মাধ্যমিকে অটিস্টিক শিশুদের ভর্তি বাধ্যতামূলক করা হচ্ছে

স্কুলে অটিস্টিক শিশুরা (ফাইল ছবি)

একীভূত শিক্ষাব্যবস্থায় অটিস্টিক শিশুদের শিক্ষা নিশ্চিত করতে সারাদেশের সব মাধ্যমিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ভর্তি বাধ্যতামূলক করা হচ্ছে। ভর্তি বিজ্ঞপ্তি দিয়ে কোটা সংরক্ষণ করতে হবে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানকে। এ ছাড়া, মান ঠিক রেখে সংক্ষিপ্ত আকারে পাঠ্যক্রম ও পাঠ্যসূচি প্রণয়ন করা হবে। সুচিন্তা ফাউন্ডেশনের সহযোগিতায় পাঠ্যক্রম ও পাঠ্যসূচি প্রণয়ন করবে জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠপুস্তুক বোর্ড (এনসিটিবি)। সংশ্লিষ্ট সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।

শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগের যুগ্মসচিব (মাধ্যমিক) সালমা জাহান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, “অটিস্টিক শিশুদের সমাজের মূল স্রোতধারায় ফিরিয়ে এনে যোগ্য ও দক্ষ নাগরিক হিসেবে গড়ে তুলতে এ ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। এরই মধ্যে দেশের আটটি বিদ্যালয় নির্বাচন করা হয়েছে পাইলটিংয়ের জন্য। একীভূত শিক্ষার লক্ষ্য বাস্তবায়নে মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগ ‘অটিজম ও নিউরো-ডেভেলপমেন্টাল ডিজঅ্যাবিলিটি (এনডিডি) শিক্ষার্থীদের জন্য একীভূত শিক্ষা ব্যবস্থাপনা’ নীতিমালাটি চূড়ান্ত করা হবে শিগগিরই। দেশের মাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষকদের প্রস্তুত করতে আগামী সপ্তাহে একটি পরিপত্র জারি করা হবে।”

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, সারাদেশের সব মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষক ও সহকারী প্রধান শিক্ষক ছাড়াও কমপক্ষে আরও দু’জন শিক্ষককে প্রশিক্ষণের নির্দেশনা থাকবে ওই পরিপত্রে।

ন্যাশনাল অ্যাকাডেমি ফর অটিজম অ্যান্ড নিউরো-ডেভেলপমেন্ট ডিজঅ্যাবিলিটিজ (এনএএডিডি) প্রকল্প পরিচালক অধ্যাপক সালমা বেগম বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘দেশের সব মাধ্যমিক স্কুলের প্রধান শিক্ষক ও সহকারী প্রধান শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ দেওয়ার কাজ চলছে। পর্যায়ক্রমে অন্য শিক্ষকদেরও প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে।’

নীতিমালায় বলা হয়, দেশের ১৮ লাখের বেশি অটিজম স্পেকট্রাম ডিজঅর্ডার (এএসডি) এবং নিউরো ডেভেলপমেন্টাল ডিজঅ্যাবিলিটিজ (এনডিডি) ব্যক্তি রয়েছেন। এদের জন্য বিশেষ সেবা কাঠামো গড়ে তোলা জরুরি। সামগ্রিক সেবা ও সমর্থন ব্যবস্থার মধ্যে উপযুক্ত শিক্ষাব্যবস্থা দিতে হবে, যাতে তারা দেশের যোগ্য ও দক্ষ নাগরিক হিসেবে গড়ে ওঠে।

খসড়া নীতিমালায় অটিস্টিক শিক্ষার্থীদের মাধ্যমিকে ভর্তি ও পড়ালেখার জন্য বিশেষ ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। যদিও নীতিমালা চূড়ান্ত করার আগেই শিক্ষা মন্ত্রণালয় পাইলট কর্মসূচির আওতায় দেশের আট বিভাগে আটটি বিদ্যালয়কে নির্বাচন করেছে একীভূত শিক্ষার জন্য।

অটিস্টিক শিশুদের বিশেষায়িত প্রতিষ্ঠানে লেখাপড়ার পর পরবর্তী শ্রেণিতে (ষষ্ঠ শ্রেণি) ভর্তি হওয়ার জন্য বিশেষ সুবিধা রাখা হয়েছে নীতিমালায়। নীতিমালা অনুযায়ী পিইসি ও জেএসসি পরীক্ষার ক্ষেত্রে অটিজম শিশুরা যে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে লেখাপড়া করবে সেই প্রতিষ্ঠানের ধারাবাহিক মূল্যায়ন বিবেচিত হবে। আর এসএসসি পরীক্ষার ক্ষেত্রে দীর্ঘ রেজিস্ট্রেশন মেয়াদ ১০ থেকে ১৫ বছর বহাল রেখে পরবর্তী শ্রেণিতে (একাদশ শ্রেণিতে) ভর্তির সুযোগ পাবে। শুধুমাত্র অনুত্তীর্ণ বিষয়ে পরীক্ষা দিয়ে উত্তীর্ণ হতে হবে।

