‘টেকসই উৎপাদনে বেসরকারি খাত না এগোলে লক্ষ্য অর্জন সম্ভব নয়’

টেকসই উৎপাদনে বেসরকারি খাতের ভূমিকা বিষয়ক আলোচনা সভায় বক্তারা

বেসরকারি খাত যদি টেকসই উৎপাদন নিশ্চিত না করে তবে জাতিসংঘের টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা-১২ অর্জন করতে পারবে না বাংলাদেশ। কারণ বাংলাদেশের ৭৮ শতাংশ উন্নয়ন বেসরকারি খাতের মাধ্যমে আসে। কিন্তু, বেসরকারি খাতে সম্পদের ব্যবহার ও উৎপাদন প্রক্রিয়ায় পরিবেশের দূষণ ও সম্পদের অপব্যবহার হচ্ছে। সোমবার ঢাকার একটি হোটেলে ‘টেকসই ভোগ ও উৎপাদন পরিচালনা: বেসরকারি খাতের ভূমিকা’ শীর্ষক এক আলোচনায় এসব কথা বলেন বক্তারা।

অ্যাকশন এইড বাংলাদেশ,ম্যাকম ও ইউনিভার্সিটি অব লিবারেল আর্টস বাংলাদেশ (ইউল্যাব) এই আলোচনা সভার আয়োজন করে। আলোচনা সভায় সংশ্লিষ্ট সরকারি কর্মকর্তা,বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের প্রধান এবং উন্নয়ন সংস্থার প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন।

আলোচনার শুরুতেই একটি ধারণাপত্র(key note paper) উপস্থাপন করা হয়। এতে বলা হয়,দেশের অর্থনৈতিক এই প্রবৃদ্ধির মূল কারণ ব্যবসায়িক ও উৎপাদনজনিত অগ্রগতি। গত কয়েক বছরে দেশের অর্থনীতির ব্যপক উন্নতি ঘটেছে, আগামীতে আরও পরিবর্তন আসবে। তবে উন্নয়নের সঙ্গে একটি বড় চিন্তার বিষয় হলো পরিবেশগত ক্ষতি ও বিপর্যয়। আর এটি মোকাবিলায় টেকসই উৎপাদন ও ভোগ দেশের জন্য খুবই প্রয়োজনীয় একটি বিষয়।

অনুষ্ঠানের শুরুতে স্বাগত বক্তব্য দেন ইউল্যাবের ট্রাস্টি বোর্ডের বিশেষ পরামর্শক অধ্যাপক ইমরান রহমান। এরপর বক্তব্য রাখেন অ্যাকশন এইড বাংলাদেশ-এর কান্ট্রি ডিরেক্টর ফারাহ্ কবির। তিনি বলেন,‘এসডিজি একটি রাজনৈতিক দলিল। এর মধ্যে ১২ নম্বর লক্ষ্যটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এই লক্ষ্যটির মূল ভিত্তি হলো-প্রাকৃতিক সম্পদ ব্যবহারের ক্ষেত্রে টেকসইমূলক পদ্ধতি ব্যবহার করা। কিন্তু বাস্তবতা হলো,আমরা প্রাকৃতিক সম্পদ ব্যবহারের ক্ষেত্রে অনেক উদাসীন।’

আলোচনায় অংশ নিয়ে নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ বিজ্ঞান ও ব্যবস্থাপনা বিভাগের অধ্যাপক মো. আমিনুল ইসলাম অ্যাকশন এইডের একটি গবেষণা উল্লেখ করে বলেন,‘বাংলাদেশে এক ভাগ শিল্প প্রতিষ্ঠান বাড়লে পরিবেশ দূষণের মাত্রা বাড়ে প্রায় ১২ ভাগ। কারণ, শিল্পের উৎপাদন প্রক্রিয়া টেকসই বা পরিবেশবান্ধব না। ফলে আমাদের উৎপাদন প্রক্রিয়া অবশ্যই পরিবেশবান্ধব হতে হবে।’

