এশিয়া–প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের দেশগুলোর মধ্যে মোট জিডিপির সঙ্গে আয়কর ঘাটতিতে শীর্ষ অবস্থানে রয়েছে বাংলাদেশ। সম্প্রতি প্রকাশিত ‘ইকোনোমিক অ্যান্ড সোশ্যাল সার্ভে অব এশিয়া অ্যান্ড দ্য প্যাসিফিক-২০১৮’ শীর্ষক প্রতিবেদনে বলা হয়, এই পার্থক্য সাড়ে সাত শতাংশ। বাংলাদেশের পরে এই অঞ্চলে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ পার্থক্য ভুটানের। তাদের রাজস্ব আয় ও জিডিপির পার্থক্য ৬.৭ শতাংশ। এরপর আফগানিস্তানের ৬ শতাংশ। সর্বনিম্ন পার্থক্য মালয়েশিয়ার (১.৩%)।
বাণিজ্য বিশ্লেষকদের দাবি, বাংলাদেশের এই অবস্থানের জন্য মূলত দুর্বল প্রশাসন ও সংকীর্ণ ট্যাক্স নেট দায়ী। করের হার কমানোর ক্ষেত্রে ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠানগুলোর লবিং আর ট্যাক্স দুর্নীতিও এর জন্য দায়ী বলে মনে করেন তারা। ‘ইকোনোমিক অ্যান্ড সোশ্যাল কমিশন ফর এশিয়া অ্যান্ড দ্য প্যাসিফিক’ এর করা এই প্রতিবেদনে বলা হয়, এ অঞ্চলের ১৭টি দেশে প্রয়োজনের তুলনায় কম কর সংগ্রহ করা হয়।
সেন্টার ফর পলিসি ডায়লগের পরিচালক গোলাম মোয়াজ্জেম বলেন, ‘বাংলাদেশে কর সংগ্রহের প্রক্রিয়া আসলে সীমিত। এটা মূলত ব্যক্তিগত ও ভ্যাটের ওপর নির্ভরশীল।’ তিনি বলেন, ‘প্রশাসনিক দক্ষতার অভাব ও দুর্বলতার কারণে এই পরিসর বাড়ানো সম্ভব হয় না। এছাড়া, করের হার কমাতে ব্যবসায়ীদের লবিংয়ের কারণে বিষয়টি আরও কঠিন হয়ে যায়। ফলে কর থেকে রাজস্ব কম আসে।’
গোলাম মোয়াজ্জেম আরও বলেন, ‘ট্যাক্স বা কর নিয়ে জনগণের অবস্থান নেতিবাচক। তারা সরকারি সেবায় অসন্তুষ্ট। ফলে তারা কর দিতে চায় না।’ নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক ব্যবসায়ীও প্রশাসনকে দায়ী করেন। তিনি বলেন, ‘ট্যাক্স দেওয়ার মতো আয় থাকলেও অনেকে দিতে চায় না। এজন্য সরকারি হয়রানি ও দুর্নীতিই দায়ী। সময়সাপেক্ষ ও অদ্ভূত প্রক্রিয়ায় আয়কর দেওয়ার উৎসাহ হারিয়ে ফেলেন সাধারণ মানুষেরা।’
সংস্কার ও সহজ প্রক্রিয়া প্রয়োজন
বিশেষজ্ঞরা জানান, ট্যাক্স আইনের সংস্কার প্রয়োজন। স্বয়ংক্রিয় ও সহজ পদ্ধতিতে যেন আয়কর দেওয়া যায়, সেই প্রযুক্তির ব্যবহার জরুরি। পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের নির্বাহী পরিচালক আহসান এইচ মনসুর বলেন, ‘বাংলাদেশের অর্থনীতি এগিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু আমরা কর দেওয়ার ব্যাপারে তেমন আগ্রহ দেখতে পাই না। শুধুমাত্র মূল্য সংযোজন কর বা ভ্যাট দেয় জনগণ। আর আয়কর প্রক্রিয়ার আধুনিকায়ন ছাড়া এই আ্য় বাড়বেও না, বরং কমে যাবে।’
জাতীয় রাজস্ব ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী, ২০১৮ সালের জুনের মধ্যে ৩৫ লাখ টিনধারী (ট্যাক্স আইডেন্টিফিকেশন নাম্বার) থাকলেও আয়কর দিচ্ছেন মাত্র ১৯ লাখ ৫০ হাজার জন।
