হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের দুই নম্বর টার্মিনাল দিয়ে রবিবার রাত ১০টার কিছু আগে বেরিয়ে আসেন ২৯ জন নারী শ্রমিক, যারা দিন বদলের স্বপ্ন নিয়ে সৌদি আরবের বিভিন্ন জায়গায় গৃহকর্মী হিসেবে কাজ করতে গিয়েছিলেন। কিন্তু সেখানে নানান লাঞ্ছনা-নির্যাতনের শিকার হয়ে শেষমেশ শূন্যহাতে দেশে ফিরেছেন; সঙ্গে এনেছেন প্লাস্টিকের ব্যাগে ভরা দুমড়ানো-মুচড়ানো কিছু কাপড়। দেশে ফেরা এই ২৯ নারী গৃহশ্রমিকেরই একজন নার্গিস আক্তার।
এয়ার এরাবিয়ার একটি ফ্লাইটে দেশে ফেরা নার্গিস আক্তার কথা বললেও বাকিরা কথা বলতে রাজি হননি প্রথমে। এর কারণ হিসেবে ভিড়ের মধ্য থেকে একজন জানান, নির্যাতিত হওয়ার কথা জানতে পারলে পরিবারের সদস্যরা ঘরে উঠতে দেবে না। এরপর অনেকটা সমস্বরে অনেকে আর্তনাদ করে ওঠেন, ‘সৌদি আরবে নারী গৃহশ্রমিক পাঠানো বন্ধ করুন, দয়া করে।’
নাম-পরিচয় গোপন রাখা হবে জানালে নার্গিস আক্তার জানান, তাকে খাবার দেওয়া হতো না ঠিকমতো, মাস শেষে তিনি বেতনটাও পাননি। দেশে কথা বলতে চাইলে কফিল তাকে মারধর করতো। এখনও ডিপোর্ট সেন্টারে তার মতো আরও অনেক বাংলাদেশি নারী শ্রমিক রয়েছেন বলেও জানান তিনি।
নার্গিস আক্তার বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘খাইতে দেয় না, বেতন দেয় না। বেতন চাইলে মারধর করে। দেশে কথা বলতে চাইলেও মারে। মালিক পাসপোর্ট রাইখা দিসে। বেতন না দেওয়ায় খালি হাতে আসছি।’
প্রায় একই অভিযোগ করেন শরিফা (ছদ্মনাম) নামে দেশে ফেরা আরও এক নারী গৃহশ্রমিক। তিনি বলেন, ‘কাজের সন্ধানে পাঁচ মাস আগে সৌদি আরবে গিয়েছিলাম। সংসারে সুদিন ফেরাবো, এই আশা ছিল মনে। কিন্তু কিসের কি, মাঝখান দিয়ে টাকা নষ্ট হলো এতোগুলা, আর বিনিময়ে জুটলো নির্যাতন!’
তিনি আরও জানান, মাসে এক হাজার রিয়াল বেতন দেওয়ার চুক্তিতে গিয়েছিলেন। কিন্তু সৌদি আরবে গিয়ে জানলেন বেতন মিলবে ৮০০ রিয়াল। তাও মেনে নিয়েছিলেন। লাঞ্ছনা-নির্যাতন সহ্য করে কাজ করেছেন। অথচ, মাস শেষে বেতন না পাওয়ায় খালি হাতে ফিরতে বাধ্য হয়েছেন।
সৌদি ফেরত আরও কয়েকজনের সঙ্গে আলাপে জানা যায়, দেশে ফেরার অপেক্ষায় জেদ্দার ডিপোর্ট সেন্টারে তাদের মতো কয়েকশ’ বাংলাদেশি নারী আছেন। এরমধ্যে কেউ কেউ ২-৩ বছর ধরে সেখানে আছেন। কারণ, তাদের কফিল তাদের নামে মামলা করেছে। মামলা নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত তারা দেশে ফিরতে পারবেন না।
