নজরদারি নেই অ্যাসিড সন্ত্রাসের

এসিড নিক্ষেপ‘আমি রাত সাড়ে ৯টার দিকে বাথরুমে গেছিলাম। বাথরুমের পেছন থেকে কে যেন আমার গায়ে কিছু একটা ছুড়ে মেরেছে। কী মারছে তা আমি কইতে পারি না। পরে জানছি অ্যাসিডই ছুড়ছে।’ এ কথাগুলো গৃহবধূ জোহুরা বেগমের। অন্য কোথাও নয়, নিজের বাসায় বাথরুমের মধ্যে থাকা অবস্থায় অ্যাসিড সন্ত্রাসের শিকার হয়েছেন তিনি।

নিজের এমন পরিস্থিতি হবে বিশ্বাসই করতে পারছেন না রাজধানীর কদমতলীর জুরাইন বৌ-বাজার এলাকার  বাসিন্দা গৃহবধূ জোহুরা বেগম (২৬)। কে, কেন,কী কারণে, কী উদ্দেশ্যে এই ঘটনা ঘটালো জানেন না তিনি।

রাজধানীর হাজারীবাগ ঝাউচড় এলাকার আকলিমা খাতুন (২৫)। গত ২ এপ্রিল দুর্বৃত্তের ছোড়া অ্যাসিডে ঝলসে গেছেন। সকালে বাসা থেকে মেয়ে আদিবাকে নিয়ে শাহজাহান মার্কেটের পাশ দিয়ে স্কুলে যাওয়ার সময় এক যুবক তাকে অ্যাসিড ছুড়ে মারে। এসময় আকলিমার চিৎকারে আশেপাশের লোকজন এগিয়ে এলে ওই যুবকটি পালিয়ে যায়।
ধারাবাহিক ক্যাম্পেইন আর সামাজিক প্রতিরোধের মুখে গত কয়েক বছরে অ্যাসিড সন্ত্রাস কমে আসলেও হঠাৎ করে ঘটা কয়েকটি ঘটনা শঙ্কার সৃষ্টি করেছে। প্রশ্ন উঠেছে, কেন আবারও অ্যাসিড সন্ত্রাস। অ্যাসিড ভিকটিম নিয়ে কাজ করেন যারা, তারা বলছেন— দীর্ঘদিন অ্যাসিড অপরাধ নিয়ে মনিটরিং টিমের কোনও সভা অনুষ্ঠিত না হওয়া, অ্যাসিড সংক্রান্ত মামলার বিচার না হওয়া এবং সর্বোপরি জেন্ডার বেইজড ভায়োলেন্স-এর কারণে অ্যাসিড সন্ত্রাসের ভয়াবহতা আবারও ফিরে আসতে পারে। দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া না হলে পরিস্থিতি সামলানো মুশকিল হবে বলেও মন্তব্য করেন তারা।

এদিকে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সহকারী সচিব বলেছেন, মনিটরিং সবদিক থেকেই ঠিকঠাক আছে। খুব বেশি অ্যাসিড সন্ত্রাসের দেখা মিলছে, এমন না। যা ঘটেছে সেগুলো বিচ্ছিন্ন ঘটনা। তবে গত কয়েকমাস ধরে অ্যাসিড অপরাধ নিয়ন্ত্রণে জাতীয় কমিটির সভা হয়নি বলে স্বীকার করেছেন তিনি।

নিয়মানুয়ায়ী, অ্যাসিড অপরাধ দমন আইন ২০০২ এ উল্লেখ আছে— ট্রাইব্যুনাল বিচারের জন্য মামলার নথি প্রাপ্তির তারিখ হতে নব্বই (৯০) কার্য দিবসের মধ্যে বিচারকার্য সমাপ্ত করবেন। অথচ মনিটরিং প্রতিষ্ঠানগুলো বলছে, অ্যাসিড মামলায় বিচারের হার খুবই কম। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও অ্যাসিড সারভাইভারস ফাউন্ডেশন এর হিসাব বলছে, গত ১৯ বছরে ১৯৩৪ জন নারী অ্যাসিড সন্ত্রাসের শিকার হলেও সাজা পেয়েছে মাত্র ৩৩৪ জন। তাদের মধ্যে অ্যাসিড সন্ত্রাসের মামলায় ১৪ আসামির মৃত্যুদণ্ড হলেও আজ  পর্যন্ত কারও সাজা কার্যকর হয়নি। এসময় খালাস পেয়েছেন ১৯০৮ জন আসামি।

