এবার প্রশ্নফাঁসকারীরা ধরা!

বাংলা ট্রিবিউনের সঙ্গে প্রশ্নফাঁসকারী চক্রের এক সদস্যের কথোপকথন

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সব পাবলিক পরীক্ষাসহ বিভিন্ন নিয়োগ পরীক্ষায় টানা প্রশ্নফাঁস হতে দেখা গেছে। সর্বশেষ এসএসসি পরীক্ষায়ও প্রায় সবগুলো বিষয়ের প্রশ্নফাঁস হয়ে যায়। এরপর নড়চড়ে বসে শিক্ষা মন্ত্রণালয়। প্রশ্নফাঁস রোধে এসএসসি পরীক্ষায় নেওয়া সব উদ্যোগ বিফলে যাওয়ার পর তীব্র সমালোচনার মুখে এইচএসসি পরীক্ষায় আর প্রশ্নপত্র ফাঁস না হওয়ার ঘোষণা দেওয়া হয় মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে। এইচএসসি পরীক্ষায় প্রশ্নপত্র ফাঁসরোধে আঁটঘাঁট বেঁধে নামের মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা, নেওয়া হয় নতুন কিছু কৌশল।  সে কৌশলগুলো কাজে লেগেছে বলে ধারণা করছেন শিক্ষা সংশ্লিষ্টরা।

গত ২ এপ্রিল শুরু হওয়া এইচএসসি’র দুটি বিষয়ের পরীক্ষা ইতোমধ্যে অনুষ্ঠিত হয়েছে প্রশ্নপত্র ফাঁসের অভিযোগ ছাড়াই। নির্বিঘ্নে এসব পরীক্ষা সম্পন্ন হওয়ায় স্বস্তি প্রকাশ করেছেন পরীক্ষার্থী ও অভিভাবকরা। তারা আশা করছেন, সবগুলো পরীক্ষা যেন এভাবেই নির্বিঘ্নে কাটে।

প্রশ্নপত্র ফাঁস হয়নি বটে কিন্তু বিগত সময়ের মতোই এবারও পরীক্ষার আগ থেকেই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে যথেষ্ট তৎপর থাকতে দেখা গেছে প্রশ্নপত্র ফাঁসকারীদেরকে। পরীক্ষাকে কেন্দ্র করে বেশ আগে থেকেই পরীক্ষার্থীদের আকৃষ্ট করে প্রশ্ন দেওয়ার নানা রকম বিজ্ঞাপনধর্মী পোস্ট এবারও দিয়েছিল ফেসবুক ও হোয়াটসঅ্যাপের বিভিন্ন গ্রুপে। পরীক্ষা শুরুর প্রথম দিন ফেসবুক ও হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে প্রশ্ন দেওয়ার আশ্বাস দিতে এই চক্রটি। কিন্তু, আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর কঠোর নজরদারি ও শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের তৎপরতায় প্রথম দুই বিষয়ের পরীক্ষায় প্রশ্নপত্র ফাঁস করতে পারেনি তারা।

সরকারের নিশ্ছিদ্র তৎপরতার কারণে সফল হতে পারেনি প্রশ্নফাঁসকারীরা

তবে প্রশ্নফাঁস করতে না পারলেও এদের কেউ কেউ ফেসবুকের বিভিন্ন গ্রুপে পরীক্ষা আগ মুহুর্তে ভুয়া প্রশ্ন ছড়িয়ে দিয়ে সেটাকেই আসল প্রশ্নপত্র দাবি করে পরীক্ষার্থীদের কাছ থেকে প্রতারণা করে অর্থ হাতিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছে। PSC • JSC • SSC • HSC Exam Helping Center, PSC • JSC • SSC • HSC Exam Helping Center 18+19+20+21BD সহ বেশ কয়েকটি গ্রুপে এমন ভুয়া প্রশ্নের ছবি দিয়ে প্রশ্নফাঁসের গুজব তৈরি করছে এবং প্রতারণার ফাঁদ পেতেছে। কিন্তু পরীক্ষা শেষে দেখা গেছে সেসব প্রশ্নের সঙ্গে  অনুষ্ঠিত পরীক্ষার প্রশ্নপত্রের কোনও মিল নেই। তবে বিষয়টি পরীক্ষার পর ধরা পড়ায় তাদের জারিজুড়ি ধরা পড়ে যায়। এবার এইচএসসি পরীক্ষার্থীদেরও নকল প্রশ্ন বা ফাঁস হওয়া প্রশ্ন কেনার ব্যাপারে খুব তোড়জোড়ের কথা শোনা যায়নি।  এসব কারণে প্রশ্নফাঁস করতে না পেরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে হতাশা প্রকাশ করতে দেখা গেছে। এক পর্যায়ে তাদের বলতে দেখা যায়, ‘এবার প্রশ্নফাঁস হবে না। সরকার হার্ড লাইনে চলে গেছে।’

