মাদকবিরোধী অভিযানে এ পর্যন্ত সারাদেশে মাদক ব্যবসায়ী ও মাদকসেবীসহ প্রায় ২২ হাজার ব্যক্তিকে গ্রেফতার করা হয়েছে। মামলা হয়েছে প্রায় ১৫ হাজার।
পুলিশ ও র্যাব সদর দফতর সূত্র অনুযায়ী, গত ৪ মে থেকে ২৪ জুন পর্যন্ত এ অভিযানে র্যাবের সঙ্গে ‘বন্দুকযুদ্ধে’ ৩৫ জন, পুলিশের সঙ্গে ৮৪ জন এবং মাদক ব্যবসায়ীদের দু’পক্ষের ‘বন্দুকযুদ্ধে’ মারা গেছে ৩৫ জন। তবে বাংলা ট্রিবিউন প্রতিনিধিদের পাঠানো সংবাদের তথ্য অনুযায়ী, গত ৪ মে থেকে ২৪ জুন পর্যন্ত ১৭৮ জন মারা গেছেন।
সূত্র জানায়, গত ৩ জুন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা মাদকের বিরুদ্ধে সামাজিক আন্দোলন গড়ে তোলার আহ্বান জানান। এরপরই মাদক পাচার ও বেচাকেনা বন্ধে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ছাড়াও অন্যান্য মন্ত্রণালয় ও সংস্থা বেশ কিছু উদ্যোগ আর সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এরমধ্যে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সুরক্ষা বিভাগের পক্ষ থেকে সীমান্ত পথে সব ধরনের মাদকের অবৈধ প্রবেশ ও পাচার এবং দেশের ভেতরে মাদকের অবৈধ উৎপাদন, সরবরাহ ও সহজলভ্যতার বিলোপ সাধন করতে হবে। মাদক অপরাধের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তি, তাদের মদতদাতা, সাহায্যকারী ও অর্থলগ্নিকারীদের গ্রেফতার এবং যথাযথ তদন্ত ও বিচারের মাধ্যমে শাস্তির ব্যবস্থাসহ মাদক বিক্রি থেকে উপার্জন করা অর্থ-সম্পদ রাষ্ট্রের অনুকূলে বাজেয়াপ্ত এবং এ সংক্রান্তে মানিলন্ডারিং আইন ২০১২ (২০১৫ সালে সংশোধিত)-এর যথাযথ প্রয়োগ নিশ্চিত করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
ওষুধ উৎপাদন, চিকিৎসা, শিল্পকারখানা ও বৈজ্ঞানিক গবেষণায় ব্যবহৃত বিভিন্ন কেমিক্যাল ও মাদক জাতীয় কাঁচামাল যাতে বৈধ ক্ষেত্র থেকে কালোবাজারে পাচার হয়ে অবৈধ মাদক উৎপাদনে বা মাদক হিসেবে ব্যবহৃত হতে না পারে সেই পরিপূর্ণ নিশ্চয়তা বিধানেরও উদ্যোগ নিয়েছে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। সমাজের সবস্তরে ও পেশায় মাদকবিরোধী সচেতনতা ও সামাজিক উদ্বুদ্ধকরণ নিশ্চিত করা এবং মাদকদ্রব্যের চোরাচালান ও অপব্যবহারের বিরুদ্ধে একটি ব্যাপক সামাজিক আন্দোলন গড়ে তোলার কাজে সহায়তা দেবে মন্ত্রণালয়।
এছাড়া মাদকদ্রব্যের চাহিদা, সরবরাহ ও ক্ষতি কমানো সংক্রান্ত কাজে নিয়োজিত বিভিন্ন আইন প্রয়োগকারী সংস্থা, প্রশাসন, বিচার ব্যবস্থা, হাসপাতাল, সরকারি-বেসরকারি সংস্থাসহ সংশ্লিষ্ট সবার কাজের মধ্যে পারস্পরিক যোগাযোগ ও সমন্বয় করবে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক দায়িত্বশীল কর্মকর্তা বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘মাদকাসক্ত ব্যক্তিদের চিকিৎসা ও পুনর্বাসন ছাড়াও মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতরকে ড্রাগ এনফোর্সমেন্ট এজেন্সি হিসেবে রূপান্তরের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। পরীক্ষামূলক প্রকল্প হিসেবে দেশের প্রতিটি বিভাগের একটি উপজেলাকে মাদকমুক্ত করার জন্য বিভাগীয় কমিশনারের নেতৃত্বে সব বাহিনী ও স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের সমন্বয়ে কমিটি গঠন করা হবে। চিকিৎসা শেষে মাদকাসক্তদের পুনর্বাসনে সমাজকল্যাণ, যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয় আর মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে বৃত্তিমূলক প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা থাকবে। এটিকে একটি সামাজিক আন্দোলনে রূপ দেওয়ার লক্ষ্যে ব্যাপক প্রচার কার্যক্রম চালানো হবে।’
