বৃহস্পতিবার (২৮ জুন) মাদকমুক্ত সমাজ আয়োজিত ‘দক্ষিণ এশিয়ার অবৈধ মাদক এবং বাংলাদেশের জন্য চ্যালেঞ্জ’ শীর্ষক আলোচনা সভায় বক্তারা এসব কথা বলেন। রাজধানীর মহাখালী এলাকার ‘রাওয়া হল’-এ সভাটি অনুষ্ঠিত হয়। বিভিন্ন স্কুল-কলেজের ছাত্রছাত্রী, শিক্ষক, স্থানীয় বাসিন্দা ও বিশিষ্টজনরা এতে অংশগ্রহণ করেন।
আলোচনা সভার শুরুতে ‘কি নোট’ উপস্থাপন করেন নর্থসাউথ ইউনিভারসিটির প্রফেসর ড. এমদাদুল হক। ‘কি নোট’ উপস্থাপনা ছাড়াও তিনি সাধারণ শিক্ষার্থীদের মাদক সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তর দেন।
বাংলাদেশে মাদকের অন্যতম কারণ কায়েমি স্বার্থবাদ। এর কারণেই বিভিন্ন দেশ থেকে বাংলাদেশে মাদক প্রবেশ করছে। আর মাদকের এই বিস্তার ঘটেছে বলে মন্তব্য করেছেন সভার প্রধান অতিথি ও তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা ড. আকবর আলি খান। তিনি বলেন, ‘আমাদের দেশে মাদক বিস্তারের পেছনে রয়েছে কায়েমি স্বার্থবাদ। এটা উঁচু থেকে নিচু পর্যন্ত রয়েছে।’
অনুষ্ঠানে সাধারণ শিক্ষার্থীদের বিভিন্ন প্রশ্নের জবাবে নিজের বক্তব্যে আকবর আলি খান বলেন, ‘ছাত্ররা চাচ্ছে রাতারাতি মাদক সমস্যার সমাধান হোক। কিন্তু এটা রাতারাতি সমাধান সম্ভব হবে না। তবে আন্তরিকতার সঙ্গে চেষ্টা করে যেতে হবে, একসময় সফল হবো। শত বছর ধরে চলা সমস্যার সমাধান রাতারাতি সম্ভব হবে না।’
আকবর আলি খান বলেন, ‘মাদকের ভয়াল থাবা থেকে সমাজকে মুক্ত করার জন্য সরকারি উদ্যোগই যথেষ্ট নয়। এর সমাধানে পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপ প্রয়োজন। এই পার্টনারশিপের মাধ্যমে মাদকবিরোধী সচেতনতা গড়ে তুলতে হবে। তাহলেই মাদকমুক্ত সমাজ গঠন করা সম্ভব হবে।’
বাংলাদেশে একদিকে ইয়াবা, অন্যদিক থেকে ফেনসিডিল প্রবেশ করছে। এতে বিদেশি স্বার্থ জড়িত রয়েছে। সমস্যা সমাধানে দুটি পর্যায়ের কথা উল্লেখ করেন সভার প্রধান অতিথি। আকবর আলি খান বলেন, ‘প্রথমে তা সমাধানের জন্য রাষ্ট্রপ্রধান পর্যায়ে আলোচনা করে তা সমাধানের পথ বের করতে হবে। দুই, সরকার কর্তৃপক্ষকে ঢেলে সাজাতে হবে। সর্ষের ভেতরে ভূত রয়েছে। এই ভূত নিয়ে মাদকমুক্ত দেশ গড়া যাবে না। প্রশাসনকে ঢেলে সাজাতে হবে।’
চলমান মাদকবিরোধী অভিযানকে স্বাগত জানিয়ে তিনি বলেন, ‘আমরা এ অভিযানকে স্বাগত জানাই। কিন্তু কিছু সন্ত্রাসী মেরে ফেললেই সমস্যার সমাধান হবে না। ভূতমুক্ত প্রশাসন গঠন করতে হবে। নইলে এসব অভিযান কিছু ঘটনা হিসেবে থাকা ছাড়া আর কিছুই থাকবে না। পুলিশ ও বিচার ব্যবস্থাকে ঢেলে সাজানো দরকার। এ বিষয়ে সরকারি-বেসরকারি আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে।’
