জাতীয় সংসদে বাজেট পাসের আগে এর বিভিন্ন দিক নিয়ে শেষ দিনের আলোচনা করেন সংসদ সদস্যরা। এসময় প্রস্তাবিত বাজেটের ওপর ৫৯টি মঞ্জুরি দাবির বিপরীতে ৪৪৮টি ছাঁটাই প্রস্তাব আনা হয়। পরে সরকার ও বিরোধী দলের হুইপের মধ্যে সমঝোতা অনুযায়ী ৫টি মঞ্জুরি দাবি আলোচনার সিদ্ধান্ত হয়। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, স্থানীয় সরকার, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণসহ বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ে দেওয়া বরাদ্দের ওপরে ছাঁটাই প্রস্তাবের আলোচনায় অংশ নেন জাতীয় পার্টির মো. ফখরুল ইমাম, কাজী ফিরোজ রশীদ, নূরুল ইসলাম ওমর, মোহাম্মদ আব্দুল মুনিম চৌধুরী, নূরুল ইসলাম মিলন, সেলিম উদ্দিন ও বেগম রওশন আরা মান্নান এবং স্বতন্ত্র সদস্য ডা. রুস্তম আলী ফরাজী।
বৃহস্পতিবার সকালে শুরু হওয়া সংসদ অধিবেশনে সভাপতিত্ব করেন স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরী। সংসদ নেতা ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং বিরোধী দলীয় নেতা রওশন এরশাদসহ সরকারী বিরোধী দলের অধিকাংশ সদস্যের উপস্থিতিতে অধিবেশনে প্রস্তাবিত বাজেটের ওপর ছাঁটাই প্রস্তাবের আলোচনা হয়। তবে শেষ পর্যন্ত কোনও খাতেই বরাদ্দ ছাঁটাই করা হয়নি।
শিক্ষা মন্ত্রণালয়: শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে বিপুল বরাদ্দের বিরোধিতা করে বিরোধী দল ও স্বতন্ত্র সংসদ সদস্যরা বলেছেন, শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের ব্যাপক অনিয়ম-দুর্নীতি চলছে। আড়াই লাখ থেকে ৫ লাখ টাকায় জিপিএ-৫ বিক্রি হচ্ছে। বিভিন্ন সময়ে প্রশ্নপত্র ফাঁস হতে দেখা গেছে। কোচিং ব্যবসা এখনও চলছে। আর এমপিওভুক্ত না করায় সংসদ সদস্যরা প্রায়ই নানা প্রশ্নের মুখোমুখি হচ্ছেন। এই কারণে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের বাজেট বরাদ্দ কমিয়ে এই মন্ত্রণালয়ে এক টাকা দেওয়ার প্রস্তাব করেন বিরোধী দলের সংসদ সদস্যরা।
এর জবাবে শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ বলেন, শিক্ষাকে যুগোপযোগী করতে সুদূরপ্রসারী লক্ষ্য নিয়ে আমরা এগুচ্ছি। শিক্ষার মান অবশ্যই বৃদ্ধি পেয়েছে। জিপিএ-৫ বিক্রির কথা সঠিক নয়। একটি অভিযোগের ভিত্তিতে এটা বলা হয়েছে। এই অভিযোগ আসার পর তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। আর প্রশ্নপত্র ফাঁসের বিরুদ্ধে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। কোচিং বাণিজ্যের সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। বরং মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করতে তিনি বাজেট বরাদ্দ আরও বাড়ানোর দাবি জানান।
প্রসঙ্গত এবারের বাজেটে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ে ২২ হাজার ৪৬৬ কোটি ২০ লাখ ৫৬ হাজার টাকা এবং মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগে ২৪ হাজার ৮৯৬ কোটি ১৭ লাখ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়।