বক্তারা বলেন,বিশ্বব্যাপী টেকসই উৎপাদন ও ভোগ নিশ্চিত করার মানদণ্ড নিয়ে এসডিজি-এর ১২ নম্বর লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। বাংলাদেশ এই লক্ষ্য অর্জনের কথা বলেছে ২০৩০ সালের মধ্যে। এই লক্ষ্য অর্জন করতে টেকসই ভোগ এবং উৎপাদনের দিকে জোর দিতে হবে। যার জন্য একটি শক্তিশালী জাতীয় কাঠামো প্রয়োজন। এজন্য সরকারি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে।

বক্তারা আরও বলেন, বাংলাদেশের ৭৮% উন্নয়ন কাজ সম্ভব হয়েছে বেসরকারি ক্ষেত্রের কল্যাণে। উৎপাদন করতে গিয়ে অবশ্যই পরিবেশের ক্ষতির বিষয়টি মাথায় রাখতে হবে যাতে পরিবেশবান্ধব উৎপাদন করা যায়। টেক্সটাইল শিল্পের কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনে বিশাল অবদান রাখছে। তবে এই খাত উৎপাদন করতে গিয়ে পানি,বায়ু এবং মাটির ক্ষতি করছে। একইসঙ্গে অনেক শিল্পকারখানা ও বেসরকারি উদ্যোগ পরিবেশগত ঝুঁকিগুলোকে উপেক্ষা করছে।

এই প্রেক্ষাপটে গ্রামীণ শক্তি-এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক সোহেল আহমেদ বলেন,শিল্প খাতের উৎপাদনে সবচেয়ে বড় ক্ষতি করে রাসায়নিক উপাদান। শিল্প খাতের জন্য বিদ্যুৎ একটি বড় উপাদান। তাই আমরা যদি সোলার বিদ্যুৎ ব্যবহার করি তাহলে সারাদেশে জ্বালানি দিয়ে উৎপাদিত বিদ্যুতের ব্যবহার অনেকাংশে কমানো সম্ভব হবে। এজন্য সচেতনতার প্রয়োজন।’

গ্রামীনফোনের টেকসই বিভাগের প্রধান আনজুম রাসনা হাসান বলেন,কাজ করতে গিয়ে আমরা দেখেছি একটি প্রতিষ্ঠান প্রথম থেকে যদি পরিবেশবান্ধব হওয়ার উদ্যোগ নেয় তবে প্রাকৃতিক সম্পদের ব্যবহার কমানো যায়।

বেসরকারি প্রতিষ্ঠান রহিম আফরোজের একসেস টু এনার্জি বিভাগের প্রধান কাজী আহমেদ ফারুক বলেন,বিদ্যুতের ব্যবহার নিয়ে অনেক কিছু করার আছে। কারণ, বর্তমান প্রযুক্তিতে বিদ্যুতের ব্যবহার অনেক কমানো সম্ভব। বিশেষ করে এলইডি প্রযুক্তি বিদ্যুত ব্যবহারের ক্ষেত্রে আমূল পরিবর্তন করতে পারে। একইসঙ্গে যদি পানির ব্যবহারও কমানো যায়।

এ বিষয়ে জাতিসংঘের উন্নয়ন বিষয়ক সংস্থার (ইউএনডিপি) সহকারি আবাসিক পরিচালক খুরশিদ আলম বলেন,‘টেকসই উৎপাদন ও ভোগ প্রচলনের জন্য প্রথমেই আমাদের চিন্তা ও আচরণে পরিবর্তন আনতে হবে। বিশেষ করে ভোক্তার সচেতনতা খুবই জরুরি। একজন ভোক্তা যদি সম্পদ ব্যবহারের ক্ষেত্রে সচেতন হন তবে পরিবেশের দূষণ অনেক কমানো সম্ভব। একইসঙ্গে যারা উৎপাদনের সঙ্গে যুক্ত তাদের পরিবেশবান্ধব হতে হবে।’

বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ম্যাকমের প্রধান নির্বাহী রাবেত খান বলেন,‘মানুষের মাথায় টেকসই উৎপাদন ও ভোগের বিষয়গুলো ঢুকিয়ে দিতে হবে। বিশেষ করে আচরণের পরিবর্তন করা দরকার। টেকসই ভোগ কেন দরকার তার ওপর গুরুত্ব দিয়ে বার্তা তৈরি করতে হবে। যার মাধ্যমে মানুষের আচরণে পরিবর্তন আনা যাবে’।