রাজধানীর মোহাম্মদপুরের শিয়া মসজিদ মোড়ে প্রতিদিন বিভিন্ন কাজ পারদর্শী ২০০ থেকে ৩০০ শ্রমিক দাঁড়িয়ে থাকেন। মোহাম্মদপুর ও আশেপাশের এলাকার মানুষ এখান থেকে কাজ অনুযায়ী শ্রমিক নিয়ে যান।
মঙ্গলবার (১ মে) সেখানে গিয়ে দেখা গেছে, শতাধিক নারী-পুরুষ রিং রোডের ফুটপাতে দাঁড়িয়ে ও বসে আছেন। এদের একজন রুমেলা বেগম (৫০)। তার গ্রামের বাড়ি ময়মনসিংহে। তিনি বাসাবাড়িতে রং ও পুডিংয়ের কাজ করেন। রুমেলা মোহাম্মদপুরের একটি বস্তিতে চার মেয়ে, একছেলে ও অসুস্থ স্বামীকে নিয়ে থাকেন। স্বামী অসুস্থ হওয়ায় তাকে কাজ করতে হচ্ছে। ২০ বছর ধরে তিনি এই পেশায় আছেন। প্রতিদিন সকালে শিয়া মসজিদের মোড়ে এসে দাঁড়ান তিনি। এখান থেকে দরদাম করে তাদের ‘কিনে’ নেওয়া হয়। মূলত মধ্যস্বত্বভোগীদের এড়ানোর জন্যই তারা লেবার মার্কেটে আসেন।
রুমেলা বলেন, ‘সর্দারের সঙ্গে কাজে গেলে ঠিক মজুরি পাই না। ৫০০ টাকা মজুরি হলে ৩০০ টাকা দেয়। বাকি টাকা সে নেয়। তাই এখানে এসে দাঁড়িয়ে নিজেই কাজ ঠিক করি।’
দেশে অন্তত ৫৪ ধরনের শ্রমিক আছেন, যারা শ্রম আইন ও দেশের কোনও শ্রমনীতিতে নেই। এর মধ্যে গৃহকাজে নিয়োজিত শ্রমিক, কুলি, মজুর, মৌসুমি শ্রমিক, কৃষি শ্রমিক, ঘাট শ্রমিক, রিকশাচালক, ভাসমান শ্রমিক, ঠিকা, ঠেলাগাড়ি শ্রমিক উল্লেখযোগ্য। এসব শ্রমিক একদিন কাজ না করলে, তাদের জীবন চলে না। দেশে এধরনের এককোটি ২০ হাজার শ্রমিক রয়েছেন। যাদের জন্য নেই কোনও নীতিমালা,তাদের জন্য ন্যূনতম মজুরি পাওয়ার বা দেওয়ার কোনও নিয়মকানুনও নেই।
বাংলা ট্রিবিউনকে বায়েজিদ জানায়, ‘আমি মূলত রাজমিস্ত্রীর সহযোগী। মাটিকাটাসহ বাসাবাড়ির বিভিন্ন কাজ করে থাকি। এখান থেকে প্রতিদিন মানুষ এসে আমাদের নিয়ে যায়। যেদিন কাজ না পাই, সেদিন বাসায় চলে যাই।’
বায়েজিদের ভাষ্য, প্রতিদিন কাজ পাওয়া যায় না। যেদিন কাজ না থাকে সেদিন আমাদের ছয় সদস্যের পরিবার চালাতে মায়ের খুব কষ্ট হয়।
বায়েজিদ বলে, ‘সর্দারের সঙ্গে আগে কাজে যেতাম। প্রতিদিন ২০০ টাকা করে দিতো। ২০০ টাকা দিয়ে সারাদিন খাটাইতো। এখন এই লেবার মার্কেটে আসি। নিজেই দরদাম করে কাজে যাই।’
লেবার মার্কেটে অনেক শ্রমিককেই দরদাম করে কাজ যেতে দেখা যায়। এখানে মধ্যস্বত্বভোগীর কোনও অস্থিত্ব নেই। তবে যারা বিভিন্ন ঠিকাদার প্রতিষ্ঠানের কাজ করেন, মাটি কাটেন ও ট্রাকে সরবরাহ করেন, তাদেরকে সর্দারের মাধ্যমে কাজে যেতে হয়। এই শ্রমিকরা কোনও উপায় না পেয়ে সর্দারদের সঙ্গে কাজে যান। কারণ, একদিন কাজ না করলে তাদের সংসার চলে না। তাদের বেঁচে থাকার জন্য ন্যূনতম প্রয়োজনটুকুও মেটাতে হয় গায়ে খেটে। শ্রমজীবী এই নিরীহ মানুষগুলো একবেলা খাবার জোটাতে ছোট্ট একটি কাজের জন্য অপেক্ষায় থাকেন। অথচ তাদের এই কাজের কোনও স্বীকৃতি নেই। প্রতিবছর মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) যে হিসাব করা হয়, তা প্রাতিষ্ঠানিক খাতের ভিত্তিতে। অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতগুলো এর আওতায় নেই।
অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতের শ্রমকে প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোতে অন্তর্ভুক্ত করার কোনও উদ্যোগও নেই সরকারের। এবিষয়ে সরকার কোনও আলোচনাও করতে চায় না বলে মন্তব্য করেছেন বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব লেবার স্টাডিজের (বিলস) নির্বাহী পরিচালক সৈয়দ সুলতান উদ্দিন আহম্মদ।
সুলতান আহম্মদ বলেন, ‘জাতীয় ন্যূনতম মজুরি ঘোষণা করলে এরা সবাই স্বীকৃতি পেতেন। তাদের কাজের ধরন অনুযায়ী পরিচয় পত্র দেওয়া যায়। ভারতে এরকম শ্রমিকদের রেশন ব্যবস্থা করা হয়েছে। যারা অসুস্থ হলেও ভাতা পান।’
এ বিষয়ে বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সিপিডির অতিরিক্ত গবেষণা পরিচালক খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম বলেন, ‘ন্যায্য মজুরি নিশ্চিত করতে সব শ্রেণির শ্রমিকদের স্বীকৃতি দেওয়া উচিৎ। নীতিমালা অনুযায়ী সব খাতের শ্রমিকরা প্রাতিষ্ঠানিক স্বীকৃতি পেলে শ্রমিকদের অধিকার নিশ্চিত হবে। এই উদ্যোগ সরকারকেই নিতে হবে।’