালক মনজুর হাসান বলেন, ‘রোহিঙ্গা সংকট নিরসন করতে হলে এই সংকট সম্পর্কে আমাদের স্বচ্ছ ধারণা থাকতে হবে। জাতিসংঘসহ আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় যদি রোহিঙ্গাদের মানবাধিকার রক্ষায় এগিয়ে না আসে, তাহলে তারা অচিরেই অনিরাপদ ও বিচ্ছিন্ন জনগোষ্ঠীতে পরিণত হবে। সামাজিকভাবে ভয়াবহ সংকটে পড়বে বাংলাদেশ। গভীর এই সংকটের দ্রুত নিরসন ও টেকসই সমাধানের জন্য একসঙ্গে কাজ করার কোনও বিকল্প নেই।’
মিয়ানমারের জন্য কানাডা সরকারের বিশেষ দূত রবার্ট কেইথের একটি লিখিত বক্তব্য তুলে ধরেন বাংলাদেশে নিযুক্ত কানাডার হাইকমিশনার বেনয়েট প্রিফন্টেইন। তিনি বলেন, ‘মিয়ানমার সরকার ও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে অবশ্যই বুঝতে হবে, রোহিঙ্গারাও মানুষ। সহিংসতার কারণে তারা নিঃস্ব হয়ে গেছে। তাই তাদের অধিকার নিশ্চিত করতে আমাদের সবাইকে সজাগ থাকতে হবে। কানাডা সরকার রোহিঙ্গা ইস্যুতে খুবই উদ্বিগ্ন এবং এই পরিস্থিতি কোনোভাবেই সমর্থন করে না। রোহিঙ্গাদের মিয়ানমারে ফিরিয়ে নিতেই হবে। তবে এক্ষেত্রে তাদের নিরাপত্তার বিষয়টি খুবই গুরুত্বপূর্ণ।’
রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে জাতিসংঘের উন্নয়ন বিষয়ক সংস্থা ইউএনডিপি’র কান্ট্রি ডিরেক্টর সুদীপ্ত মুখার্জী বলেন, ‘রোহিঙ্গা ইস্যু নিয়ে বাংলাদেশ একটি জটিল মুহূর্তে আছে। তাই খুব দ্রুত সম্মানের সঙ্গে রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসনের বিষয়টিকে গুরুত্ব দিতে হবে। কারণ রোহিঙ্গাদের কেবল মিয়ানমারে পাঠিয়ে দিলেই হবে না, তারা মানুষ হিসেবে সেখানে সম্মান পাচ্ছে কি না— সেটাও দেখতে হবে।’ রোহিঙ্গাদের সহায়তায় যে বিপুল পরিমাণ আর্থিক সহায়তা প্রয়োজন, তার জোগান দিতে বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান, রাষ্ট্র ও ব্যক্তিদের এগিয়ে আসতে হবে বলে মত দেন তিনি।
অ্যাকশনএইড বাংলাদেশের কান্ট্রি ডিরেক্টর ফারাহ কবির বলেন, ‘বাস্তবতা হলো— রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী তাদের অধিকার থেকে বঞ্চিত। এটা এখন আন্তর্জাতিক উদ্বেগ ও দুশ্চিন্তার বিষয়। শিগগিরই রোহিঙ্গা সংকট নিরসনের উদ্যোগ না নিলে সমস্যায় পড়তে হবে বাংলাদেশকে। চাপ পড়বে দেশীয় অর্থনীতির ওপর। এছাড়া রোহিঙ্গাদের স্বাস্থ্য, নিরাপত্তা, পারিপার্শ্বিক পরিবেশ ও দ্বিপাক্ষিক বা ত্রিপাক্ষিক কূটনীতিতেও বিরূপ প্রভাব ফেলবে এই সংকট।’
সম্মেলনের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে পররাষ্ট্র সচিব শহিদুল হক বলেন, ‘রোহিঙ্গা সংকট মিয়ানমারের জাতিগত বিদ্বেষের ফল। এটি আর বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। এই সমস্যার টেকসই সমাধানে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে সঙ্গে নিয়ে মাঠ পর্যায়ে কাজ করতে চাই আমরা। রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর কাছে বাংলাদেশ সরকারের প্রতিশ্রুতি হলো—তাদের কাউকে জোর করে ফেরত পাঠানো হবে না। কোনও ধরনের সহিংসতা চালানো হবে না এবং কারও সঙ্গে কোনও ধরনের বৈষম্যমূলক আচরণ করা হবে না।’
পররাষ্ট্র সচিব আরও বলেন, ‘রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসনের আগে মিয়ানমার সরকারকেও প্রতিশ্রুতি দিতে হবে যে রাখাইন রাজ্যে আর কখনও সহিংসতা চালানো হবে না। অনতিবিলম্বে দায়িত্বশীলতার সঙ্গে ও শর্তহীনভাবে আনান কমিশনের প্রতিবেদনের বাস্তবায়ন করা হবে। আর এ ক্ষেত্রে মিয়ানমারের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হবে।’