চারুকলার গেট দিয়ে বের হয়ে টিএসসি ঘুরে রূপসী বাংলা হোটেলের সামনের রাস্তা দিয়ে ফের চারুকলায় এসে শোভাযাত্রা শেষ হয়। সকাল ১০টার দিকে শোভাযাত্রা চারুকলায় ফিরে আসে। ঢাবি’র শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের পাশাপাশি হাজারো মানুষ অংশ নিয়েছেন এই শোভাযাত্রায়।
মঙ্গল শোভাযাত্রাকে ঘিরে নেওয়া হয় ব্যাপক নিরাপত্তা ব্যবস্থা। পুলিশ ও র্যাবসহ বিভিন্ন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা শোভাযাত্রার চারপাশে দায়িত্ব পালন করেন।
শোভাযাত্রায় অংশ নিতে শনিবার সকাল থেকেই ঢাবি ক্যাম্পাসের দিকে ছিল মানুষের ঢল। শোভাযাত্রা শুরু হওয়ার পরও অনেকেই ক্যাম্পাসের বিভিন্ন স্থান থেকে এতে অংশ নিয়েছেন।
বাংলা ১৪২৫ সনকে বরণ করে নিতে রমনার বটমূলে আয়োজন করা হয় বর্ষবরণ অনুষ্ঠানের। বাঁশিতে ভোরের রাগালাপ দিয়ে সূচনা হলো ছায়ানট আয়োজিত বর্ষবরণের ৫১তম আয়োজন। রাজধানীর ঐতিহাসিক রমনার বটমূলে ভোর সোয়া ৬টায় এই অনুষ্ঠান শুরু হয়। এবারের আয়োজনের মূল প্রতিপাদ্য ‘বিশ্বায়নের বাস্তবতায় শিকড়ের সন্ধান’। প্রায় দেড়শতাধিক শিল্পীর অংশগ্রহণে দুই ঘণ্টার এই আয়োজন সাজানো হয় ১৬টি একক, ১২টি সম্মেলক গান আর ২টি আবৃত্তি দিয়ে। সকাল সোয়া ৮টার দিকে অনুষ্ঠানের সমাপ্তি ঘটে ছায়ানট-সভাপতি সন্জীদা খাতুনের শুভেচ্ছা কথন দিয়ে।
জীর্ণ-পুরাতনকে পেছনে ফেলে সম্ভাবনার নতুন বছরকে বরণ করে নিতে রাজধানীর বিভিন্ন স্থানে আরও নানা ধরনের অনুষ্ঠান আয়োজন করা হয়েছে।
নববর্ষকে স্বাগত জানিয়ে রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পৃথক বাণী দিয়েছেন। এছাড়াও আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এবং সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের এবং জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ বাংলা নববর্ষ উপলক্ষে দেশবাসীকে শুভেচ্ছা এবং অভিনন্দন জানিয়েছেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. আখতারুজ্জামান বিশ্ববিদ্যালয় পরিবারসহ সবাইকে বাংলা নববর্ষের শুভেচ্ছা জানিয়েছেন।
কৃষি কাজ ও খাজনা আদায়ের সুবিধার জন্য বাংলা সন গণনার শুরু মুঘল সম্রাট আকবরের সময়ে। হিজরি চান্দ্রসন ও বাংলা সৌরসন ভিত্তি করে প্রবর্তন হয় নতুন এই বাংলা সন।
১৫৫৬ সালে কার্যকর হওয়া বাংলা সন প্রথমদিকে পরিচিত ছিল ফসলি সন নামে, পরে তা পরিচিত হয় বঙ্গাব্দ নামে। কৃষিভিত্তিক গ্রামীণ সমাজের সঙ্গে বাংলাবর্ষের ইতিহাস জড়িয়ে থাকলেও এর সঙ্গে রাজনৈতিক ইতিহাসেরও সংযোগ ঘটেছে।
দেশ স্বাধীনের পর বাঙালির অসাম্প্রদায়িক চেতনার প্রতীকে পরিণত হয় বাংলা বর্ষবরণ অনুষ্ঠান। উৎসবের পাশাপাশি স্বৈরাচার-অপশক্তির বিরুদ্ধে প্রতিবাদও এসেছে পহেলা বৈশাখের আয়োজনে। ১৯৮৯ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা ইনস্টিটিউটের উদ্যোগে বের হয় প্রথম মঙ্গল শোভাযাত্রা। ২০১৬ সালের ৩০ নভেম্বর ইউনেস্কো এ শোভাযাত্রাকে বিশ্ব সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের মর্যাদা দেয়।
নববর্ষ উপলক্ষে আজ সরকারি ছুটির দিন। জাতীয় সংবাদপত্রগুলো বাংলা নববর্ষের বিশেষ দিক তুলে ধরে ক্রোড়পত্র বের করেছে। সরকারি ও বেসরকারি টিভি চ্যানেলে নববর্ষকে ঘিরে বর্ণাঢ্য অনুষ্ঠানমালা প্রচার করা হচ্ছে।
বাঙালির এই প্রাণের উৎসবকে ঘিরে রমনা পার্কসহ বিশ্ববিদ্যালয় এলাকার পুরোটাই ঢেকে দেয়া হয়েছে নিরাপত্তা চাদরে। শুধু রাজধানী ঢাকাই নয়, এ উপলক্ষে সারাদেশেই নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পুলিশ ও র্যাবের পাশাপাশি গোয়েন্দা সংস্থা ও তাদের আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে যৌথভাবে কাজ করছে সব সংস্থা। সার্বিক নিরাপত্তা ও নজরদারি নিশ্চিত করতে বসানো হয়েছে কন্ট্রোল রুম, অবজারভেশন পোস্ট ও চেকপোস্ট। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের পাশাপাশি থাকছে গোয়েন্দা দলের সদস্য, বোমা ডিসপোজাল টিম ও মেডিক্যাল টিম।
বাঙালির প্রাণের উৎসব পহেলা বৈশাখ উদযাপন ১৪২৫ উপলক্ষে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন বিভাগ, ইনস্টিটিউট এবং ক্যাম্পাসের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান বর্ণাঢ্য কর্মসূচি গ্রহণ করে। সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোট দুই বছর বিরতি দিয়ে এবার পহেলা বৈশাখে বিস্তারিত কর্মসূচি হাতে নেয়। বাংলা একাডেমি সকালে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছে। বইমেলাসহ বৈশাখী মেলার আয়োজন করা হয়েছে একাডেমি চত্বরে। বর্ষবরণ উপলক্ষে চ্যানেল আই ও সুরের ধারা বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্র প্রাঙ্গণে আয়োজন করেছে হাজারো কণ্ঠে’ বর্ষবরণের অনুষ্ঠান। মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর সকাল ৯টায় বর্ষবরণ অনুষ্ঠানের আয়োজন করে।
ছবি: নাসিরুল ইসলাম।