অ্যাসিড মামলায় ন্যায়বিচার প্রাপ্তিতে যে প্রতিবন্ধকতাগুলো রয়েছে, তা চিহ্নিত করে নারী নেত্রী খুশি কবীর বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘বেশিরভাগ ক্ষেত্রে অসঙ্গতিপূর্ণ তদন্ত প্রতিবেদন, সাক্ষী, ভিকটিম এবং তার পরিবারের নিরাপত্তা না থাকায় বিচারের সময় নানা জটিলতার সৃষ্টি হয়। অনেক ক্ষেত্রে আক্রমণকারীকে শনাক্ত করতে না পারা, এমনকি বাদীপক্ষকে ট্রাইব্যুনালের ধার্য তারিখ অবহিত না করা, ইত্যাদি বাধা ন্যায়বিচার না পাওয়ার জন্য দায়ী।’

তিনি বলেন, ‘যখন আপনি বিচার চেয়ে পাবেন না, তখন ভিকটিমের মধ্যে হতাশা কাজ করে। আর বিচার হচ্ছে না দেখলে আসামিসহ অপরাধীরা বিচারের মুখোমুখি হতে হবে না ধরে নিয়েই আবারও অপরাধপ্রবণ হয়।’

ন্যাশনাল অ্যাসিড কন্ট্রোল কাউন্সিল (এনসিসি) এর সদস্য অ্যাসিড সারভাইভারস ফাউন্ডেশনের সেলিনা আহমেদ বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘এবছর ৯টি অ্যাসিড সন্ত্রাসের ঘটনা ঘটেছে। এগুলো পর পর ঘটায় বেশি মনে হলেও সার্বিকভাবে অ্যাসিড সন্ত্রাস কমেছে। সন্ত্রাস রোধে ধারাবাহিকতা থাকা জরুরি, যাতে প্রবণতা বেড়ে না যায়।’ তিন মাস পর পর অ্যাসিড নিয়ন্ত্রণ কাউন্সিলের সভা হওয়ার কথা। এই কমিটির সভা প্রায় দু’বছরেও হয়নি বলেও উল্লেখ করেন তিনি। 

এখনও অ্যাসিড সন্ত্রাস ঘটছে কেন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন,‘অ্যাসিডের সহজলভ্যতা। জেলা পর্যায়ে ব্যবহার, বিক্রি ও রক্ষণাবেক্ষণ করার কথা, যদিও তা মনিটরিং হয় না। কেউ যদি শাস্তি না পায়, সেক্ষেত্রে অপরাধ ফিরে আসে।বিচারে সাজা প্রাপ্তির হার খুবই কম। তখন অন্যরাও উৎসাহিত হয়।’

তিনি আরও বলেন, ‘তাছাড়া, জেন্ডার বেইজড ভায়োলেন্সের মূল কারণগুলো থেকে এটাকে আলাদা করার সুযোগ নেই। পুরুষতান্ত্রিক সমাজে ক্ষমতা দেখানো। ভালোবাসার প্রস্তাবে না বলবে কেন, সেটা সে মানতে চায় না। আমাদের নীরবতার সংস্কৃতি হয়েছে। নারী নিরাপত্তা নিয়ে যারা কাজ করছেন, তারা কেন ঐক্যবদ্ধ হতে পারি না। সামাজিক আন্দোলনও হচ্ছে না, ফলে সহিংসতা বাড়ছে।’

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের  সহকারী সচিব (আইন-২) তৌহিদুল আলম বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘জাতীয় অ্যাসিড নিয়ন্ত্রণ কাউন্সিলের চেয়ারম্যান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। জেলা অ্যাসিড নিয়ন্ত্রণ কাউন্সিলের সভাপতি জেলা প্রশাসক। এটা ঠিক যে, জাতীয় কমিটির সভা হয়নি দীর্ঘদিন। কারণ, সন্ত্রাসের (অ্যাসিড) পরিমাণ কমেছে। এবছর আমরা দু-একটি মামলা পেয়েছি।’ ঢাকায় সংঘটিত দু’টি ঘটনার উল্লেখ করায় তিনি বলেন, ‘আমরা এখনও অবহিত নই।’ তিনি আরও বলেন, ‘অ্যাসিড সন্ত্রাস কমেছে। অ্যাসিড কেনাবেচার মনিটরিং বেড়েছে। জাতীয় কমিটির সভা না হলেও আইন-শৃঙ্খলা সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটিতে মনিটরিংয়ের বিষয়ে আলোচনা হয়েছে।’