বঙ্গবন্ধুর বরাদ্দ দেওয়া বাসা থেকে উচ্ছেদ হতে হচ্ছে শহীদ পরিবারকে





খুরশিদা হায়দারবঙ্গবন্ধুর বরাদ্দ দেওয়া বাসা থেকে এক শহীদ পরিবারকে উচ্ছেদ করা হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে। ‘বাদীকে না জানিয়ে’ আদালতের স্থগিতাদেশ প্রত্যাহার করিয়ে মুক্তিযুদ্ধে শহীদ সরকারি কর্মচারী মহিউদ্দিন হায়দারের স্ত্রী খুরশিদা হায়দার ও তার ছেলেকে উচ্ছেদ করতে যাচ্ছে সরকারের গৃহায়ণ ও গণপূর্ত অধিদফতর। ১৯৭৩ সাল থেকে পরিবার নিয়ে বসবাস করে আসা এই পরিবারকে সোমবার (৩০ এপ্রিল) বাড়ি ছাড়তে হচ্ছে।
এ অবস্থায় ভেঙে পড়েছেন শহীদ পরিবারটির সদস্যেরা। বাসা ছাড়তে কিছুটা সময় চাইলেও তা দেওয়া হয়নি— এমন অভিযোগ করে খুরশিদা হায়দার বলেন,‘ইচ্ছার বিরুদ্ধে, হুমকি ও চাপের মুখে, অপমান নিয়ে ৪৫ বছরের ঠিকানা থেকে উচ্ছেদ হতে হচ্ছে।’ আর শহীদ মহিউদ্দিনের এক ছেলে সাহেদ সদরুদ্দিন তাদের দুর্দশার কথা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে তুলে ধরেছেন।
বাসা বরাদ্দের অর্ডারশহীদ মহিউদ্দিন হায়দারের স্ত্রী খুরশিদা হায়দার বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘১৯৭৩ সালে শহীদ পরিবার হিসেবে আজিমপুর কলোনিতে বাসাটি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বরাদ্দ দেন। সেই থেকে তিনি পরিবার নিয়ে বাসাটিতে থাকছেন।’ তিনি জানান, ১৯৭২ সালে বঙ্গবন্ধুর নির্দেশে বাংলাদেশ বেতারে চাকরিও পান তিনি। ওইদিন বঙ্গবন্ধু তাকে জিজ্ঞেস করেন, “থাকবা কোথায়? বাসা আছে?”, জবাবে খুরশিদা হায়দার ‘না’-সূচক জবাব দিলে বঙ্গবন্ধু বলেন, “বাসাও পেয়ে যাবা”। ওইদিন বঙ্গবন্ধু তাকে নগদ দুই হাজার টাকাও দেন বলে জানান খুরশীদা হায়দার।
খুরশিদা হায়দার জানান, বঙ্গবন্ধুর প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী পরের বছর (১৯৭৩) জানুয়ারি মাসে আজিমপুর সরকারি কলোনিতে তাদের বাসা বরাদ্দ দেওয়া হয়। ১৯৭২ সালের মন্ত্রিপরিষদের এক সিদ্ধান্ত বলে তিনি বাসাটি বরাদ্দ পান বলে জানান তিনি।
বাসা বরাদ্দের প্রজ্ঞাপনখুরশিদা হায়দার দাবি করেন, ১৯৭২ সালের যে সিদ্ধান্ত বলে বাসা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছিল তাতে পরিষ্কার বলা আছে— সরকার কোনও বিকল্প আবাসের ব্যবস্থা না করে শহীদ পরিবারকে বাসা থেকে উচ্ছেদ করতে পারবে না। তিনি বলেন, ‘সোমবার ইচ্ছার বিরুদ্ধে, হুমকি ও চাপের মুখে, অপমান নিয়ে ৪৫ বছরের ঠিকানা থেকে উচ্ছেদ হতে হচ্ছে।’ শহীদ মহিউদ্দিনের স্ত্রী অভিযোগ করেন, বাড়ি ছাড়তে কিছুটা সময় চাইলেও তা দেওয়া হয়নি।
খুরশিদা হায়দার বলেন, ‘বঙ্গবন্ধু আমাকে চাকরি দিয়েছিলেন। বাংলাদেশ বেতারে চাকরি করেছি। আমি চাকরি থেকে অবসরে যাই ২০০৭ সালে। সেই থেকে বাসা ছাড়ার চাপ আসতে থাকে। ২০০৮ সালে বরাদ্দ বাতিল করা হয়। ওই বছর আমি উচ্চ আদালতে রিট করি। ফলে স্টে অর্ডার দেয় আদালত। আবার আমরা বসবাস করা শুরু করি।’ তিনি বলেন, ‘এরই মধ্যে স্টে অর্ডার আমাদের অজ্ঞাতসারে বাতিল করা হয়। ফলে বাড়ি ছাড়ার জন্যে সাত দিনের নোটিস জারি করা হয়।’
সরকারের নোটিশশহীদ মহিউদ্দিনের স্ত্রী জানান, ‘১৯৭২ সালে সরকারের একটি অধ্যাদেশ জারি করা হয় শহীদ পরিবারের সদস্যদের থাকার আবাসন ব্যবস্থা নিয়ে। সেই অধ্যাদেশ অনুযায়ী আমরা কলোনিতে বাসাটি পাই। কিন্তু মাথা গোঁজার ঠাঁই না দিয়েই বাসা ছাড়ার নোটিস আমার পরিবারের জন্য কষ্ট বয়ে এনেছে।’
বিষয়টি নিয়ে শহীদ মহিউদ্দিন হায়দারের ছেলে সাহেদ সদরুদ্দিন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে একটি স্ট্যাটাস দিয়েছেন। সেখানে তার পরিবারের সার্বিক অবস্থা তুলে ধরেছেন।
মহিউদ্দিন হায়দার বাংলাদেশ বেতারের রংপুর শাখায় চাকরি করতেন। তিনি কর্মরত অবস্থায় ১৯৭১ সালে শহীদ হন। স্বাধীনতার পর এই শহীদের স্ত্রী বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে দেখা করলে তাকে তাৎক্ষণিক আর্থিক সাহায্য দেন। এছাড়া তাকে চাকরি ও বাসার দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেন। পরে স্বামীর কর্মস্থল বাংলাদেশ বেতারে চাকরি ও আজিমপুর সরকারি কলোনিতে একটি বাসা বরাদ্দ পান খুরশীদা হায়দার।
শহীদ মহিউদ্দিন হায়দারের সনদএ প্রসঙ্গে গৃহায়ণ ও গণপূর্তমন্ত্রী ইঞ্জিয়ার মোশাররফ হোসেন বলেন, ‘বিষয়টি খোঁজখবর নিয়ে দেখতে হবে। এখনই কিছু বলা যাচ্ছে না।’
প্রসঙ্গত, স্বাধীনতার পর বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বাধীন সরকারের সময়ে ১৯৭২ সালের ১৪ ফেব্রুয়ারি মন্ত্রিপরিষদে সিদ্ধান্ত হয় যে, মুক্তিযুদ্ধে শহীদ কোনও কর্মচারীর পরিবারকে পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত বাড়ি থেকে উচ্ছেদ করা যাবে না। এ বিষয়ে ১৯৭৩ সালের ২৭ আগস্ট সরকারের মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ থেকে প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়।



ফেসবুক স্ট্যাটাস