সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের মধ্যে বেঁচে আছে অবিন্তার স্বপ্ন

অবিন্তা কবির ফাউন্ডেশন স্কুলের শিক্ষার্থীরারাজধানীর ভাটারার অবিন্তা কবির ফাউন্ডেশন স্কুলের প্রথম শ্রেণিতে পড়তো হোসনা আক্তার। কিছুদিন পর তার মা-বাবা তাকে নিয়ে নেত্রকোনায় গ্রামের বাড়িতে বসবাসের জন্য চলে যান। কিন্তু সেখানে গিয়ে স্কুলের জন্য কান্নাকাটি শুরু করে শিশুটি। একপর্যায়ে মা-বাবা বাধ্য হন ঢাকায় ফিরে এসে হোসনাকে ওই স্কুলে ভর্তি করতে।

হোসনা আক্তারের মতো অসংখ্য শিশুকে রীতিমতো মন্ত্রমুগ্ধ করে রেখেছে অবিন্তা কবির ফাউন্ডেশন স্কুল। ঝড়বৃষ্টি মাথায় নিয়ে, অসুখ বিসুখ উপেক্ষা করে শিশুরা ছুটে আসে স্কুলটিতে। এক বছর আগে চালু হওয়া স্কুলটির শিক্ষাব্যবস্থা শিশুদের কাছে প্রিয় হয়ে উঠেছে, অভিভাবকরাও সেখানে তাদের সন্তানদের ভর্তি করে সন্তুষ্ট।

সমাজের সুবিধাবঞ্চিত ও দরিদ্র পরিবারের শিশুরাই এ স্কুলের শিক্ষার্থী। তাদের কাছে শুধু শিক্ষার আলো পৌঁছে দেওয়াই নয়, মানবিক মানুষ হওয়ারও পথ দেখাচ্ছে প্রতিষ্ঠানটি।

অবিন্তা কবির ফাউন্ডেশন স্কুলের শিক্ষার্থীরাগুলশানের হলি আর্টিজান রেস্তোরাঁয় ২০১৬ সালের ১ জুলাই জঙ্গি হামলায় নিহত হন অবিন্তা কবির। পরে তার নামে গঠিত অবিন্তা কবির ফাউন্ডেশনের উদ্যোগে ২০১৭ সালে ভাটারায় সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের জন্য যাত্রা শুরু করে অবিন্তা কবির ফাউন্ডেশন স্কুল। প্রি-কিন্ডারগার্টেন থেকে দ্বিতীয় শ্রেণি পর্যন্ত স্কুলটিতে শিক্ষার্থীদের পাঠদান দেওয়া হয়।

স্কুলটিতে গিয়ে দেখা গেছে, প্রতিটি শ্রেণিকক্ষের দেয়াল উজ্জ্বল রঙে রঙিন। তাতে সাঁটানো শিশুদের আঁকা ছবি। রয়েছে ছোট্ট লাইব্রেরি, কম্পিউটার ল্যাব। লাইব্রেরিতে দেশি-বিদেশি লেখকদের শিশুতোষ বই। এছাড়াও খেলার জন্য রয়েছে আলাদা কক্ষ। স্কুলের দেয়ালে অবিন্তা কবিরের বিভিন্ন বয়সে আঁকা ছবি এবং তার সমাজসেবামূলক কাজের ছবি।

স্কুলটির প্রশাসনিক কর্মকর্তা থমাস মিন্টু। তার সঙ্গে কথা হয় শনিবার দুপুরে। তিনি স্কুলটি ঘুরিয়ে দেখান। মিন্টু বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘প্রি-গার্ডেন, কিন্ডারগার্টেন, প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণি পর্যন্ত স্কুলটিতে পড়ানো হয়। ২০১৯ সাল থেকে তৃতীয় শ্রেণি পর্যন্ত করা হবে। প্রতিবছর একটি করে শ্রেণি বাড়ানো হবে। এখন যারা আমাদের এখানে দ্বিতীয় শ্রেণিতে পড়ছে, তাদেরই আমরা তৃতীয় শ্রেণিতে ভর্তি করবো। কারণ, এই শিক্ষার্থীরা এই স্কুলের পাঠ গ্রহণে অভ্যস্ত হয়েছে। আমরা শিশুদের এভাবে গড়ে তুলবো।’ স্কুলটিকে দশম শ্রেণি পর্যন্ত করার উদ্যোগ রয়েছে।

