উৎসবের নগরী ঢাকা

১১১১১১১১

আজ পয়লা বৈশাখ, বাংলা নববর্ষ। দিনের সূর্য ওঠার পরপরই শুরু হয়েছে ১৪২৫ সনের গণনা, শুরু হয়েছে নগরজুড়ে উৎসব। শুরুর দিনেই ঢাকাবাসী বৈশাখের তীব্র তাপদাহের আঁচ পেয়েছেন। তবু নেই বিন্দুমাত্র ক্লান্তি। হাজারো মানুষ নতুন পোশাক পরে স্বজনদের সঙ্গে নিয়ে রাস্তায় নেমে এসেছেন। পুরনো যা কিছু ব্যর্থতা, গ্লানি; সব ঘুচায়ে নতুন দিনের খোঁজে মানুষ উদযাপন করছে দিনটি।

নাগরদোলা

রাস্তায়-উদ্যানে-লেকের পাড়ে সাদা-লাল পোশাকের ভিড়কে আরেকটু আনন্দময় করে তুলতে খাজা, গজা, বাতাসা, নলখাগড়ার বাঁশিসহ বাঙালি লোক-ঐতিহ্যের নানা উপকরণ সাজিয়ে জমে উঠেছে মেলা। বাংলা একাডেমিতে চলছে বৈশাখের রমরমা মেলা। রাজধানীর ধানমন্ডি লেকজুড়ে সকাল থেকেই ছিল নানা আয়োজন। ধানমন্ডির লেক ঘেঁষে শিশুদের জন্য হাতে ঘোরানো নাগরদোলা থেকে শুরু করে গ্রামবাংলার ঐতিহ্য এনে দাঁড় করানো হয়েছে শহরে।

বাংলা একাডেমির মেলা

প্রভাতে সূর্য ওঠার সঙ্গে সঙ্গে শুরু হয় হাজারো কণ্ঠে বর্ষবরণের গান ‘এসো হে বৈশাখ’। সুরের ধারা-চ্যানেল আই’র আয়োজনে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে এক হাজার শিল্পী অনুষ্ঠানে অংশ নেন। এ সময় রেজওয়ানা চৌধুরী বন্যা আর বাপ্পা মজুমদারের গানের সঙ্গে কণ্ঠ মেলান শ্রোতারা। সেখানে বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে মানুষের ঢল নামে। অনেককেই দেখা যায়, তারা বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে বাসা থেকে আনা খাবার খেতে বসেছেন বাচ্চাদের নিয়ে।

বঙ্গবন্ধু সম্মেলন কেন্দ্রর অনুষ্ঠান

সকালটা ছিল বৈশাখ আর আনন্দ আয়োজনের নানা গানে গানে ভরা। সেই আয়োজনের কেন্দ্রবিন্দু ছিল ছায়ানট আয়োজিত রমনার বটমূলের প্রধান বর্ষবরণ অনুষ্ঠান। এতে ঢাকার বিভিন্ন প্রান্ত থেকে সববয়সী মানুষ এসেছেন নতুন সূর্যকে বরণ করে নিতে। মিরপুর থেকে সপরিবারে আসা সাহাদাত হোসেন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘আজ দশ বছর ঢাকা শহরে থাকি। প্রতিবছর এখানে এসে বছরটা শুরু করি। এমন শুভ্র সকাল আর মধুর গানের আয়োজন দিয়ে শুরু করলে আগামীর দিনগুলোতে সেই রেশ থাকবে এটাই প্রত্যাশা।  

মাঠে বসে আছে মানুষজন

বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে কিশোর-যুবকরা হেঁটে অথবা রিকশায় করে ছুটতে থাকেন শাহবাগের দিকে, যেন মিলনমেলার কেন্দ্র শাহবাগ। নতুন পোশাকে প্রিয়জনকে নিয়ে ঘুরতে বের হওয়া নাদিয়া হাসান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘আজকের দিনটা বেশ অন্যরকম রঙিন। ঈদে নানা সামাজিকতার দায়িত্ব থাকে, এই দিনে তা থাকে না। কিন্তু উৎসবের কী দুর্দান্ত মজা তা পহেলা বৈশাখেই বোঝা যায়।’

