রাজশাহী, বরিশাল ও সিলেট সিটি করপোরশেনে ভোট সোমবার (৩০ জুলাই)। দেশের এ তিন বিভাগীয় শহরে চির প্রতিদ্বন্দ্বী নৌকা ও ধানের শীষের মধ্যে মূল লড়াই হবে বলেই ধারণা করা হচ্ছে। আগামী ডিসেম্বরে অনুষ্ঠেয় একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে এটি হচ্ছে সর্বশেষ বড় নির্বাচন। এজন্য এ সিটি নির্বাচনকে সরকার, নির্বাচন কমিশন ও রাজনৈতিক দলের জন্য জাতীয় নির্বাচনের মহড়া বা ট্রায়াল হিসেবে দেখছেন বিশেষজ্ঞরা।
নির্বাচনকে ঘিরে টানটান উত্তেজনা বিরাজ করছে তিন সিটি এলাকায়। উদ্বেগ-উৎকণ্ঠাও রয়েছে স্থানীয়দের মধ্যে। তবে অবাধ, সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ পরিবেশে ভোটাররা যাতে তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারেন সেজন্য নির্বাচন কমিশন (ইসি) এরই মধ্যে সব প্রস্তুতি শেষ করেছে। প্রধান নির্বাচন কমিশনার জাতীয় নির্বাচনের আগে অনুষ্ঠেয় এই নির্বাচনকে তাদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ বলে আখ্যায়িত করেছেন। তিন সিটির প্রতিটি কেন্দ্রে এরই মধ্যে ব্যালট পেপার, ব্যালট বাক্সসহ নির্বাচনি সামগ্রী নিয়ে নির্বাচনি কর্মকর্তাসহ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা অবস্থান করছেন।
সকাল ৮টা থেকে বিকাল ৪টা পর্যন্ত টানা ভোট নেওয়া হবে। তিন সিটির ৮ লাখ ৮২ হাজার ভোটার ভোটাধিকার প্রয়োগ করে তাদের আলাদা নগরপিতা নির্বাচিত করবেন।
নির্বাচন কমিশনের রেওয়াজ অনুযায়ী ভোটের দিন সংশ্লিষ্ট এলাকাগুলোয় সাধারণ ছুটি ঘোষণা করা হয়েছে।
নির্বাচনে ভোটাররা যাতে নির্বিঘ্নে তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারেন, সেজন্য কমিশন সবকিছু করবে উল্লেখ করে ইসি সচিবালয়ের সচিব হেলালুদ্দীন আহমদ বলেন, ‘সুষ্ঠু নির্বাচনের সব প্রস্তুতি গ্রহণ করা হয়েছে। ভোটাররা যাতে নির্বিঘ্নে ভোটকেন্দ্রে গিয়ে ভোট দিতে পারেন তা নিশ্চিত করা হবে।’ নির্বাচনে কোনও ধরনের অনিয়ম বা নির্বাচনি কর্মকর্তাদের কোনও ধরনের শৈথিল্য বরদাস্ত করা হবে না বলেও হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেন ইসি সচিব।
সুজন সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদার বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘নির্বাচন নিয়ে অনেকের মাঝে উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা বিরাজ করছে। গণমাধ্যম হচ্ছে নির্বাচনের সহায়ক শক্তি, অথচ তাদের দায়িত্ব পালনে বাধার অভিযোগ আসছে। এগুলো সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের অন্তরায়।’