সিপিডির পরিচালক মোয়াজ্জেম হোসেন বলেন, ‘মোট জিডিপিতে রাজস্ব আয় বাড়াতে সরকারকে ট্যাক্স নেট বা পরিধির আওতায় থাকা সবার জন্য আয়কর দেওয়া বাধ্যতামূলক করতে হবে। কর দেওয়ার মতো হোক বা না হোক, ট্যাক্স রিটার্ন যেন সবাই জমা দেয়, সেটা নিশ্চিত করতে হবে।’ তিনি আরও বলেন, ‘আয়কর সংগ্রহে প্রশাসনের আরও লজিস্টিক সাপোর্ট বাড়ানো প্রয়োজন। অনলাইন পেমেন্ট ব্যবস্থা চালু করলে অনেকে হয়রানি ও দুর্নীতি থেকে মুক্তি পাবেন এবং কর দিতে উৎসাহী হবেন।’ তিনি বলেন, ‘যদি করপোরেট ট্যাক্স সরকার কমিয়ে নিয়ে আসে, তাহলে অনেকে বিষয়টি না এড়িয়ে কর দিতে চাইবে। ফলে রাজস্ব আয় অনেক বেড়ে যাবে।’
বাংলাদেশ রফতানিকারক সংস্থার প্রেসিডেন্ট আব্দুস সালাম মুর্শেদী ট্যাক্সের পরিধি বাড়ানোর কথা বলেছেন। তিনি বলেন, ‘সব ব্যবসার জন্যই লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড তৈরি করা জরুরি। কিন্তু আয়করের বৈষম্য এত বেশি যে, অনেকেই এটা এড়িয়ে যেতে চায়।’
অন্যান্য ব্যবসায়ীরাও জাতীয় রাজস্ব ব্যুরোকে আহ্বান জানান, যেন দুর্নীতিগ্রস্ত কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়। ঘুষ নিয়ে যেসব সরকারি কর্মকর্তারা আয়কর এড়াতে ব্যবসায়ীদের সুযোগ করে দিচ্ছেন, তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ারও আহ্বান জানান তারা।
রাজস্ব আয়ের টার্গেট অর্জন সম্ভব
২০১৭ অর্থবছরে জিডিপিতে রাজস্বের হার ছিল ৯ দশমিক ১ শতাংশ। বাজেট অনুযায়ী হওয়ার কথা ছিল ১১ দশমিক ৬ শতাংশ। ২০১৯ অর্থবছরকে সামনে রেখে সরকারের লক্ষ্য ৩ লাখ ৫ হাজার ৯২৮ কোটি রাজস্ব আয়, যা জিডিপির ১২ দশমিক ২ শতাংশ। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডকে বলা হয়েছে— ২০১৮ অর্থবছরের চেয়ে ৩২ শতাংশ বাড়ানোর লক্ষ্য নির্ধারণ করতে। এতে করে আয়কর সংগ্রহ করতে হচ্ছে ২ লাখ ৯৬ হাজার ২০১ কোটি টাকা, যা জিডিপির ১১ দশমিক ৭ শতাংশ।
অর্থমন্ত্রী এমএ মুহিত বলেছেন, তিনি আত্মবিশ্বাসী যে, আয়কর সংগ্রহ আরও বাড়বে। আর তাদের আয়কর নির্ধারণের লক্ষ্যও বাস্তব। বাজেট বিষয়ক বক্তব্যে তিনি বলেছিলেন, ‘জাতীয় রাজস্ববোর্ডে ব্যাপক পরিবর্তন আনা হবে। জনবল ও কৌশলগত পরিবর্তন আনার লক্ষ্যে ইতোমধ্যে কাজ শুরু হয়ে গেছে।’ তিনি দাবি করেন, ‘বতর্মান ট্যাক্স পরিস্থিতি সন্তোষজনক। এখন যে গতিতে রাজস্ব আয় বাড়ছে, তাতে আমাদের লক্ষ্য বাস্তবসম্মত ও অজর্ন সম্ভব। ’
২০১৯ অর্থবছরে সরকারের লক্ষ্য ২০১৮ অর্থবছর থেকে ৩০ দশমিক ৮ শতাংশ রাজস্ব বাড়িয়ে ৭৯ হাজার ৮২৬ কোটি টাকা আয় করা। তবে সেন্টার ফর পলিসি ডায়লগ মনে করে, লক্ষ্য অর্জনের জন্য ৪০ শতাংশ প্রবৃদ্ধি প্রয়োজন।
সৌজন্য: ঢাকা ট্রিবিউন