কারও জন্য আইন কঠোর আর কারও জন্য আইন নমনীয় না করে সব মাদক ব্যবসায়ীর বিরুদ্ধে কঠোরভাবে আইনের ব্যবহার নিশ্চিত করার আহ্বান জানান বাংলাদেশের পুলিশের সাবেক ইন্সপেক্টর জেনারেল এনামুল হক। তিনি বলেন, ‘মাদকবিরোধী অভিযানে আইনের ব্যবহার দুই রকম করা যাবে না। খুচরা বা ছোট পর্যায়ের ব্যবসায়ীদের জন্য এক ধরনের ব্যবস্থা আর গডফাদারদের জন্য নমনীয় ব্যবস্থা, এটা হতে পারে না। মাদক ব্যবসা সঙ্গে জড়িত সবার বিরুদ্ধে কঠোরভাবে আইনের সমান ব্যবহার করতে হবে।’
সীমান্তে চোরাচালান বন্ধের পাশাপাশি মাদক প্রবেশ স্থায়ীভাবে বন্ধ করতে হবে বলে মন্তব্য করেন সাবেক এই পুলিশ প্রধান। তিনি বলেন, ‘বর্ডার ব্যবস্থায় স্মাগলিং বন্ধ করলেই হবে না। সীমান্ত এমনভাবে বন্ধ করতে হবে, যাতে মাদক কোনোভাবেই প্রবেশ করতে না পারে। এ ব্যাপারে আরও কঠোর হতে হবে।’
মাদক ব্যবসার সঙ্গে জড়িত ছোট ব্যবসায়ীদের ধরে কোনও লাভ হবে না বলে মন্তব্য করেছেন জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের সাবেক চেয়ারম্যান ড. মিজানুর রহমান। তিনি বলেন, ‘ছোটদের ধরে কোনও লাভ হবে না। ছোটদের ধরবেন আর গডফাদাররা হজে যাবে, তা তো হবে না।’
বিচার ব্যবস্থা ও পুলিশের ওপর জনগণের আস্থা নেই। দুর্নীতিগ্রস্ত পুলিশি ব্যবস্থার ওপর নির্ভর করে মাদকবিরোধী অভিযান ও মাদক ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে কী ব্যবস্থা নেওয়া যাবে তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে বলে জানিয়েছেন মিজানুর রহমান। দুর্নীতিগ্রস্ত তদন্ত সংস্থার মাধ্যমে মাদক বন্ধ সম্ভব নয় বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন অবসরপ্রাপ্ত মেজর জেনারেল এএমএসএ আমিন।
এর আগে বৃহস্পতিবার সকাল ৯টায় মহাখালীতে মাদকমুক্ত সমাজ, বাংলাদেশ আয়োজিত মাদকবিরোধী র্যালি অনুষ্ঠিত হয়েছে। সকাল ৯টার দিকে ‘রাওয়া হল’ থেকে জাহাঙ্গীর গেট মোড় পর্যন্ত এ র্যালি অনুষ্ঠিত হয়। র্যালিতে আদমজি ক্যান্টনমেন্ট কলেজ ও বাংলাদেশ ইন্টারন্যাশনাল স্কুল অ্যান্ড কলেজসহ বিভিন্ন স্কুল-কলেজের শিক্ষক-শিক্ষার্থী, আমন্ত্রিত অতিথি এবং স্থানীয় বাসিন্দারা উপস্থিত ছিলেন।
আরও পড়ুন: মহাখালীতে মাদকমুক্ত সমাজের উদ্যোগে মাদকবিরোধী র্যালি