ষষ্ঠ শ্রেণিতে ভর্তি নিশ্চিত করতে কোটা সংরক্ষিত রাখতে হবে ভর্তি বিজ্ঞপ্তিতে। শিক্ষার্থীর বাসস্থানের নিকবর্তী বিদ্যালয়েই ভর্তি নিশ্চিত করতে হবে। প্রত্যেক শিক্ষার্থীর জন্য আলাদা ফাইল খুলতে হবে। চাহিদা, সক্ষমতা, সীমাবদ্ধতা ও আচরণগত অসুবিধাগুলোকে ফাইল বা রেজিস্ট্রারে লিখিত থাকবে। শিক্ষার্থীদের যাতায়াতের জন্য উপযুক্ত যানবাহন বিদ্যালয়ে প্রবেশে র‌্যাম্প ও শ্রেণিকক্ষসহ বিদ্যালয়ে চলাচলের সুব্যবস্থা থাকবে। শ্রেণিকক্ষে পর্যাপ্ত আলোর ব্যবস্থা উপযুক্ত আসন, ব্যবহার উপযোগী লেখার বোর্ড থাকবে। উপযুক্ত ওয়াশরুম, খেলার মাঠ, বিনোদনমূলক ব্যবস্থা ও প্রয়োজনে বিশ্রামের ব্যবস্থাও থাকবে। পরীক্ষাকেন্দ্রে উপযুক্ত কক্ষ থাকবে। শিক্ষক, কর্মচারী ও শিক্ষার্থীদের আচরণ সহযোগিতামূলক সহমর্মী করার ব্যবস্থা থাকবে। স্বাস্থ্যসেবা, বিশ্রামের জন্য কক্ষ নির্দিষ্ট থাকবে।

শিক্ষার্থীদের সক্ষমতার ভিন্নতা অনুসারে পাঠ্যসূচি নির্ধারণ করতে হবে বছরের শুরুতেই। সক্ষমতাভেদে শিক্ষার্থীদের পাঠ্যবইয়ের সংখ্যা কমানো এবং পাঠ্যসূচি পুনর্বিন্যাস করা হবে। সমক্ষমতার মাত্রা ও সীমাবদ্ধতার ধরন সম্পর্কে শিক্ষক-কর্মচারীদের নির্দেশনা দিতে বলা হয়েছে নীতমালায়।

শিক্ষার্থীদের অর্ধ-বার্ষিক ও বার্ষিক পরীক্ষায় অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে। পাবলিক পরীক্ষায় অংশগ্রহণের জন্য আলাদা রেজিস্ট্রেশন নম্বরের ব্যবস্থা থাকবে। পাবলিক পরীক্ষার হলে বিদ্যালয়ের ন্যয্য আসন ব্যবস্থা ও সুযোগ-সুবিধার ব্যবস্থা থাকতে হবে। বিধি অনুযায়ী বিদ্যালয়ের অভ্যন্তরীণ পরীক্ষাতেও অতিরিক্ত সময় দিতে হবে। প্রয়োজনে পরীক্ষার হলে সহায়ক অবস্থানের বিধানটি বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে হবে। বিদ্যালয়ের অভ্যন্তরীণ ও পাবলিক পরীক্ষার ক্ষেত্রে বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন এসব শিক্ষার্থীদের সামর্থ ও উপযুক্ততাভেদে তাদের জন্য প্রশ্ন প্রণয়ন, বিশেষ প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত শিক্ষকদের সাহায্যে ধারাবাহিক মূল্যায়নের মাধ্যমে বিদ্যালয়ের সংরক্ষণ বোর্ডে রাখতে হবে। মূল্যায়ন প্রতিবেদনের ওপর ভিত্তি করে পরবর্তী শ্রেণিতে উত্তীর্ণ করার সার্টিফিকেট ব্যবস্থা করতে হবে। শিক্ষার্থীদের বয়স অনুসারে সোশ্যাল প্রমোশনের ব্যবস্থা করতে হবে।

নীতিমালার উদ্দেশ্য ও লক্ষ্যে বলা হয়েছে, দেশের প্রতিটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানকে অটিজম ও এনডিডি শিক্ষার্থীদের উপযোগী করা, অটিজম ও এনডিডি শিক্ষার্থীদের মূলধারার শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে অন্তর্ভুক্তি নিশ্চিত করতে হবে। বিশেষ শিক্ষা থেকে মূলধারার শিক্ষায় স্থানান্তরের মাধ্যমে দেশের সব অটিজম ও এনডিডি শিক্ষার্থীর শিক্ষার অধিকার নিশ্চিত করতে হবে। দেশের সব শিক্ষার্থীর মধ্যে সহমর্মীতা ও বৈষম্যহীন মনোভাব গড়ে তোলার মাধ্যমে একীভূত সমাজ প্রতিষ্ঠা করতে হবে।