ওই কর্মকর্তার ভাষ্য, ‘মাদকের বিরুদ্ধে সামাজিক আন্দোলন গড়ে তোলা ও বাস্তবায়নে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ থেকে সব মন্ত্রণালয় ও বিভাগের সচিব বরাবর চিঠি পাঠানো হবে। এজন্য সংশ্লিষ্ট জেলা প্রশাসনের একজন অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক সার্বিক দায়িত্ব পাবেন। তিনি জেলার উদ্যমী ও পরিশ্রমী উপ-পরিচালক, সহকারী পরিচালক, পরিদর্শক ও সহকারী পরিদর্শক নিয়োগ করবেন। দেশের প্রতিটি ইউনিয়নের জন্য একজন কর্মকর্তাকে সমন্বয়কারী কর্মকর্তা হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হবে। এছাড়া নিয়মিত ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনার দায়িত্বে থাকবেন দুইজন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট। এই পাইলট কর্মসূচির মেয়াদ ছয় মাস হতে পারে। তারপর অন্যান্য উপজেলায় এটি রেপ্লিকেট করা হতে পারে।’
জানা গেছে, যেকোনও সরকারি, স্বায়ত্তশাসিত, আধা-স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানে চাকরির জন্য গঠিত মেডিকেল ফিটনেস পরীক্ষায় মাদকাসক্তির টেস্ট চালু করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। ব্যাংক, বীমা ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানে অন্যান্য বেসরকারি চাকরির ক্ষেত্রেও পর্যায়ক্রমে এ পদ্ধতি চালুর পরামর্শ দেওয়া হয়েছে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের প্রস্তাবে।
মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতর থেকে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদফতরের মহাপরিচালক বরাবর দেওয়া চিঠিতে উল্লেখ করা হয়েছে—মাদক অপরাধ দমন সরকারের একটি অগ্রাধিকারমূলক কাজ। মাদকের অবাধ বিস্তাররোধ ও অপব্যবহারের বিরুদ্ধে আইনের যথাযথ প্রয়োগের পাশাপাশি পারিবারিক, ধর্মীয় ও সামাজিক মূল্যবোধকে জাগ্রত করতে হবে। মাদকের বিরুদ্ধে ব্যাপক সামাজিক আন্দোলন গড়ে তোলার জন্য মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদফতরের বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তাদের নির্দেশনা দেওয়ার জন্য অনুরোধ জানানো হয় ওই চিঠিতে।
মাদকের বিরুদ্ধে সামাজিক আন্দোলন প্রসঙ্গে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতরের মহাপরিচালক মো. জামাল উদ্দীন আহমেদ বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘মাদকের বিরুদ্ধে প্রচার-প্রচারণার জন্য জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে যেসব কমিটি আছে সেগুলোকে আমরা সক্রিয় করছি। এছাড়া দেশের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ২৭ হাজার কমিটি গঠন করেছি। সেগুলোকেও সক্রিয় করার চেষ্টা চলছে। যাতে তাদের মাধ্যমে আমরা মাদকের বিরুদ্ধে একটি সামাজিক আন্দোলন শুরু করতে পারি।’
অধিদফতরের মহাপরিচালক আরও বলেন, ‘মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতরকে আরও শক্তিশালী করার জন্য লোকবল বাড়ানো হচ্ছে। নতুন আইন করা হচ্ছে। আমরা নতুন নতুন যন্ত্রপাতি নিচ্ছি। ইতোমধ্যে সরকারের কাছ থেকে ৫০টি গাড়ি কেনার অনুমতি পেয়েছি।’