হেঁটে যাওয়া মানুষের ঢল

রাজধানীর মানিক মিয়া অ্যাভিনিউতে গতরাতে আলপনা এঁকে বাংলা নতুন বর্ষ উদযাপনের ব্যবস্থা করা হয়।  সকাল থেকে সেই আলপনাকে সামনে রেখে মানুষজনের দলবেঁধে ছবি তোলার যেন আরেক মহাউৎসব। দুপুরে ফাঁকা রাস্তায় বসে ছবি তুলছেন অনেকে, রাস্তায় বাইক রেখে বন্ধুবান্ধব সদলবলে, আবার কেউ কেউ সপরিবারে ছবি তোলায় ব্যস্ত সময় কাটাচ্ছেন।

আলপনার মধ্যে দুই শিশু

শর্মিষ্ঠা রায় সাধারণত বৈশাখে ঢাকায় থাকেন না। এবার ঢাকায় থাকার কারণে সকালে বের হয়ে বেশ কয়েকটি এলাকা ঘুরে এসে বলেন, ‘এত রোদ গরম পাত্তা না দিয়ে এই যে মানুষের রাস্তায় আনন্দ উদযাপন, এটা অন্যরকম আনন্দ। কেউ কাউকে চিনি না কিন্তু কেমন যেন একই উৎসবে একই জায়গায় উদযাপনে একধরনের একাত্মতা আছে।’ ৫টার মধ্যে আয়োজন শেষ করার যে নির্দেশনা সে বিষয়ে তিনি বলেন, ‘এ ধরনের ধরে-বেঁধে দেওয়া সময় দিয়ে কী উদযাপন হয়! পরিস্থিতি বিবেচনায় এ ধরনের সিদ্ধান্ত নিতে কর্তৃপক্ষ বাধ্য হয়েছেন। এখন আমাদের সচেতন হওয়ার পালা। তাহলে একসময় আমরাই এই বিধিনিষেধ উঠিয়ে নেওয়ার কথা বলতে পারবো।’

রবীন্দ্রসংগীত পরিবেশন করছেন মীনা ট্রাস্টের প্রেসিডেন্ট আমিনা আহমেদ

এর আগে সকালে সূর্য ওঠার সঙ্গে সঙ্গে নতুন বছরের সকালকে রাঙিয়ে দিতে দেশবরেণ্য শিল্পীদের নিয়ে মীনা ট্রাস্ট আয়োজন করেছে বর্ষবরণ উৎসবের। বর্ষবরণের সকালে ধানমন্ডির ২/এ সড়ক মুখরিত হয়ে ওঠে গানে গানে। এ সময় সংগীত পরিবেশন করেন বিশিষ্ট রবীন্দ্রসংগীত শিল্পী ও মীনা ট্রাস্টের প্রেসিডেন্ট আমিনা আহমেদ। অন্যদের মধ্যে আরও ছিলেন কণ্ঠশিল্পী সাঈদা হোসেন পাপড়ি, ছন্দা চক্রবর্তী, ফেরদৌসী কাকলী, সৈয়তা রিফাত জামাল, রুবা মজুমদার, প্রমোদ দত্ত,জাকির হোসেন তপন, গোলাম হায়দার, বালা দেব বর্মণ, অনিরুদ্ধ সেন গুপ্তসহ অনেকেই।

মঙ্গল শোভাযাত্রা

সকাল ১০টায় ছিল পুরো ঢাকার মূল আয়োজন মঙ্গল শোভাযাত্রা। ‘মানুষ ভজলে সোনার মানুষ হবি’ প্রতিপাদ্য ও মর্মবাণী ধারণ করে শোভাযাত্রাটি চারুকলার গেট দিয়ে বের হয়ে টিএসসি ঘুরে রূপসী বাংলা হোটেলের সামনের রাস্তা দিয়ে ফের চারুকলায় এসে শোভাযাত্রা শেষ হয়। ঢাবি’র শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের পাশাপাশি হাজারো মানুষ অংশ নিয়েছেন এই শোভাযাত্রায়।