এবার ঈদেও সাত লাখ মানুষের ভরসা ট্রেন-বাসের ছাদ ও ট্রাক!

 

ট্রেনের ছাদে ঘরমুখী মানুষ ফাইল (ছবি: ফোকাস বাংলা)প্রতিবারই ঈদযাত্রায় কমবেশি দুর্ভোগে পড়তে হয় নগরবাসীকে। প্রতি বছরই সিডিউল বিপর্যয়, পরবিহন সংকট ও অতিরিক্ত ভাড়ার কারণে সাত-আট লাখ মানুষ ঝুঁকিপূর্ণ পরিবহনে চড়ে বাড়ি ফেরেন। ফলে সড়কে প্রায় দুর্ঘটনা ঘটে। আনন্দের ঈদযাত্রা মুহূর্তেই হয়ে ওঠে বিষাদময়। এ বছরও সে রকম পরিস্থিতি মোকাবিলার আশঙ্কা করছেন যাত্রী ও পরিবহন সংশ্লিষ্টরা। তারা বলছেন, চাহিদা অনুযায়ী পর্যাপ্ত পরিবহন না থাকায় এবার প্রায় সাত লাখ যাত্রী বাসের টিকিট পাবেন না। ফলে এবারও লঞ্চ-ট্রেন-বাসের ছাদ ও মালবাহী ট্রাকসহ বিভিন্ন ঝুঁকিপূর্ণ পরিবহনই তাদের একমাত্র ভরসা।

পরিবহন সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ঈদের ছয়দিন আগ থেকেই ঈদযাত্রা শুরু হয়। প্রতি ঈদে প্রায় ১ কোট ১৫ লাখ মানুষ ঢাকা ছাড়েন। এর মধ্যে সড়ক পথে ৬০ লাখ, নৌ-পথে ৪০ থেকে ৪২ লাখ, রেল-পথে ৬ থেকে ৭ লাখ এবং আকাশ পথে প্রায় ১ লাখ যাত্রী বাড়ি ফেরেন। এরমধ্যে বিভিন্ন রুটে বাড়ি ফেরা সড়ক পথের ৬০ লাখ যাত্রীর জন্য ২৪ হাজার নিবন্ধিত বাস রয়েছে। যার মধ্যে ৪ হাজার যান্ত্রিক ত্রুটি, যানজটে আটকা ও চালকের অসুস্থতাসহ বিভিন্ন কারণে অচল থাকে। বাকি ২০ হাজার বাসযাত্রী পারাপারের কাজে নিয়োজিত থাকে। এই ২০ হাজার বাসের মধ্যে দৈনিক ১০ হাজার বাস ঢাকা থেকে ছেড়ে যায়। বাকি ১০ হাজার ঢাকায় প্রবেশ করে। বিভিন্ন রুটে একেকটি বাস দৈনিক গড়ে দু’টি করে ট্রিপ দিতে পারে। এ হিসাবে ঢাকা থেকে ছেড়ে যাওয়া বাসের সংখ্যা দাঁড়ায় ২০ হাজার। একটি বাসে গড়ে ৪০টি করে আসন ধরা হলে আসন সংখ্যা দাঁড়ায় আট লাখ। আট লাখ আসনে দৈনিক আট লাখ যাত্রী ঢাকা ছাড়বে। এ হিসাবে ঈদযাত্রার ছয় দিনে ৪৮ লাখ যাত্রী বাস যোগে ঢাকা ছাড়বেন। এই ৬দিনের মধ্যে ঈদের আগের দিন ও রাত পরিবহন মালিকরা আরও অতিরিক্ত কিছু পরিবহন সড়কে নামাবেন। এসব পরিবহনে ওই সময় আরও অতিরিক্ত সাত লাখ যাত্রী বাড়ি ফিরবেন। ৬০ লাখ যাত্রীর মধ্যে আট লাখ যাত্রীর একলাখ যাবেন নিজের ব্যক্তিগত গাড়িতে। বাকি সাত লাখ যাত্রীর জন্য বাসের টিকিট বা আসন নেই। এই আট লাখ যাত্রীর শেষ ভরসা লঞ্চ, ট্রেন কিংবা বাসের ছাদ, মালবাহী ট্রাক, লেগুনাসহ অন্যান্য ঝুঁকিপূর্ণ যানবাহন।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে বাংলাদেশ যাত্রীকল্যাণ সমিতির মহাসচিব মোজাম্মেল হক চৌধুরী বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘ঈদযাত্রায় এককোটি ১৫ লাখ মানুষ ঢাকা থেকে বাড়ি ফিরেন। এরমধ্যে প্রায় ৬০ লাখ মানুষ যান সড়ক পড়ে। কিন্তু ওই সময় যে পরিমাণ যাত্রীর চাপ রয়েছে, সে পরিমাণ পরিবহন নেই। প্রতিবছর প্রায় আট থেকে ১০ লাখ মানুষ টিকিট না পেয়ে ট্রেন ও বাসের ছাদ, মালবাহিনী ট্রাকসহ বিভিন্ন ঝুঁকিপূর্ণ পরিবহনে বাড়ি ফেরেন। এর ফলে সড়কে মৃত্যুর মিছিল লেগেই থাকে। এই বিষয়টি নিয়ে আগামী ৩০ মে আমরা একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করবো।’

সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, ট্রেন-বাসের ছাদ ও ট্রাকে যাত্রী বহন আইনত নিষিদ্ধ।এরপরও অপেক্ষাকৃত কম ভাড়া ও পরিবহনের টিকিট না পওয়ার কারণে শেষ পর্যন্ত ঘরে ফেরা মানুষ চেপে বসেন ট্রেন-বাসের ছাদ ও ট্রাকসহ ঝুঁকিপূর্ণ পরিবহনে। ফলে প্রায় ঘটে দুর্ঘটনা।

জানতে চাইলে বাস-ট্রাক ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিবিটিওএ) সভাপতি ফারুক তালুকদার সোহেল বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘আসলে যাত্রী পরিবহনের জন্য কী পরিমাণ বাস রয়েছে, তা আমরা সঠিকভাবে বলতে পারবো না। এমন কোনও পরিসংখ্যান আমাদের মালিকদের কাছে নেই। এমনকী বিআরটিও দিতে পারবে না। কারণ কোনও বাস মালিক সড়কে নতুন বাস নামালে সঙ্গে সঙ্গে তা আমাদের জানান না। আবার তার একটি বাস অকেজো হলে কিংবা টার্মিনালে ফেলে রাখলেও তিনি আমাদের কোনও তথ্য দেন না। এ কারণে পরিবহন ও যাত্রীর সংখ্যা বিবেচনায় আমরা সঠিক কোনও তথ্য জানাতে পারছি না। তবে আমরা বলতে পারি, আমাদের ঈদ উৎসবকেন্দ্রিক ৬-৭দিন যাত্রীর প্রচুর চাপ থাকে। আমরা সামলাতেও হিমসিম খাই। যাত্রীর চাপে টিকিট দিতে পারি না। কারণ তখন পরিবহন সংকট দেখা দেয়। আর এটা সত্য—কোনও বাস মালিক বছরে দু’টি উৎসবের জন্য কয়েকটা বাস কিনে ফেলে রাখবে না। সে কারণেই টিকিট না পেয়ে যে যেভাবে খুশি, সেভাবে বাড়ি যাওয়ার চেষ্টা করে। কেউ যেন এমন কাজ করতে না পারে, সে বিষয়ে আমরা সতর্ক রয়েছি।’

বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন মালিক সমিতি মশিউর রহমান রাঙ্গার সঙ্গে যোগাযোগ করলে তিনি ব্যস্ততার কারণ দেখিয়ে কোনও কথা বলতে রাজি হননি।

যাত্রী অধিকার আন্দোলনের মুখপাত্র মাহমুদুল হাসান শাকুরী বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘সড়কে চাপ কমাতে সড়ক ব্যবস্থাপনার পাশাপাশি রেল ও নৌ-পথ ব্যবস্থাপনাকে আরও গতিশীল করতে হবে। একইসঙ্গে দুর্ঘটনা রোধে  ট্রেন-বাসের ছাদ ও ট্রাকে যাত্রী বহন বন্ধ করতে হবে। আইন অমান্যকারীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির আওতায় আনতে হবে। সাধারণ যাত্রীদের নিরাপদ যাত্রা নিশ্চিত করতে পর্যাপ্ত পরিবহনের ব্যবস্থা করার পাশাপাশি  বিআরটিএকে সক্রিয় হতে হবে।’