ফিরে আসা নারী শ্রমিকরা আরও জানান, প্রতিদিনই রিয়াদ এবং জেদ্দার সেফহোমে ২-৩ জন করে নারী গৃহশ্রমিক আশ্রয় নিতে আসেন। এখনও জেদ্দার সেফহোমে একশ’র মতো নারী আছেন। এরমধ্যে অনেকে আবার মানসিকভাবে বিপর্যস্ত।
মনোয়ারা (ছদ্মনাম) দীর্ঘ আড়াই বছর ছিলেন রিয়াদে। তিনি বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘অনেক অত্যাচার করতো কফিল। সেখান থেইকা পালায় দূতাবাসে আশ্রয় নিসি। ১১ মাসের বেতন পাই, রাইখা আইসা পড়সি। দেশে আসার আগে সফর জেলে ছিলাম এক সপ্তাহ।’
এর আগে গত ১৯ মে সৌদি আরব থেকে দেশে ফেরেন ৬৬ জন নারী শ্রমিক। হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের প্রবাসী কল্যাণ ডেস্ক থেকে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, গত ৩ মে ৩৫ জন, ১২ মে ২৭ জন, ১৯ মে ৬৬ জন, ২৩ মে ২১ জন এবং ২৭ মে ৪০ জন নারী শ্রমিক দেশে ফিরেছেন। ব্র্যাক মাইগ্রেশন প্রোগ্রামের আবেদনের ভিত্তিতে বিভিন্ন সময়ে দেশে ফিরিয়ে আনা হয়েছে ৮০ জন নারী শ্রমিককে। রবিবার রাতে ফেরত আসা ২৯ জন নারী শ্রমিকের মধ্যে ৪ জন ব্র্যাক মাইগ্রেশন প্রোগ্রামের আবেদনের প্রেক্ষিতে দেশে এসেছেন।
ব্র্যাক মাইগ্রেশন প্রোগ্রামের তথ্য কর্মকর্তা আল আমিন নয়ন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘ব্র্যাকের আবেদনের ভিত্তিতে ৪ জন নারী শ্রমিক দেশে ফিরেছেন। তাদের সঙ্গে আরও ২৫ জন ছিলেন বলে জানতে পেরেছি।’
তিনি আরও বলেন, ‘দেশে ফিরে আসা নারী শ্রমিকদের আমরা আবাসন থেকে শুরু করে খাবার-চিকিৎসাসহ নানা বিষয়ে সহায়তা দিয়ে থাকি। আবার কেউ অভিযোগ করতে চাইলেও আমরা তার আবেদন যথাযথ কর্তৃপক্ষের কাছে পৌঁছে দিই।’
উল্লেখ্য, দারিদ্র্য বিমোচন এবং কর্মক্ষেত্র স্বল্পতার কারণে নারীরা বেছে নেন অভিবাসন ব্যবস্থা। নিজের ভাগ্য পরিবর্তন করতে দেশ ছেড়ে পাড়ি জমান সুদূর সৌদি আরব, আরব আমিরাত, কুয়েত, ওমান, কাতার, বাহরাইন, লেবাননসহ বিশ্বের ১৮টি দেশে। জনশক্তি, কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর (বিএমইটি) দেওয়া তথ্যমতে, ২০১৭ সালে অভিবাসী নারীর সংখ্যা ছিল ১২ লাখ ১৯ হাজার ৯২৫ জন, যা মোট অভিবাসীর সংখ্যার ১৩ শতাংশ। এ সংখ্যা এযাবৎকালের মধ্যে সবচেয়ে বেশি।
১৯৯১ থেকে ২০০৩ সাল পর্যন্ত একা অভিবাসন প্রত্যাশী নারী শ্রমিককে অভিবাসনে বাধা দেওয়া হলেও ২০০৩ এবং ২০০৬ সালে এ প্রবণতা কিছুটা শিথিল করা হয়। ২০০৪ সালের পর থেকে ২০১৩ সাল পর্যন্ত নারী শ্রমিকের অভিবাসন হার ক্রমাগত বাড়তে থাকে। ২০১৫ সালে এ সংখ্যা দাঁড়ায় মোট অভিবাসনের ১৯ শতাংশে। কিন্তু এই হার অন্যান্য দেশের তুলনায় অনেক কম।