স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়: স্বাস্থ্যখাতে বরাদ্দের বিরুদ্ধে ছাঁটাই প্রস্তাব দিয়ে বিরোধী দল জাতীয় পার্টির সংসদ সদস্যরা অভিযোগ করেন, স্বাস্থ্যসেবা মৌলিক অধিকার হলেও সেই অধিকার সবাই পাচ্ছে না। প্রত্যন্ত এলাকার সুচিকিৎসা নেই। সরকার চিকিৎসক দিলেও তারা এলাকায় থাকেন না। অনেক স্থানেই আধুনিক যন্ত্রপাতি নেই। আবার বেসরকারি মেডিক্যাল কলেজগুলো রমরমা ব্যবসা করছে। অযোগ্য লোকদের দ্বারা অবৈধ ভাবে গড়ে ওঠা ক্লিনিক ও ডায়াগনিস্টিক সেন্টার বাণিজ্য করছে। অথচ এই খাতে বরাদ্দ খুবই কম। তারা বলেন, সবার জন্য স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে হলে জাতীয় স্বাস্থ্যনীতি প্রণয়ন করতে হবে। যার ভিত্তিতে স্বাস্থ্য সেবা কর্মপরিকল্পনা প্রণয়ন করতে হবে। গরিব ও নিম্নবিত্তদের জন্য স্বাস্থ্যবীমা চালুর দাবি জানান তারা।
জবাবে স্বাস্থ্যমন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিম স্বাস্থ্যখাতে ব্যাপক উন্নয়ন হয়েছে দাবি করে বলেন, লাখ লাখ রোহিঙ্গাদের স্বাস্থ্য সেবা প্রদানের মাধ্যমে আমাদের এই খাতে সক্ষমতার বিষয়টি বিশ্ববাসীকে দেখিয়েছি। কমিউনিটি ক্লিনিকের মাধ্যমে জনগণের দোড়গোড়ায় স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দেওয়া হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঠিক দিক নির্দেশনার কারণেই এটা সম্ভব হয়েছে।
বেসরকারি মেডিক্যাল কলেজের বিরুদ্ধে অভিযোগ আমলে নিয়ে তিনি আরও বলেন, বেসরকারি মেডিক্যাল কলেজগুলোর বিরুদ্ধে অভিযোগ দীর্ঘদিনের। অনেক কলেজের বিরুদ্ধে আমরা ব্যবস্থা নিয়েছিলাম। কিন্তু আদালতের নির্দেশনা নিয়ে অনেক প্রতিষ্ঠান পরিচালিত হচ্ছে। এখানে আমাদের কিছু করণীয় নেই। সম্পদের সীমাবদ্ধতা থাকার পরও বিশ্বের অনেক দেশ থেকে বাংলাদেশ স্বাস্থ্যসেবায় এগিয়ে আছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
প্রসঙ্গত নতুন অর্থবছরের বাজেটে স্বাস্থ্যসেবা খাতে ১৮ হাজার ১৬৬ কোটি ৩১ লাখ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে।
স্থানীয় সরকার বিভাগ: স্থানীয় সরকার বিভাগ খাতে বরাদ্দের বিরুদ্ধে ছাঁটাই প্রস্তাব এনে বিরোধী দলীয় সংসদ সদস্যরা বলেন, এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়। যে মন্ত্রণালয়ের সফলতার ওপর জনগণের ভোট নির্ভর করে। কিন্তু মন্ত্রণালয়টি কাঙ্ক্ষিত ভূমিকা পালন করতে পারছে না।
তারা অভিযোগ করেন, স্থানীয় উন্নয়নে সুষম বণ্টন নেই। দেশের অনেকস্থানেই রাস্তা-ঘাট ধ্বংসের পথে। হাওর ও পাহাড় অঞ্চলের সড়কের অবস্থা খুবই খারাপ। দক্ষতার অভাবে অনেক রাস্তা নির্মাণের পরেই নষ্ট হয়ে যাচ্ছে, আবার দীর্ঘদিনেও ঠিকাদাররা কাজ শেষ করছে না। জেলা পরিষদে এডিবি’র বরাদ্দ খরচ করতে পারে না। ইউনিয়ন পর্যায়ে স্থানীয় সরকারের কোনও কর্মকাণ্ড পরিচালিত হয় না। অর্থ বরাদ্দের আগে সারাদেশেই সুষম উন্নয়নের বিষয়টি নিশ্চিত করতে হবে।