সাবেক নির্বাচন কমিশনার মো. শাহনেওয়াজ বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘জাতীয় নির্বাচনের আগে অনুষ্ঠেয় এই নির্বাচন সত্যিই সবার জন্য গুরুত্বপূর্ণ। নির্বাচন কমিশনের জন্যও এটি অগ্নিপরীক্ষা। কারণ, নির্বাচন সুষ্ঠু ও সুন্দর করতে পারলে তাদের প্রতি সবার আস্থা আরও বাড়বে।’
এক প্রশ্নের জবাবে সাবেক এই কমিশনার বলেন, ‘স্থানীয় সরকার নির্বাচনকে জাতীয় নির্বাচনের সঙ্গে মেলানোর সুযোগ নেই। তবে দলীয় প্রতীকে অনুষ্ঠিত হওয়ায় নির্বাচনটি একটু ভিন্ন মেজাজ অবশ্যই পাবে। এক্ষেত্রে এটাকে এক অর্থে জাতীয় নির্বাচনের ট্রায়ালও বলা যেতে পারে।’
নির্বাচন উপলক্ষ্যে সিটি এলাকায় নিরাপত্তা ব্যবস্থা কঠোর করা হয়েছে। নির্বাচনের নিরাপত্তায় শনিবার (২৮ জুলাই) থেকেই সিটির প্রতিটি ওয়ার্ডে র্যা বের একটি টিম এবং প্রতি দুই ওয়ার্ডে এক প্লাটুন করে বিজিবি সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে। এছাড়া বিজিবি রিজার্ভ রাখা হয়েছে। এ হিসাবে তিন সিটিতে র্যাবের ৮৭ টিম ও ১১ প্লাটুন রিজার্ভসহ ৫৫ প্লাটুন বিজিবি নির্বাচনি দায়িত্ব পালন করবে। নির্বাচনের পরদিন মঙ্গলবার পর্যন্ত নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকবে তারা।
তিন সিটিতে মেয়র পদে ১৯ জন, সাধারণ কাউন্সিলর পদে ৩৭৮ জন ও সংরক্ষিত কাউন্সিলর পদে ১৪৯ জন প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। তাদের মধ্যে বরিশালে তিনজন সাধারণ কাউন্সিলর ও একজন নারী কাউন্সিলর বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় জয়ী হয়েছেন।
একনজরে রাজশাহী সিটি করপোরেশন
রাজশাহী সিটি করপোরেশন নির্বাচনে মেয়র পদে পাঁচজন, সাধারণ কাউন্সিলর পদে ১৬০ জন ও সংরক্ষিত নারী কাউন্সিলর পদে ৫২ জন প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন।
এ সিটিতে আওয়ামী লীগ ও বিএনপির পাশাপাশি বাংলাদেশ জাতীয় পার্টি ও ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের প্রার্থী মাঠে রয়েছেন। এর বাইরে একজন স্বতন্ত্র প্রার্থীও প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন।
এ সিটিতে আওয়ামী লীগের এএইচএম খায়রুজ্জামান লিটন ও বিএনপির মোহাম্মদ মোসাদ্দেক হোসেন বুলবুলের মধ্যে মূল লড়াই হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
৩০টি ওয়ার্ড নিয়ে গঠিত এই সিটিতে মোট ভোটার সংখ্যা তিন লাখ ১৮ হাজার ১৩৮ জন। এর মধ্যে পুরুষ ভোটার এক লাখ ৫৬ হাজার ৮৫ এবং নারী ভোটার এক লাখ ৬২ হাজার ৫৩ জন।
নির্বাচনে ১৩৮টি ভোটকেন্দ্র ও এক হাজার ২৬টি ভোটকক্ষ রয়েছে। এর মধ্যে ১১৪টি ভোটকেন্দ্র ঝুঁকিপূর্ণ।
এ সিটির আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় পুলিশ, এপিবিএন ও আনসারের ৩০টি মোবাইল টিম ও ১০টি করে স্ট্রাইকিং ফোর্স মাঠে রয়েছে। এ ছাড়া র্যা বের ৩০টি টিম ও ১৫ প্লাটুন বিজিবি টহল দিচ্ছে। এ ছাড়া চার প্লাটুন বিজিবি রিজার্ভ ফোর্স হিসেবে সংরক্ষিত রয়েছে।