ফেসবুকে প্রশ্নপত্র দেওয়ার প্রলোভন দেওয়া এক ভুয়া ফেসবুক আইডিধারী ‘নীল আকাশ’। ফেসবুকে প্রশ্নপত্র বিক্রির বিজ্ঞাপনসূচক পোস্ট আছে এই অ্যাকাউন্টধারীর। তার সঙ্গে প্রশ্নপত্র কেনার নাম করে ইনবক্সে কিছুক্ষণ মেসেজ আদান প্রদান হয় বাংলা ট্রিবিউনের। প্রথম পরীক্ষা শুরুর দিন সকালে এই অ্যাকাউন্টধারী বাংলা ট্রিবিউনের কাছে দাবি করেছিল,‘সরকার কোনোভাবেই প্রশ্নফাঁস ঠেকাতে পারবে না। প্রশ্নফাঁস হবেই।’ কিন্তু, পরবর্তীতে পরীক্ষা শুরুর  কিছুক্ষণ সে হতাশ হয়ে জানায়, ‘এবার প্রশ্নফাঁস হবে না। এইবার গভর্নমেন্ট খুব কড়া। পসিবল নয় আর প্রশ্নফাঁস করা। তবে আমিও চাই না প্রশ্নফাঁস হোক। কারণ, দেশের ভালো সবাই চায়।‘

সরকারের নিশ্ছিদ্র তৎপরতার কারণে সফল হতে পারেনি প্রশ্নফাঁসকারীরা

এবার এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষার আগে শিক্ষা মন্ত্রণালয়সহ সরকার প্রশ্নফাঁস ঠেকাতে নানারকম পদক্ষেপ গ্রহণ করে। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের দাবি, এসব পদক্ষেপের মধ্যে অন্যতম কার্যকরী পদক্ষেপ ছিল পরীক্ষার শুরুর ২৫ মিনিট আগে সেট নির্ধারণ, প্রশ্নপত্রের প্যাকেট সিকিউরিটি টেপ দিয়ে আটকানো এবং ৩০ মিনিট আগে পরীক্ষার্থীদেরকে কেন্দ্রে নিজ আসনে বসা।

এদিকে প্রশ্নপত্র ফাঁস না হওয়ায় খুশি অভিভাবকরা। কয়েকজন অভিভাবক বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘হয়ত কিছু অভিভাবক চান, তার বাচ্চা প্রশ্ন পেয়ে পরীক্ষা দিয়ে অন্যদের চেয়ে অনেক এগিয়ে থাকুক। কিন্তু এই মানসিকতা খুব কম অভিভাবকের। তবে প্রশ্নফাঁস হলে অনেক অভিভাবকই এই সুযোগটি নিতে চায়।’

ফাতেমা সুলতানা নামে এক অভিভাবক বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘ব্যক্তিগতভাবে আমি অনেক সচেতন এবং সোচ্চার কোনোভাবেই যেন প্রশ্নফাঁস না হয়। প্রশ্নফাঁস হলে হয়ত কেউ কেউ তাৎক্ষণিক সুবিধা নেন কিন্তু সামগ্রিকভাবে সেটা দেশের জন্য অনেক বড় ক্ষতি। ফলে এই ধরনের কর্মকাণ্ড একদমই গ্রহণযোগ্য নয়। এতদিন পর এইচএসসি পরীক্ষা হচ্ছে প্রশ্নফাঁস মুক্ত, এটা জেনে খুবই স্বস্তিবোধ করছি। সরকারের উচিত হবে এর ধারাবাহিকতা বজায় রাখা।’

এদিকে, এসএসসি পরীক্ষার সময় প্রশ্নফাঁস ঠেকানোর ঘোষণা দিয়ে ব্যর্থ হওয়ায় এইচএসসি পরীক্ষায় প্রশ্নফাঁসের বিষয়ে কথা বলার ক্ষেত্রে বেশ সতর্ক শিক্ষা মন্ত্রণালয় সংশ্লিষ্টরা। এ বিষয়ে জানতে চাইলে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের সচিব মো. সোহরাব হোসাইন এ বিষয়ে বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘আমরা অনেক চেষ্টা করছি যেন প্রশ্নফাঁস না হয়। সে কারণে এখন পর্যন্ত ফাঁসের অভিযোগ আসেনি। কিন্তু এখনও অনেক পরীক্ষা বাকি রয়েছে। আমরা এখনই নিশ্চিত করে বলতে পারবো না আগামী পরীক্ষাগুলোতে প্রশ্নফাঁসের অভিযোগ আসবে না। কারণ, অসাধু চক্র সবসময়ই ফাঁক-ফোঁকর খুঁজতে থাকে। তবে আমরা আশাবাদী।’