অবিন্তা কবির

তিনি আরও বলেন, ‘স্কুলটিতে এই এলাকার (ভাটারা) দরিদ্র ও সুবিধাবঞ্চিত মেয়েশিশুরা পড়ালেখা করে। প্রতিটি শ্রেণিতে ১৬ জন করে শিক্ষার্থী ভর্তি করা হয়। বর্তমানে ৬৪ জন শিক্ষার্থী রয়েছে। স্কুলে আমরা শিশুদের প্রতিদিন খাবারের আয়োজন করি। মাসে একবার তাদের স্বাস্থ্য পরীক্ষা করা হয়। চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী পুষ্টিগুণ বিবেচনায় শিশুদের খাবার সরবরাহ করি।’

প্রতি শনিবার স্কুলে ধর্মীয় শিক্ষা দেওয়া হয় শিশুদের। এদিন একজন শিক্ষক শিশুদের আরবি পড়ান। অন্য ধর্মের শিক্ষার্থীদেরও তাদের ধর্মীয় শিক্ষার ব্যবস্থা করা হয় বলে জানান থমাস মিন্টু।

বয়স এক বছর হলেও ইতোমধ্যে এলাকায় বেশ পরিচিতি পেয়েছে অবিন্তা কবির ফাউন্ডেশন স্কুল। কোমলমতি শিশুদের সম্পূর্ণ বিনা খরচে লেখাপড়ার পাশাপাশি শিক্ষা উপকরণও দেওয়া হয় এখান থেকে। ছয়জন শিক্ষক শ্রেণিকক্ষে শিশুদের পাঠদান দিয়ে থাকেন।

ফাউন্ডেশনের শিক্ষা অফিসার ও স্কুলের প্রধান শিক্ষিকা মালিহা আহসান। তিনি বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘অবিন্তা কবির ফাউন্ডেশন স্কুলটির অসাধারণ যাত্রায় আমি একজন গর্বিত কর্মী। এই যাত্রা অসাধারণ। পরিকল্পনা অনুযায়ী আমাদের শিক্ষকরা শিশুদের যত্নশীল পাঠদান করে থাকেন। গত এক বছর ধরে স্কুলটি ব্যাপকভাবে বিকশিত হয়েছে এবং শিক্ষার্থীদের উন্নততর একাডেমিক সাফল্যের পাশাপাশি তাদের উন্নত যোগাযোগ দক্ষতা বৃদ্ধিতে ভূমিকা রাখছে এই স্কুল। এখানের শিক্ষার্থীরা আস্থা সহকারে মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারে। তাদের ভালো অভ্যাসগুলোর চর্চা বাড়ছে। তারা খাবার আগে এখন নিজে হাত ধুয়ে নেয়, অন্যকে হাত ধোয়ার ক্ষেত্রে উৎসাহ দেয়।’

36478219_10209157363410927_6105949129760833536_nতিনি আরও বলেন, ‘শিশুদের জন্য এমন একটি স্কুলের স্বপ্ন ছিল অবিন্তা কবিরের। দরিদ্র শিশুরা আধুনিক একটি স্কুল পেলে তারা তাদের প্রতিভা দেখাতে পারে। এই স্কুলে শিশুদের ভালো মানুষ হিসেবে গড়ে তুলতে সহায়তা করছে।’

 মালিহা আহসান বলেন, ‘অবিন্তা কবির পাঁচটি মূল বিষয়ের ওপর আস্থা রেখে সব কাজ করতেন। সেগুলো হচ্ছে–বিশ্বাস, দৃঢ়তা, কৃতজ্ঞতা, সম্মান এবং উন্মুক্ততা। আমরা আমাদের শিক্ষার্থীদের এ মন্ত্রে উজ্জীবিত করি। আমরা শিক্ষার্থীদের ভালো মানুষ হওয়ার গুরুত্ব শেখাই। এছাড়াও নৈতিকতা ও মূল্যবোধের জন্য বিশেষ শ্রেণিভুক্ত শিক্ষা স্কুলপর্যায়ে রয়েছে। শিক্ষকেরা এই নৈতিকতা অনুশীলন করার জন্য শিক্ষার্থীদের বিভিন্ন সুযোগ দিতে চেষ্টা করেন। আমরা আশা করছি শিক্ষার্থীদের শেখানো এই মূল্যবোধ ও নৈতিকতা জাতি গঠনে ভূমিকা রাখবে।’