একনজরে বরিশাল সিটি করপোরেশন
বরিশাল সিটি করপোরেশনে সাত জন মেয়র প্রার্থী রয়েছেন। তাদের মধ্যে বশিরুল হক ঝুনু নামের স্বতন্ত্র প্রার্থী নির্বাচন থেকে সরে গেছেন। বাকি ছয়জন মাঠে রয়েছেন। বিএনপির প্রার্থী মো. মজিবর রহমান সরোয়ার ও আওয়ামী লীগের সেরনিয়াবাত সাদিক আবদুল্লাহর মধ্যে মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতা হবে।
বরিশাল সিটিতে সাধারণ ৩০টি ওয়ার্ডের মধ্যে তিনটিতে ও একটি সংরক্ষিত ওয়ার্ডের কাউন্সিলর বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হয়েছেন। বাকি ২৭টি সাধারণ ওয়ার্ডে ৯১ জন ও নয়টি সংরক্ষিত কাউন্সিলর পদে ৩৪ জন প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন।
বরিশাল সিটি বরিশাল সিটি করপোরেশন নির্বাচনে ১২৩টি ভোটকেন্দ্রের মধ্যে ১১২টিই ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করেছে পুলিশ। এর মধ্যে ৫৫টি ভোটকেন্দ্র অতি ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।
ঝুঁকিপূর্ণ কেন্দ্রের নিরাপত্তায় পুলিশ ও আনসারের ২৪ জন সদস্য মোতায়েন করা হবে। এ ছাড়া এ সিটির ভোটের নিরাপত্তায় পুলিশ, এপিবিএন ও আনসারের ৩০টি মোবাইল টিম ও ১০টি করে স্ট্রাইকিং ফোর্স মাঠে রয়েছে।
এ ছাড়া র্যাবের ৩০টি টিম ও ১৫ প্লাটুন বিজিবি টহল দিচ্ছে। এর বাইরে চার প্লাটুন বিজিবি রিজার্ভ ফোর্স হিসেবে সংরক্ষিত রয়েছে।
এ সিটিতে ভোটার সংখ্যা দুই লাখ ৪২ হাজার ১৬৬ জন। এর মধ্যে পুরুষ ভোটার এক লাখ ২১ হাজার ৪৩৬ ও নারী ভোটার এক লাখ ২০ হাজার ৭৩০ জন।
একনজরে সিলেট সিটি করপোরেশন
সিলেট সিটি করপোরেশন নির্বাচনে সাতজন মেয়র প্রার্থী হলেও বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থী মো. বদরুজ্জামান সেলিম নির্বাচন থেকে সরে গেছেন। বাকি ছয়জন প্রার্থী মাঠে রয়েছেন।
মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতায় রয়েছেন আওয়ামী লীগের বদরউদ্দিন আহমদ কামরান ও বিএনপির আরিফুল হক চৌধুরী। এ ছাড়া জামায়াতের প্রার্থী এহসানুল মাহবুব জুবায়ের প্রথমবার প্রার্থী হয়ে আলোচনায় আছেন।
এ সিটির ভোটার তিন লাখ ২১ হাজার ৭৩২ জন, যা তিন সিটির মধ্যে সর্বোচ্চ। এর মধ্যে পুরুষ ভোটার এক লাখ ৭১ হাজার ৪৪৪ এবং নারী ভোটার এক লাখ ৫০ হাজার ২৮৮ জন। ২৭টি ওয়ার্ড নিয়ে গঠিত সিলেট সিটিতে সাধারণ কাউন্সিলর পদে ১২৭ জন ও সংরক্ষিত কাউন্সিলর পদে ৬২ জন প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন।
এ সিটিতে ১৩৪টি ভোটকেন্দ্র ও ৯২৬টি ভোটকক্ষ রয়েছে। এর মধ্যে ৮০টি ভোটকেন্দ্র ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। এ সিটির ভোটের নিরাপত্তায় পুলিশ, এপিবিএন ও আনসারের ২৭টি মোবাইল টিম ও ১০টি করে স্ট্রাইকিং ফোর্স মাঠে রয়েছে।