জবাবে স্থানীয় সরকার মন্ত্রী খন্দকার মোশাররফ হোসেন বলেন, স্থানীয় সরকার উন্নয়নমুখী বিভাগ। নগর ও গ্রামীণ এলাকার অবকাঠামো উন্নয়ন করা হয় এই বিভাগের মাধ্যমে। জনগণের চাহিদার পরিপ্রেক্ষিতে প্রকল্প গ্রহণ করা হয়। প্রত্যেকটা গ্রামকে যোগাযোগের আওতা আনতে প্রকল্প বাস্তবায়ন হচ্ছে। তিনি বলেন, সুষম বণ্টন নিয়ে অনেকেই অভিযোগ করেছেন। কিন্তু প্রকল্প প্রণয়নের ক্ষেত্রে আমরা বিষয়টি বিবেচনা করে থাকি। যে এমপিদের এলাকা বেশি তাদের বেশি বরাদ্দ দেওয়া হয়। সারাদেশে সড়কের পাশাপাশি পৌর শহরে ড্রেনেজ ব্যবস্থার উন্নয়নে পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। নগরে জলাবদ্ধতা কমে এসেছে। তিনি আরও বলেন, ৩ লাখ ২১ হাজার ৪৬২ কিলোমিটারের ওপরে আমাদের রাস্তা রয়েছে। ধারণ ক্ষমতার বাইরে লোড পড়লেই এসব রাস্তা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। কীভাবে লোড নিয়ন্ত্রণ করা যায়, সেবিষয়ে সতর্ক রয়েছি। গ্রামীণ অবকাঠামো উন্নয়নের মাধ্যমেই সারাদেশকে উন্নয়ন-সমৃদ্ধির পথে নিয়ে যাওয়া সম্ভব হবে। তাই সংসদ সদস্যদের দাবি অনুযায়ী বরাদ্দ বাড়ানোর জন্য অর্থমন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণ করেন তিনি।
উল্লেখ্য, ২০১৮-১৯ অর্থবছরে স্থানীয় সরকার বিভাগে ২৯ হাজার ১৫৩ কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে।
দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়: দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের জন্য বাজেটে দেওয়া বরাদ্দের ওপর ছাঁটাই প্রস্তাব এনে মন্ত্রণালয়টির কার্যক্রমের কঠোর সমালোচনা করেন বিরোধী দলীয় সংসদ সদস্যরা। তারা বলেন, দেশ দুর্যোগের ঝুঁকিতে রয়েছে। এবিষয়ে প্রস্তুতি নেওয়ার দায়িত্ব এই মন্ত্রণালয়ের। কিন্তু কী প্রস্তুতি রয়েছে? বরং বরাদ্দ ব্যয়ে নানা অনিয়ম রয়েছে। বৈষম্যও করা হয়। মন্ত্রণালয় থেকে সোলার দেওয়া হচ্ছে, যা কোনও কাজে আসে না। তাই সরকারের শেষ সময়ে এসে বিষয়গুলো বিবেচনায় নিতে হবে। অবকাঠামো উন্নয়নে বিশেষ গুরুত্ব দিতে হবে। এই মন্ত্রণালয়ে দেওয়া বরাদ্দ কমানোর দাবিও জানান বিরোধী দলীয় সদস্যরা।
জবাবে এসব অভিযোগ অস্বীকার করে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় সরকার যথেষ্ট ব্যবস্থা নিয়েছে বলে দাবি করেন দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণমন্ত্রী মোফাজ্জল হোসেন চৌধুরী মায়া। বরং এ খাতে আরও বরাদ্দ দাবি করেন তিনি।
উল্লেখ্য, নতুন অর্থ বছরের বাজেটে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে ৯ হাজার ৬৫৮ কোটি ৫১ লাখ ২৩ হাজার টাকা।
ছাঁটাই প্রস্তাবের ওপর আলোচনা শেষে অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত নির্দিষ্টকরণ বিল সংসদে উত্থাপন করেন। এই বিল পাসের মধ্য দিয়ে ২০১৮-১৯ অর্থ বছরের নতুন বাজেট পাস হয়ে যায়।
আরও পড়ুন:
'আমাকে বারবার বিব্রত করবেন না'