স্কুলটিতে সন্তানদের ভর্তি করতে পেরে অভিভাবকরাও খুশি। প্রথম শ্রেণির শিক্ষার্থী ইলা মনি। তার বাবা আক্তারুজ্জামান ভাটারা এলাকার একজন চায়ের দোকানি। টং দোকানে চা বিক্রি করেন। তার চার মেয়ের মধ্যে ইলা মনি তৃতীয়। ইলা মনিকে এই স্কুলে গত বছর ভর্তি করান আক্তারুজ্জামান। তিনি বলেন, ‘আমার মেয়েকে এলাকার একজন ওই স্কুলে নিয়ে ভর্তি করিয়ে দিয়েছেন। তিনি বলছিলেন এখানে মেয়ে ভর্তি করালে তার কথা একদিন মনে করতে হবে। ঠিক তা-ই হয়েছে। স্কুলটি এত ভালো, এখন আমি তার কথা মনে করি।’

অবিন্তা কবির ফাউন্ডেশন স্কুলের শিক্ষার্থীরা

তিনি আরও বলেন, ‘আমার বড় দুই মেয়েও এই মেয়ের (ইলা মনি) সঙ্গে লেখাপড়ায় পারে না। সে মাঝে মধ্যে এত সুন্দর করে কথা বলে, আমরা তাকিয়ে থাকি। স্কুলের শিক্ষকরা খুব ভালো। স্কুলে কোনও খরচ না হলেও আমার বাসা একটু দূরে, তাই যাতায়াতে একটু খরচ হয়। তবে তাতে আমার কোনও অপত্তি নেই।’ স্কুলের পরিবেশও খুব সুন্দর বলে তিনি মন্তব করেন।

স্কুলটির প্রি-কিন্ডারগার্টেনে পড়ে ঝর্ণা আক্তার নামের এক শিশু। তার বাবা রিকশাচালক হুমায়ুন আহমেদ। দুই মেয়ে ও এক ছেলের মধ্যে ঝর্ণা আক্তার দ্বিতীয়। নিজে লেখাপড়া করতে পারেননি বলে মেয়েকে লেখাপড়া করাতে চান হুমায়ুন। তাই এলাকার একজনের মাধ্যমে এ বছর এই স্কুলে ঝর্ণাকে ভর্তি করিয়েছেন। ঝর্ণার মা আয়েশা বেগম বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘টাকা পয়সা খরচ করেও এত ভালো স্কুলে ভর্তি করাতে পারতাম না। মেয়ে লেখাপড়া খুব ভালো শিখছে। স্কুলের ম্যাডামরাও খুব ভালো। স্কুল সব খরচ বহন করে। আমি মেয়েকে এই স্কুলে দিতে পেরে খুশি।’

অবিন্তা কবির ফাউন্ডেশনের কো-অর্ডিনেটর শরিফুল ইসলাম। তিনি বলেন, ‘অবিন্তা সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের জন্য কাজ করতেন। শিশুর শিক্ষার অধিকার নিশ্চিত করতে তার প্রচেষ্টা ছিল। বেঁচে থাকলে তিনি নিজেই এই সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের পাশে দাঁড়াতেন। তার স্বপ্ন বাস্তবায়নে অবিন্তা কবির ফাউন্ডেশন কাজ করে যাচ্ছে। আমরা শিশুদের পাঠ্যবইয়ের শিক্ষার পাশাপাশি নৈতিক ও মানবিক শিক্ষা দিচ্ছি।’

তিনি আরও বলেন, ‘শিশুরা জ্বর নিয়েও স্কুলে চলে আসে। তারা এখানে এসে আনন্দ পায়। আমরা আনন্দের সঙ্গে তাদের শিক্ষা দিতে পেরেছি।’