এ ছাড়া র্যাবের ২৭টি টিম ও ১৪ প্লাটুন বিজিবি টহল দিচ্ছে। এর বাইরে ৩ প্লাটুন বিজিবি রিজার্ভ ফোর্স হিসেবে সংরক্ষিত রয়েছে।
ঝুঁকিপূর্ণ ভোটকেন্দ্র
রাজশাহী সিটি করপোরেশন নির্বাচনে ১৩৮টি ভোটকেন্দ্র রয়েছে। এর মধ্যে ১১৪টি ভোটকেন্দ্র ঝুঁকিপূর্ণ।
বরিশাল সিটিতে ১২৩টি ভোটকেন্দ্রের মধ্যে ১১২টিই ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করেছে পুলিশ। এর মধ্যে ৫৫টি ভোটকেন্দ্র অতি ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।
সিলেট সিটি করপোরেশনে ১৩৪টি ভোটকেন্দ্র রয়েছে। এর মধ্যে ৮০টি ভোটকেন্দ্র ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।
১৫ কেন্দ্রে ইভিএম
রংপুর, খুলনা ও গাজীপুরের ধারাবাহিকতায় আজকের তিন সিটি করপোরেশন নির্বাচনে ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিন (ইভিএম) ব্যবহার করবে নির্বাচন কমিশন। এর মধ্যে রাজশাহী ও সিলেটে দুটি করে কেন্দ্র এবং বরিশালের ১১টি কেন্দ্রে ইভিএম ব্যবহার করা হবে। কমিশন সূত্রে জানা গেছে, ইভিএম ব্যবহারের জন্য সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের প্রশিক্ষণের পাশাপাশি ভোটারদের পরীক্ষামূলকভাবে ভোটগ্রহণের পদ্ধতি শিখিয়ে দেওয়া হয়েছে। রাজশাহী সিটি করপোরেশনের ২২ নম্বর ওয়ার্ডে দুটি কেন্দ্র, সিলেট সিটির ৪ নং ওয়ার্ডের দুটি ভোটকেন্দ্রে এবং বরিশাল সিটি করপোরেশনের ১২, ২০, ২১ ও ২৮ নম্বর ওয়ার্ডের ১১টি কেন্দ্রের ৭৮টি বুথে ইভিএমে ভোট নেওয়ার ব্যবস্থা করা হয়েছে।
ইসির নিজস্ব অবজার্ভার
নির্বাচন নিয়ে নানা অনিয়মের অভিযোগের প্রেক্ষাপটে নির্বাচন কমিশন গত কয়েকটি নির্বাচনে নিজস্ব অবজার্ভার নিয়োগ শুরু করেছে। কমিশন তাদের কেন্দ্রীয় ও মাঠপর্যায়ের নিজস্ব কর্মকর্তাদের অবজার্ভার নিয়োগ দেয়। তারা নির্বাচনের পরপরই সার্বিক বিষয়ে কমিশনে প্রতিবেদন দেন। এবার তিন সিটি নির্বাচনে কমিশন ৩৫ জন অবজার্ভার নিয়োগ দিয়েছেন। একজন সমন্বয়কের নেতৃত্বে সিটির প্রতিটি তিনটি (একটি সংরক্ষিত) ওয়ার্ডে একজন করে অবজার্ভার দায়িত্ব পালন করছেন। এই হিসাবে রাজশাহী ও বরিশালে ১২ জন করে এবং সিলেটে ১১ জন অবজার্ভার নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।
নির্বাচন পর্যবেক্ষক
তিন সিটিতে এবার ছয় শতাধিক দেশি-বিদেশি নির্বাচন পর্যবেক্ষক থাকছে বলে কমিশন সূত্রে জানা গেছে। এদের মধ্যে ১৫টি দেশি পর্যবেক্ষক সংস্থা ও তিনটি বিদেশি প্রতিষ্ঠানের পর্যবেক্ষক রয়েছে। জানা গেছে, রাজশাহীতে সাতজন বিদেশিসহ ১৯৯ জন, বরিশালে তিনজন বিদেশিসহ ২০৬ এবং সিলেটে সাতজন বিদেশিসহ ২০৩ জন পর্যবেক্ষক নির্বাচন পর্যবেক্ষণ করবেন।