তিনি বলেন, ‘প্রথম শ্রেণির শিক্ষার্থী ছিল হোসনা আক্তার নামের এক শিশু। তার পরিবার ঢাকা থেকে নেত্রকোনায় চলে যায়। শিশুটি বাড়িতে গিয়ে স্কুলের কথা মনে করে কান্নাকাটি করতে থাকে। এরপর তার বাবা-মা ফের তাকে ঢাকায় নিয়ে আসতে বাধ্য হন।’ স্কুলটির শিক্ষকরা সবাই উচ্চতর যোগ্যতাসম্পন্ন বলে জানান তিনি।

অবিন্তা কবির ফাউন্ডেশন স্কুলের শিক্ষার্থীরা

২০১৭ সালের ৬ জুলাই অবিন্তা কবির ফাউন্ডেশনের উদ্যোগে ভাটারায় এই মডেল স্কুলের উদ্বোধন করেন ঢাকায় নিযুক্ত যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত মার্শা বার্নিকাট।

নাটোরেও ফাউন্ডেশনের পাঁচটি স্কুল যাত্রা শুরু করেছিল। তবে তা বিভিন্ন সীমাবদ্ধতার কারণে বন্ধ করে দেওয়া হয়। আগামীতে পরিকল্পনা করে আরও স্কুল শুরু করার পরিকল্পনা রয়েছে এই ফাউন্ডেশনের।

২০১৬ সালের ১ জুলাই জঙ্গি হামলায় হলি আর্টিজানে ১৭ বিদেশিসহ ২০ জন নিহত হন। তাদের একজন বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত মার্কিন নাগরিক অবিন্তা কবির। তিনি যুক্তরাষ্ট্রেই থাকতেন। দেশে বেড়াতে এসে নৃশংস ওই হত্যাকাণ্ডের শিকার হন তিনি। পরে তার স্মরণে প্রতিষ্ঠা করা হয় অবিন্তা কবির ফাউন্ডেশন।

স্কুল প্রতিষ্ঠা ছাড়াও এ ফাউন্ডেশনের পৃষ্ঠপোষকতায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা ইনস্টিটিউটে একটি অত্যাধুনিক সাইবার সেন্টার ও আর্কাইভ স্থাপন করা হয়েছে। এখানে অনলাইনে আর্ট সংশ্লিষ্ট সব বই আর্কাইভ করা হয়।

36408611_10209160429447576_6244198650935771136_n

দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বন্যা, জলোচ্ছ্বাসের সময় দুর্গত মানুষের পাশেও দাঁড়ায় অবিন্তা ফাউন্ডেশন। শরিফুল ইসলাম বলেন, ‘সিরাজগঞ্জে বন্যাদুর্গতদের মধ্যে খাবার বিতরণ করা হয়েছে। উত্তরাঞ্চলে শীতার্তদের কম্বল দেওয়া হয়েছে। ৩০০ জন এসিডদগ্ধকে দুই বছরের জন্য ব্যবহার উপযোগী ‘প্রেসার গার্মেন্টস’ দেওয়া হয়েছে।’

এছাড়াও ‘অবিন্তা গ্যালারি ফাইন আর্টস’ নামে একটি গ্যালারি করা হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের ইমোরি ইউনিভার্সিটির অক্সফোর্ড কলেজের শিক্ষার্থী ছিলেন অবিন্তা কবির। তার নির্মম মৃত্যুর পর এই বিশ্ববিদ্যালয় অবিন্তার নামে শিক্ষাবৃত্তি চালু করেছে। বৃত্তি দেওয়ার ক্ষেত্রে বাঙালি ও বাংলাদেশিদের অগ্রাধিকার দেওয়া হয়। বাংলাদেশি কাউকে সেখানে পাওয়া না গেলে দক্ষিণ এশিয়ার শিক্ষার্থীদের অগ্রাধিকার দেওয়া হয় বলেও জানিয়েছেন শরিফুল ইসলাম। এই বৃত্তির আওতায় অক্সফোর্ড কলেজের টিউশন ফি, বাসস্থানসহ আনুষঙ্গিক খরচ বহন করবে অবিন্তা কবির ফাউন্ডেশন। ২০১৭ সালে ভারতের হায়দরাবাদের মোহাম্মদ সায়েদ নামে এক শিক্ষার্থী ওই বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এই বৃত্তি পেয়েছেন।